কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

  ২৪ অক্টোবর, ২০২১

আদালতে আসামি ভোলার চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি

এসপি স্বামীর নির্দেশেই হত্যা করা হয় মিতুকে

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যা মামলাটি নতুন মোড় নিয়েছে। এ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ভোলার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের বিশ্বস্ত সোর্স কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছার নেতৃত্বে হত্যা করা হয় মিতুকে। মুছাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মিতুকে খুন করান স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। যদিও মিতু হত্যাকাণ্ডের পর এখনও খোঁজ মেলেনি মুছার। শনিবার বিকেলে এ মামলার অন্যতম আসামি ভোলা চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মো. সফিউদ্দিনের আদালতে বিস্তারিত জবানবন্দি দেন।

গত ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রামের জিইসি’র মোড়স্থ নিজ বাসভবনের সামনে নৃশংসভাবে খুন হন পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। এ হত্যাকাণ্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। মামলাটি করেন স্বামী বাবুল আক্তার। দীর্ঘ সময় ধরে এ হত্যাকাণ্ডের কোন কুলকিনারা হচ্ছিল না। কারণ হত্যাকাণ্ডের সাথে স্বামী বাবুলের সম্পৃত্ততা নিয়ে শুরু থেকে প্রশ্ন উঠলে এটি কার্যত থমকে যায়। দীর্ঘ কয়েক বছর পর মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি বার বার বলে আসছিলেন মিতুর বাবা। স্বামী বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে মিতুর বাবা আরেকটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করে। এই মামলায় স্বামী বাবুল আক্তার ছাড়াও পুলিশ সোর্স মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক প্রকাশ হানিফুল হক প্রকাশ ভোলাইয়া, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু, মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু ও শাহজাহান মিয়াকে আসামি করা হয়। এ মামলা নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) যশোরের বেনাপোল থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এহতেশামুল হক ভোলাকে গ্রেপ্তার করে। শনিবার বিকেলে ভোলা চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মো. সফিউদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি দিতে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য দেন। গুরুত্বপূর্ণ এ মামলায় ভোলার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের সাথে স্বামী বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার বিষয়টি ভোলা স্বীকার করেন।

আদালত সূত্র জানায়, ভোলা নিজেকে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে ঘটনাক্রমে বাবুল আক্তারের সাথে পরিচিত হন। বালু ও লাকড়ি ব্যবসার সূত্র ধরে ভোলা কিছু মামলায় জড়িয়ে যান। এসব মামলা হতে রক্ষা পেতে পুলিশ সোর্স কামরুল ইসলাম মুছার সহায়তা নেন। গত ২০০৮ সালের দিকে ভোলার সাথে মুছা পরিচয় করিয়ে দেন বাবুল আক্তারের। ভোলার সাথে বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। এ সময় ভোলা কিছু অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান দেন বাবুল আক্তারকে। সেই অস্ত্র উদ্ধার করে প্রশংসিত হন বাবুল আক্তার। গত ২০১১ সালে বাবুল আক্তার নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হন। জবানবন্দিতে ভোলা আরও জানান, বাবুল আক্তার যখন বদলি হয়ে গোয়েন্দা বিভাগে আসেন তখন একদিন ভোলা দেখা করতে যান তার সাথে। সেখানে দেখেন মুছা বসে আছেন। মুছারও কোন কাজ ছিল না। এ সময় বাবুল আক্তার ভোলার বালুর ডিপোতে মুছাকে একটি চাকরি দিতে বলেন। তখন ১৫ হাজার টাকা বেতনে ম্যানেজারের চাকরি দেন বলে জানান ভোলা। ভোলার বালুর ডিপোতে মুছা যোগদান করার পর মনির নামের একজনকে কেয়ারটেকার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ভোলার সাথে মুছার ঘনিষ্ঠতার কয়েক বছর পর একদিন মুছা ভোলাকে জানায় যে, বাবুল আক্তারের সঙ্গে তার স্ত্রীর নানারকম ঝামেলা আছে। বাবুল আক্তার বলেছেন, স্ত্রী মিতুকে সরিয়ে দিতে। ভোলা তার ভাষায় উল্লেখ করেন, বাবুল আক্তার তার স্ত্রীকে ফিনিশ করে দিতে বলেছেন। ভোলা জানান, এ কথা শুনার পর ভোলা রাজি হননি। ভোলা পারবে না বলে জানালে একদিন বাবুল আক্তার তাকে ডেকে নিয়ে যান জিইসি মোড়ে তার বাসার সামনে। বলেন, মুছাকে একটা কাজ দিয়েছি ভোলা যেন তাকে সাহায্য করে। কিন্ত ভোলা রাজি না হলে বাবুল আক্তার বলেন, কাজ করতে না চাইলেও যেন মুছাকে বাঁধা না দেন, বাঁধা দিলে সমস্যা হবে বলে বাবুল আক্তার তাকে বলেন। এতে ভয় পান ভোলা। এ সময় বাবুল আক্তারের সাথে মুছা ও ওয়াসিমও ছিলেন। ভোলার দাবি, বাবুল আক্তারের টাকায় অস্ত্র সংগ্রহ করে মুছা।

ভোলা জবানবন্দিতে আরও জানান, বাবুল আক্তারের সাথে এসব কথা হবার কয়েকদিন পর মুছা বারবার ফোন দিতে থাকে। ২০১৬ সালের ৫ জুন উল্লেখ করে ভোলা জানায়, ঔদিন মুছা অনেকবার ফোন দিলেও ভোলা ফোন ধরে নি। পরে টেলিভিশনে দেখেন বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে। এ ঘটনা দেখার পর ভোলা মুছাকে ফোন দিলে ফোনটি বন্ধ পায় বলে উল্লেখ করেন। ঘটনার দিন বিকেলে ভোলার অফিসে আসে মুছা। তখন মুছা বলে,‘ কোন উপায় ছিল না। মিতু ভাবিকে না মারলে বাবুল আক্তার তাকে ক্রসফায়ার দিতো।’ এরপর মুছা অফিসে একটি কাপড়ের ব্যাগ রেখে পালিয়ে যায়। পরে মুনির এসে ব্যাগটি নিয়ে গেলে পুলিশ পরবর্তীতে মুনিরের বাসা থেকে ব্যাগটি উদ্ধার করে। ব্যাগে একটি অস্ত্র পাওয়া যায়। ঘটনার পর পুলিশ ভোলাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সাড়ে ৩ বছর পর ভোলা জামিনে বেরিয়ে মুছাকে খুঁজতে থাকে। মুছাকে না পেয়ে তার স্ত্রী পান্নাকে ফোন করেল, পান্না জানায় ঘটনার পর বাবুল আক্তার মুছাকে ফোন দিয়ে সাবধানে থাকতে বলেন। মুছা পালিয়ে পালিয়ে থাকার পর বাবুল আক্তারের ওপর ক্ষুদ্ধ হয়। বাবুল আক্তারের সাথে এ ঘটনা নিয়ে অনেক কথাকাটাকাটিও হয়। একপর্যায়ে মুছার আর কোন সন্ধান মিলে নি। এখনও কোন হদিস নেই।’

সূত্র জানায়, বাবুলের স্ত্রী মিতুকে কিলিং মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন অভিযুক্ত মুছা। ঘটনার পরপরই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ থেকে মুছাকে শনাক্ত করা হয়। যদিও ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি মুছাকে চেনেন না বলে সাফ জানিয়েছিলেন। তবে চলতি বছরের ১২ মে বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল আক্তার একপর্যায়ে মুছাকে চেনার কথা স্বীকার করেন বলে পিবিআই জানায়। মিতু হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মুছারও খোঁজ পাওয়া যায়নি। অবশ্য তার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, মুছাকে ওই বছরের ২২ জুন প্রশাসনের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মিলছে না। মিতু হত্যা মামলায় মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত ২০১৬ সালের ৫ জুন মিতু ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে খুন হন। ঘটনার পর অভিযোগের তীর প্রথমদিকে বাবুল আক্তারের দিকে না থাকলেও পরে বাবুল আক্তারকে সন্দেহ করা হয়। বিশেষ করে মিতুর পরিবার এ ঘটনার পেছনে বাবুল আক্তার জড়িত বলে বার বার পুলিশের কাছে উল্লেখ করে। বাবুল আক্তার স্ত্রীকে খুনের ঘটনায় নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ বিষয়ে নানা তদন্তের পর গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়। পরে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে ২০১৭ সালে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন প্রথম এই খুনে বাবুল জড়িত বলে পুলিশের কাছে উল্লেখ করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলার তদন্তভার পড়ে পিবিআই’র ওপর। এরপর থেকে হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে থাকে। দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর এই মামলায় বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মিতু হত্যা,বাবুল আক্তার
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়