হাসান ইমন

  ১০ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:১৮

পেঁয়াজ ফলিয়ে বিপাকে চাষি

তিন মাস পর পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের খবর প্রচার হওয়ার পর থেকে প্রভাব পড়ছে বাজারে। ভারত থেকে আমদানি শুরু হওয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে কমতে শুরু করেছে পণ্যটির দাম। দুই সপ্তাহ আগের ৫০ টাকা কেজির দেশি পেঁয়াজ গতকাল শনিবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ২৫-৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এতে প্রতি কেজিতে চাষিরা লোকসান গুনছে ১০-১২ টাকা করে। এতে কৃষক হতাশ।

তারা বলছেন, পেঁয়াজের সংকটের কথা বিবেচনা করে, লাভের আশায় বেশি করে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে দাম কমতে থাকলে আমাদের জন্য আরো বড় ক্ষতি অপেক্ষা করছে। 

কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে আমদানির অনুমতি দেওয়া সরকারের ঠিক হয়নি। এবার দেশে প্রচুর পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে, ফলনও ভালো। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উচিত, পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ঠিক করে বাজারমূল্য ঠিক করা। যেন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

এ বিষয়ে শেরে-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক গাজী এম এ জলিল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন একই কথা। তিনি আরো বলেন, পেঁয়াজের দাম কমে গেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর কৃষক ক্ষতি হলে তারা ভবিষ্যতে উৎপাদন করতে উৎসাহ হারাবে। তাহলে আমাদের কৃষি অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে। 

সরকার পেঁয়াজ আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন সেটা ঠিক আছে। আগে কৃষক তাদের ক্ষতি না হলে আমরা এগিয়ে যাব। 

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সরকারকে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ ঠিক করে বাজারমূল্য ঠিক করা উচিত। উৎপাদন মূল্য এবং ভোক্তা পর্যায়ে দাম সামঞ্জস্য রাখলে কেউ ক্ষতির মুখামুখি হবে না। 

তিনি আরো বলেন, আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় এখন বিদেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাবে। এখন অটোমেটিক আমদানি কমে যাবে। এই শুল্ক আরোপ যেন সারা বছরই থাকে। আর যদি দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কমে যায়, সে ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার করা যেতে পারে। 


# ভরা মৌসুমে আমদানির অনুমতি ঠিক হয়নি, বললেন বিশেষজ্ঞরা
# কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, বাজারমূল্য যেন ঠিক করা হয় : বাজার বিশ্লেষক
# উৎপাদন খরচ ৩৫, বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজি


পেঁয়াজের বর্তমান বাজারের সার্বিক অবস্থা নিয়ে যশোরের চৌগাছা ও পাবনার বেড়া-সাঁথিয়া প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে রয়েছে বিস্তারিত—

চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি জানান, কিছু দিন আগেও পেঁয়াজের দাম ছিল ৮০-৯০ টাকা। এরপর মিসর, তুরস্ক, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করায় দাম ৫০ টাকায় নামে। ভরা মৌসুমে ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দেওয়ায় পেঁয়াজের দাম দ্রুত কমতে থাকে। এখন দেশি  পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ২২ থেকে ২৫ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। উৎপাদন খরচও উঠাতে পারছেন না কৃষক।

হাজরাখানা গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দীন বলেন, বিঘাপ্রতি ৮/১০ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে। বর্তমান ভাতি পেঁয়াজের ব্যাপক চাষ শুরু হয়েছে। এই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায় না। চৌগাছা বাজারের আড়তদার আবদুস সালাম বলেন, পাইকারি কেজিপ্রতি ২২ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি করছি। আর খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৭/৩০ টাকা দরে। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দিন বলেন, এ বছর ৯৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার ফলনও ভালো হয়েছে। তবে পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে চাষিরা।

বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার সাঁথিয়ার বিভিন্ন বাজারে পাইকারি প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২২ থেকে ২৭ টাকায়। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।

তারা জানান, দেশি পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় উপজেলায় এবার প্রচুর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে। ১২০০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ বীজ এবার ছয় হাজার টাকায় কিনেছেন। 

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ১৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। এবার ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরো অন্তত ৪০০ হেক্টর বেশি জমিতে এবার পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি কার্যালয় জানিয়েছে।

এদিকে মাসখানেক হলো বাজারে আগাম বা মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠতে উঠতে থাকায় এমনিতেই পেঁয়াজের দাম বেশ কমেছে। এরই মধ্যে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণায় আরো বেশি করে কমতে শুরু করেছে।

সম্প্রতি ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি শুরু হওয়ায় বাজারে রীতিমতো ধস নেমেছে। 

চাষিরা জানান, তারা হিসাব করে দেখেছেন এবার প্রতি কেজি পেঁয়াজে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩৫ টাকার কাছাকাছি। গতকাল সাঁথিয়ার বিভিন্ন হাটে পাইকারি প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ২২ থেকে ২৫ টাকায় নেমে গেছে। ফলে এখনই চাষিদের প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

গতকাল শনিবার সরেজমিনে উপজেলার করমজা চতুরহাটে দেখা যায়, বাজারে নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়েছে। হাটে পেঁয়াজ নিয়ে আসা বোয়ালমারী গ্রামের রহিম উদ্দিন বলেন, ঋণ নিয়ে তিন বিঘা পেঁয়াজ বুনে সেই পেঁয়াজ এখন ২৫ টাকা করে বেচতে হয়। চাষ, সার শ্রমিক খরচ তো আছেই। ভারতের পেঁয়াজ আমাদের সর্বনাশ করে দিল।’

করমজা চতুরহাটের পেঁয়াজের আড়তদার মুন্নাফ আলী বলেন, ‘ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির খবরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৬০০ টাকা মণ দরের পেঁয়াজ ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায় নেমে গেছে।’ 

সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, ‘এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হচ্ছে। ফলনও খুব ভালো। প্রতি বিঘায় কৃষক ৬০ থেকে ৬৫ মণ পেঁয়াজ পাচ্ছেন।’

পিডিএসও/হেলাল

পেঁয়াজ,কৃষি,বিপাকে
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়