রাবি প্রতিনিধি
প্রশাসকদের নয় গবেষকদের অগ্রাধিকার
রাবিতে ১.৫৩ কোটি টাকার তহবিল বণ্টনে নতুন নীতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) গবেষণার বরাদ্দ বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও সমালোচনার পর এবার গবেষণার মান ও গবেষকদের সক্রিয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
উপাচার্যের বিশেষ তহবিলের আওতায় থাকা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য রাবির গবেষণা খাতের অবশিষ্ট প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে প্রকৃত গবেষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ ব্যক্তি, যারা একই সঙ্গে শিক্ষক, প্রশাসক ও গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাদের মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সালেহ হাসান নকীব। প্রশাসক হয়েও শিক্ষক হিসেবে নেবেন ক্লাস-পরীক্ষা, করবেন প্রশাসনিক কাজ। আবার প্রশাসন থেকেই সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়ে করবেন গবেষণা। গত ১২ জুন উপাচার্য স্বাক্ষরিত একটি গবেষণা বরাদ্দের তালিকা থেকে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য রাবির গবেষণা খাত থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল শিক্ষকদের। তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে থাকা সিংহভাগ কর্মকর্তাই পেয়েছিলেন এই বরাদ্দ। যা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। এছাড়াও সাবেক উপাচার্যের অতি ঘনিষ্ঠরাই এই বরাদ্দ পেয়েছেন বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের।
এদিকে, গত প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে তহবিল বণ্টনে নতুন নীতি হাতে নিয়েছে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গবেষণা তহবিল বণ্টনের জন্য বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের মাধ্যমে সক্রিয় ও যোগ্য গবেষকদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বরাদ্দ প্রদানের সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গবেষণা তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা। তবে অতীতে গবেষণা বরাদ্দ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের কারণে প্রকৃত গবেষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, যা গবেষণার পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের গবেষণা বরাদ্দের বাইরে রাখার নীতি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অধিকাংশ সময় দাপ্তরিক কাজ, সভা ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে ব্যয় হওয়ায় গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে গবেষণায় সরাসরি সম্পৃক্ত শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা বলছেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল, প্রকাশনা, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উদ্যোগও সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলের একাংশ মনে করেন, গবেষণা বরাদ্দ বণ্টনের দায়িত্ব ডিনদের ওপর অর্পণ করায় স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। কারণ অনুষদ পর্যায়ে গবেষকদের কাজ, প্রকাশনা ও গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট ধারণা থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, “২০২৪-২৫ অর্থবছরের গবেষণা খাতের অবশিষ্ট অর্থ ডিনদের মাধ্যমে প্রকৃত গবেষকদের মাঝে বিতরণ করেন উপাচার্য। অন্যথায় এই অর্থ সরকারের কাছে ফেরত যেত। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে থাকেন, তারা যে গবেষণার কাজ করতে পারবেন না এমনটি নয়; কিন্তু তারা বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যস্ততায় থাকার কারণে তাদেরকে না দেওয়াই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, “গবেষণা তহবিলের অর্থ প্রকৃত গবেষকদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। গবেষণার মানোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে আমরা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদ্ধতিতে বরাদ্দ বণ্টনের উদ্যোগ নিয়েছি। গবেষণাকে কেন্দ্র করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষতা অর্জন সম্ভব।"









































