মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
বর্ষার মায়াবী ছোঁয়ায় মোহনীয় রূপে চলনবিল

বর্ষা আসতেই এক মায়াবী ও মোহনীয় রূপে ধরা দিয়েছে দেশের বৃহত্তম জলাভূমি চলনবিল। চারদিকে থই থই জলরাশি, মৃদু বাতাসে রুপালি ঢেউয়ের নাচন, সারি সারি নৌকা আর দর্শনার্থীদের কোলাহলে এখন মুখরিত বিলপাড়। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ঐতিহাসিক কুন্দইল সেতু এলাকা রূপ নিয়েছে একখণ্ড পর্যটন স্বর্গে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে বর্ষার এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে সিরাজগঞ্জ, নাটোর, বগুড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী।
তাড়াশ উপজেলা সদর পেরিয়ে দীঘি সদগুণা এলাকা পার হলেই চোখে পড়ে কামারশোন গ্রামের ব্যস্ত নৌকার ঘাট। এই ঘাটে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করছে বাহারি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এবং ঐতিহ্যবাহী শান্ত ডিঙিনৌকা। কামারশোন ঘাট থেকে কুন্দইল সেতু পর্যন্ত যাতায়াতের নৌকায় জনপ্রতি ভাড়া মাত্র ২০ টাকা। পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে একান্ত সময় কাটাতে চাইলে পুরো নৌকা ঘণ্টাপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস চলনবিল ভ্রমণের মূল সময় হলেও পানির স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকে। বিলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে কুন্দইল সেতু ও আশপাশের এলাকায় জমে উঠেছে জমজমাট মৌসুমি ব্যবসা। বিলপাড়ে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে চা, কফি, বাহারি ভাজাপোড়া এবং রকমারি ফলের অস্থায়ী দোকান। পর্যটকদের ঢল নামায় কেনাবেচা যেমন বেড়েছে, তেমনি মুখে হাসি ফুটেছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিদের।
ঋতুভেদে চলনবিলের নানা রূপ প্রবাদ আছে— "বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম।" চলনবিলের নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে থইথই জলে উথালপাথাল ঢেউয়ের কথা ভেবে। তবে চলনের এ রূপ মূলত বর্ষার। ষড়ঋতুর এই দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা যায় চলনবিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুকে নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধরে এ বিল; শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছোপ ছোপ সবুজ রঙের খেলা; হেমন্তে পাকা ধান আর সোঁদা মাটির গন্ধে ম-ম করে চারদিক; শীতে হলুদ আর সবুজের নিধুয়া পাথার এবং গ্রীষ্মে চলনের রূপ হয়ে ওঠে রুক্ষ। তবে যেকোনো ঋতুতেই চলনবিলের মূল আকর্ষণ হলো নৌকাভ্রমণ।
শরতে স্থির জলরাশি ও ভ্রমণের সেরা সময় রূপবদলের এই বৈচিত্র্যে শরতের চলনবিল এক ভিন্ন জগৎ। বর্ষার চলনবিলের রুদ্রমূর্তি তখন শান্ত, জলরাশি স্থির। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নানা রঙের ফুল আর হরেক পাখির কলরব—এ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ সাজ। তাই চলনবিলে নিরাপদে নৌকায় ভ্রমণ করার জন্য শরৎই শ্রেষ্ঠ সময়।
একের পর এক গ্রাম, বিল ও নদী নৌকায় ভেসে পার হতে হতে ধরে রাখতে পারেন জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্মৃতি। নৌকা ভাড়া করে প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেট এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে আপনি দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতে পারেন চলনের স্বচ্ছ জলে। চাইলে মাঝিদের বলে রান্নাবান্নার আয়োজনও করতে পারেন নৌকায়।
পুরোটা না হলেও খোলা হাওয়ায় বিলের একটা বড় অংশ ঘুরে নেওয়া যাবে এক দিনেই। বর্ষার মতো এই শরতে আপনার আর ভ্রম জাগবে না যে আপনি সমুদ্রে আছেন, নাকি কোনো বিলে আছেন। এখন জায়গায় জায়গায় দেখতে পাবেন ধানখেত, চাষিদের পাট ধোয়া কিংবা মাছ শিকার। এসব দেখতে দেখতে মাঝিদের কাছে গল্প শুনতে পাবেন—বিলের বুকে প্রমোদতরি ভাসিয়ে একসময় রাজা-বাদশারা ক্লান্তি ঝেড়েছেন, পর্যটকেরা চলনবিলের বিশালতা দেখে অভিভূত হয়েছেন, লেখকেরা রচনা করেছেন বিভিন্ন কাহিনি, আর চলনবিলের মাছে ভোজ হয়েছে অভিজাত বাড়িতে।
তবে কালের বিবর্তনে এসবের অনেকটাই এখন বিবর্ণ। বিলের তলদেশে পলি জমে ধীরে ধীরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এর সেই আদি বিশালতা।
ইতিহাস ও আয়তন: বিলসমূহের পরিচিতি ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। এরপর ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এর আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল, যার মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি জমে থাকত।
আপাতত কিছুটা ভিরমি খেতে পারেন যখন শুনবেন চলনবিলে রয়েছে বিভিন্ন নামের বহু বিল! বিস্তৃত চলনবিলের মধ্যে রয়েছে ১,৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি প্রধান বিল। সব মিলিয়ে ৫০টিরও বেশি বড় বড় বিলের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই চলনবিল। এই বিলগুলোই চলনকে দিয়েছে বিশালতা এবং নানা রূপে সাজিয়েছে এর সৌন্দর্যকে।
বিলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ছয়আনি বিল, বাঁইড়ার বিল, সাধুগাড়ি বিল, সাঁতৈল বিল, কুড়ালিয়া বিল, ঝাকড়ার বিল, কচুগাড়ী বিল, চাতরার বিল, নিহলগাড়ি বিল, চেচুয়া বিল, টেঙ্গরগাড়ি বিল, খোলার বিল, কুমীরাগাড়ি বিল, খৈগাড়ি বিল, বৃগরিলা বিল, দিগদাড়িয়া বিল, খুলুগাড়ি বিল, কচিয়ার বিল, ধলার বিল, ধরইল বিল, বড়বিলা, বালোয়া বিল, আমদাকুরি বিল, বাঙ্গাজালি বিল, হুলহুলিয়া বিল, কালামকুরী বিল, রঘু কদমা বিল, কুমিরা বিল, বোয়ালিয়া বিল, হরিবিল, বুড়ি বিল, রহুয়া বিল, সোনাডাঙ্গা বিল, তাড়াশের বড় বিল, বিদ্যাধর ঠাকরুণের বিল, নলুয়াকান্দি বিল, ঘরগ্রাম বিল, বেরোল বিল, কাশিয়ার বিল, কাতল বিল, বাঘমারা বিল, চিরল বিল, ডিকশী বিল, রুখলি ডাঙা বিল, রউল শেওলা বিল, পাতিয়া বিল, আইড়মারি বিল, কৈখোলা বিল, কানচগাড়ি বিল, গলিয়া বিল, চিনাডাঙ্গা বিল, মেরিগাছা বিল ও খলিশাগাড়ির বিল প্রভৃতি।
জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদী ও খাল বিলের মধ্যে যখন আপনি নৌকাভ্রমণে ব্যস্ত থাকবেন, তখন শুনতে পাবেন যে আপনি একটি নদীও পার হচ্ছেন। বেশ কিছু নদ-নদী ও খাল আঁকাবাঁকা জলরাশিতে তৈরি করেছে চলনবিলের আলাদা সৌন্দর্য। চলনবিলে রয়েছে ৪,২৮৬ হেক্টর আয়তনের ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খাল ও অসংখ্য পুকুর।
এসব নদ-নদী ও খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—আত্রাই, গুড়, করতোয়া, ফুলঝোর, বড়াল, মরা বড়াল, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, তেলকুপি (মরা আত্রাই), নবী হাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর, পানাউল্লার খাল, নিমাইচরা-বেশানী খাল, বেশানী-গুমানী খাল, উলিপুর-মাগুরা খাল, দোবিলা খাল, বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাড়ি, গোহালা নদী, গাঁড়াবাড়ি-ছারুখালি খাল, বিল সূর্য নদী, কুমারডাঙ্গা নদী এবং জানিগাছার জোলা।
মাছেদের বাড়ি ও বিলজুড়ে প্রাণের মেলা চলনবিলকে একসময় বলা হতো ‘মাছেদের বাড়ি’। দেশি প্রজাতির নানা মাছে এই বিল ছিল ভরপুর। বিলের মাছ ট্রেনে করে যেত বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, সেখানকার অভিজাত মানুষেরা চলনবিলের মাছ দিয়ে ভোজে মাততেন। এখন আগের মতো আধিক্য না থাকলেও বহু প্রজাতির দেশি মাছের দেখা মেলে এই বিলে। এর মধ্যে রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, শিং, মাগুর, কই, শোল, গজার, টাকি, বাইম, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, টাটকিনি, ভেদা ও চাঁদা অন্যতম। বিলের যেখানেই পানি আছে, সেখানেই চোখে পড়বে মাছ ধরার ধুম। সুতিজাল, ভেশাল, খাঁড়া জাল, দোয়ার, চাঁই, বড়শিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে মাছ ধরায় মেতে আছেন নানা বয়সের মানুষ।
শরতে চলনবিলের রূপবিকাশে আরেকটি বড় বৈচিত্র্য হলো ফুল। শাপলা, পদ্ম, কচুরিপানা আর নানা রঙের বুনো ফুল দেখা যায় বিলজুড়ে। জলজ উদ্ভিদ ও ধানের আইলে ফোটে হরেক রকম বুনো ফুল। এ ছাড়া শরতের শান্ত চলনে দেখা মেলে হরেক পাখির। রঙিন মাছরাঙার শিকার ধরা তো আছেই, সেই সঙ্গে দেখা মিলবে সবুজ ধানের খেতে সাদা বক আর জলে পানকৌড়ির ডুবসাঁতার খেলা। এ ছাড়া শালিক, ডাহুক, ফিঙে, দোয়েলের উপস্থিতি তো রয়েছেই।
নামের ইতিহাস ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান বিশাল এই বিলকে কেন ‘চলনবিল’ নামে ডাকা হয়, তার নিখুঁত উত্তর আজও মেলেনি। কথিত আছে, দুই হাজার বছর আগেও চলনবিল নামের কোনো অস্তিত্ব ছিল না; পুরো অঞ্চলটি তখন ছিল সমুদ্রগর্ভে। কালের আবর্তে সমুদ্র সরে যায় আরও দক্ষিণে। ব্রিটিশ গেজেটিয়ারে উল্লেখ রয়েছে, সমুদ্র সরে যাওয়ার পর তার স্মৃতি ধরে রেখেছে এই চলনবিল। অন্যান্য বিলের মতো এ বিল স্থির নয়; হয়তো নদীর মতো এতে স্রোত ছিল বলেই এর নাম হয়েছিল ‘চলনবিল’।
‘ইম্পিরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া; পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, বেড়া; নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া; নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চলের শেরপুর মিলেই গঠিত হয়েছিল বিশাল আয়তনের চলনবিল।
১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ—এই তিন অংশে চলনবিল বিভক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ; পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা ও ফরিদপুর; এবং নাটোরের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার প্রায় ১,৬০০টি গ্রাম রয়েছে। পুরো অঞ্চলের জনসংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। এখানে দেখা মিলবে দেশের অন্যতম বৃহত্তম গ্রাম 'কলম'-এর।
চলনবিল মানেই শুধু মাইলের পর মাইল জলরাশি, সবুজ ধানখেত, ফুল আর পাখির মেলা নয়; এই বিলের চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ): তাড়াশের বুকে দেখা মিলবে ঐতিহাসিক রাধাগোবিন্দ মন্দির, রশিক মন্দির ও প্রাচীন শিব মন্দির। এ ছাড়া রয়েছে প্রাচীন রাজাদের স্মৃতিবিজড়িত বড় কুঞ্জবন দিঘি, উলিপুর দিঘি, মথুরা দিঘি ও মাকরসন দিঘি। লোকগাথার অমর চরিত্র বেহুলা সুন্দরীর বাবা বাছো বানিয়ার (সায় সওদাগর) বসতভিটা ও বিখ্যাত ‘জীয়ন কূপ’ এখানেই অবস্থিত।
খুবজিপুর (গুরুদাসপুর, নাটোর): নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামে অবস্থিত চলনবিল জাদুঘর। এই জাদুঘরে আপনি চলনবিল অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শন দেখতে পাবেন।
পিডিএস/এমএইউ









































