মাসুদ আলম
ঋণ ও কিস্তির চাপ মানুষকে দাসে পরিণত করে

ঋণ একটি অভিশাপ! হোক তা ব্যক্তির জীবনে বা জাতির জীবনে। হাজার বছর ধরে মানুষকে দাসে পরিণত করে রাখার জন্যে শোষকদের অব্যর্থ হাতিয়ার ছিল এই ঋণ। কারণ ঋণ ও কিস্তির চাপ মানুষকে হয় দাসে পরিণত করে, নয়তো সে হয়ে ওঠে দুর্বৃত্ত। এজন্যেই নবীজী (স.) সবসময় ঋণ থেকে পরিত্রাণ চেয়েছেন। এর পাশাপাশি এ যুগে সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের আরেকটি সুচতুর ফাঁদ হলো ক্রেডিট কার্ড। যা বাকিতে কেনার অভ্যাস করিয়ে একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে ঋণগ্রস্ত করে তোলারই একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। তাই সচেতন হোন। ঋণ, কিস্তি ও ক্রেডিট কার্ডের গজব থেকে নিজে বাঁচুন। বাঁচান আপনার পরিবারকে।
নবীজীর (স.) একটি প্রার্থনা ছিল—আউযুবিল্লাহি মিনাল কুফরি ওয়াদ্দাইন। যার মর্মার্থ হলো, ‘আমি কুফর (সত্য অস্বীকার) ও ঋণ থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ (আবু সাঈদ খুদরী, নিসাঈ শরীফ)। অর্থাৎ সত্য অস্বীকার করে কাফের হওয়া আর ঋণগ্রস্ত হওয়াকে নবীজী (স.) একইরকম পাপ বলে গণ্য করেছেন।
সনাতন হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান ধর্মেও ঋণকে একটি জঘন্য পাপাচার রূপে অভিহিত করা হয়েছে এবং ঋণ যে মানুষের জীবনকে দুর্দশাগ্রস্ত করে তোলে, সেটা বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে।
ঋণ সর্বযুগেই ব্যবহৃত হয়েছে একজন মানুষ কিংবা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দাস বানিয়ে রাখার ফাঁদ হিসেবে। ঋণ মানুষের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়। ধ্বংস করে তার নৈতিক চরিত্র ও দৃঢ়তাকে। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা যায়—প্রতিটি জাতি পতনের আগে ঋণ জর্জরিত ছিল। যে পরিবারে একবার ঋণ ঢোকে, সে পরিবারের সুখ-শান্তি নষ্ট হয়ে যায়।
অতিসম্প্রতি আমাদের দেশেও শুরু হয়েছে এই ঋণ আগ্রাসন। পশ্চিমা ও পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ আমাদের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে এখন নেমেছে আমাদেরকে ঋণদাসে পরিণত করার সুপরিকল্পিত চক্রান্ত নিয়ে—যার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ক্রেডিট কার্ড। অর্থাৎ আপনি যেন উপার্জন করার আগেই ব্যয় করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন এবং একসময় নিজের শান্তি, সম্মান, নৈতিকতা ও মনোদৈহিক সুস্থতা হারিয়ে বসেন। কারণ ঋণগ্রস্ত জীবন দাসের জীবন।
দৃশ্যপট ১ : কয়েকজন তরুণ মিলে মুরগির খামার করল। ব্যবসা ভালোই চলছিল। পরিচিত একজন উদ্বুদ্ধ করল ব্যাংক থেকে ব্যবসা খাতে ঋণ (সিসি লোন) নিতে। ঋণের টাকায় খামার আরো বড় হলো। কিন্তু আকস্মিক বার্ড ফ্লুর আক্রমণে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলো ভীষণভাবে। অন্যদিকে কিস্তি পরিশোধের চাপ। সময়মতো কিস্তি শোধ করতে না পারায় আসতে থাকল ব্যাংকের চিঠি, উকিল নোটিশ। এ বিপদ থেকে মুক্তি পেতে তারা খামারের জমি সস্তা দামে বিক্রি করে দিল। এখানেই শেষ নয়, ঋণের বাকি অংশ শোধ করতে প্রত্যেকে দেউলিয়া হয়ে গেল।
দৃশ্যপট ২ : বিয়ে উপলক্ষে মোটা অঙ্কের ঋণ নেয় এক ব্যাংকার। দ্রুত ঋণশোধের আশায় বিয়ের খরচের পর বাকি টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে। কিন্তু শেয়ার ব্যবসায় ধস নামার পর আরো ঋণের জন্যে দ্বারস্থ হয় অন্য ব্যাংকের। সেই ঋণের কিস্তি চালাতে বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের কাছে একের পর এক দেনায় জড়িয়ে পড়ল। এদিকে সংসারের খরচ সামলাতে না পারায় পরিবারে প্রতিদিন অশান্তি।
দৃশ্যপট ৩ : বিত্তবান এক ব্যক্তির বাড়িতে প্রায়ই হতো ভোজ অনুষ্ঠান। আত্মীয়স্বজন খোশমেজাজে এতে শরিক হতো। বিলাসবহুল জীবন ও উচ্চপদস্থদের সাথে ওঠাবসার জন্যে তার পরিবার-পরিজন গর্ব করত। এই রাজসিক জীবনের পেছনে ছিল কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ। ঋণশোধ করতে না পারায় তার যাবতীয় সম্পত্তি একসময় জব্দ করা হলো। পাওনাদারদের তাগাদায় লজ্জাকর জীবন কাটছিল তার। হঠাৎ তার মৃত্যু হলো, কারণ ঋণের চাপ ও অপদস্থ হওয়ার ভয়। কুলখানিতে গ্রামের কয়েকজন ছাড়া কোনো আত্মীয়কে দেখা যায় নি। আত্মীয়রা তার পরিচয় দিতেও লজ্জাবোধ করে।
উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনাই সমাজের বাস্তব চিত্র, দেশে-বিদেশে এমন উদাহরণ অগণিত। ঋণ, কিস্তি ও ক্রেডিট কার্ড বর্তমানে এভাবেই পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। বিশ্বজুড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ঋণগ্রস্ত মানুষের পরিণতি : ঋণদাস বা দুর্বৃত্ত
ব্রিটেনের বৃহত্তম সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের সমীক্ষা অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি মানুষ ঋণের ধকল সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
আমেরিকায় বিবাহ-বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ ঋণ। ঋণকে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানীরা তাই বলছেন, সম্পর্কের ঘাতক। পাশ্চাত্যে ক্রেডিট কার্ডধারী প্রত্যেকের পরিচয়—সে একজন ঋণদাস।
জাতীয় জীবনে নতুন আগ্রাসন : ঋণ
আমাদের দেশে নতুন আগ্রাসনের নাম ঋণ। ২০১৫ সালে বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হচ্ছে, The surging consumer market nobody saw coming. যার মূল বিষয় ছিল, বাংলাদেশে কীভাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার অর্থাৎ বাকিতে কেনার অভ্যাসকে জনপ্রিয় করা যায়।
বোস্টন গ্রুপের ভাষ্য, ২০২৫ সালে ঢাকার মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান জনগোষ্ঠীর আকার হবে বর্তমানের দ্বিগুণ। রাজশাহী ও বরিশালে তিন গুণ এবং খুলনায় হবে বর্তমানের ছয় গুণ। কেননা ভারত চীন ইন্দোনেশিয়ার মতো উদীয়মান ধনী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে আশাবাদী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। সেইসাথে অধিকাংশ বাংলাদেশি খরচ ও ঋণশোধের ব্যাপারেও সচেতন। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান ক্রেতা-ভোক্তাদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মাত্র ৬% আর এদের মধ্যে গৃহঋণ নিয়েছে মাত্র ৩%। ২০১৬ সালে বোস্টন গ্রুপের একটি রিপোর্ট হচ্ছে, This is how consumers turn into debt slaves অর্থাৎ কীভাবে ভোক্তারা ঋণদাসে পরিণত হয়।
আমাদের দেশে এই দাসত্বের প্রসারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ক্ষুদ্রঋণ প্রচলনকারীরা। এরই ফলাফল—আমাদের জাতীয় জীবনে নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয়। সমীকরণটা খুব সহজ, একজন ঋণগ্রস্ত মানুষ মিথ্যা বলে আর যে মিথ্যা বলে সে যে-কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে খুব সহজে। ঋণের চাপে সে আর সৎ থাকতে পারে না।
ক্রেডিট কার্ড : শুভঙ্করের ফাঁকি
ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, বিলাসী পণ্যসামগ্রী বাকিতে কিনতে অভ্যস্ত করা। কারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর জন্যে কাউকে ঋণের দ্বারস্থ হতে হয় না। বিলাসী ভোগ্যপণ্য (স্মার্ট টিভি, হোম থিয়েটার, এসি, ওয়াশিং মেশিন, স্মার্ট ডোর সিকিউরিটি সিস্টেম, গেমিং ল্যাপটপ) কেনার সামর্থ্য না থাকলেও ক্রেডিট কার্ডে তা কিনে ফেলা কয়েক মুহূর্তের বিষয়।
একটি ওয়াশিং মেশিনের দাম যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, আপনার উপার্জন যা-ই হোক, মিনিমাম এমাউন্ট পে-এবল পলিসিতে ৫% সুদে আপনি তা কিনে ফেললেন। এ ঋণ শোধ হতে সময় লাগবে প্রায় ১৮ বছর এবং এই সময়ে আপনাকে শোধ করতে হবে দুই লক্ষাধিক টাকা।
বর্তমানে ক্রেডিট কার্ডের প্রতি তরুণদের তীব্র আকর্ষণ লক্ষণীয়। পকেটে একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকাকে তারা স্ট্যাটাস সিম্বল মনে করে। অথচ এর সাথে দাসত্বের কোনো পার্থক্য নেই।
ক্রেডিট কার্ডে ভোগ্যপণ্য কেনা ডিসক্রেডিট
বিভিন্ন উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর থাকে নানা আয়োজন। কোরবানির ঈদে আকর্ষণীয় মূল্যে আর কিস্তিতে অর্থাৎ বাকিতে ফ্রিজ কিনতে প্রলুব্ধ করা হয় ক্রেতাদের। কিন্তু এসবের ফলে কোরবানির পবিত্রতা ও রহমত-বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আপনি নিজেই।
আপনি কোরবানি করছেন আল্লাহর নামে। কিন্তু মাংস রাখার জন্যে যখন কিস্তিতে ফ্রিজ কিনছেন, আপনার জীবনে সুদ প্রবেশ করছে। আবার প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে কোরবানি করার মানসিকতাও অনেকের মধ্যে দেখা যায়। সুদের হার কম বা বেশি যা-ই হোক, সুদসহ আসল শোধ করতে হবে—এটাই নিয়ম। তাই ধর্মীয় এই নির্দেশ পালনে সুদ জড়িত থাকায় সহজেই তারা পাপের অংশীদার হচ্ছে। সচেতন হোন—আপনার স্বপ্নের বাড়ি, স্বপ্নের গাড়ির চাবি দেখিয়ে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর অন্তহীন প্রচেষ্টার পেছনে কী স্বার্থ লুকিয়ে আছে?
শুধু তা-ই নয়, কিস্তিতে ভোগ্যপণ্য কেনার অসুস্থ প্রতিযোগিতা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করে না; বরং এটা নগদে নিজের উপার্জিত টাকায় কিনতে পারার অযোগ্যতাই প্রকাশ করে। উপার্জন না করে ব্যয় করা যেমন অসম্মানের, বাকিতে কিনে ফুটানি করাও একইরকম হীন কাজ।
ধর্ম কী বলছে?
ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারে ওআইসি (অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন)-এর ২০০০ সালের ফতোয়া হলো—যদি ক্রেডিট কার্ডে সুদ আরোপ করার ব্যবস্থা থাকে, সুদ আরোপ হওয়ার আগেই আসল শোধ করে দিলেও এটা অনুমোদনযোগ্য নয়।
সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে—ইহলোকে উত্তমর্ণের কাছে সকল ঋণশোধ করার শক্তি দাও। তোমার প্রাসাদে আমায় সকল ঋণ থেকে মুক্ত করো। ঋণ নিমিত্ত নরকপাত থেকে আমায় মুক্ত করো।... [অথর্ববেদ : শ্লোক ১১৭-১৮-১৯]
বাইবেলে ঋণ নিষিদ্ধ ছিল। সেইন্ট অ্যামব্রোস ৩৮০ খ্রিষ্টাব্দে বলেছেন, সুদি ব্যবসা হলো ঋণী ব্যবসা, যা ডাকাতি—এমনকি খুনের সাথে তুলনীয়।
ঋণমুক্ত জীবন সচ্ছল ও সম্মানের। তাই আসুন, ঋণ কিস্তি ও ক্রেডিট কার্ডের অভিশাপ থেকে বাঁচতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি। গড়ে তুলি সচ্ছল ও সম্মানের জীবন, যা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার।
তথ্যসূত্র : ইউএসএ টুডে, ১৫ আগস্ট ২০১৮, দ্য গার্ডিয়ান, ৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ওলফ স্ট্রিট, ৮ নভেম্বর ২০১৬ অবলম্বনে, কোয়ান্টাম বুলেটিন অক্টোবর ২০১৯ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক
পিডিএসও/এমএ









































