reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ৯ ঘণ্টা আগে

শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্র আমাদের কাম্য

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পরপর কয়েকটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। লক্ষ্মীপুরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসানকে পিটিয়ে হত্যা, পাঁচ বছরের শিশু আয়াতকে অপহরণের পর নির্মমভাবে ছয় টুকরা করে হত্যা এবং শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড- এসব ঘটনা আমাদের সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সামনে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। লক্ষ্মীপুরের ঘটনাটির কথাই ধরা যাক। সামান্য একটি মোবাইল ফোন চুরির অপবাদে এক শিক্ষার্থীকে সিনিয়ররা যেভাবে পিটিয়ে হত্যা করে, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। অন্যদিকে, শিশু আয়াত ও রামিসা হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, সমাজে লোভ, হিংসা এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বলা সংগত, দেশে শিশু হত্যা ও নির্যাতন কেন ঘটছে- এর কারণ মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করবেন। আমরা সাধারণভাবে যা দেখি তা হলো-অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক অবক্ষয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা স্থানীয় আশ্রয়-প্রশ্রয় এ ধরনের অপরাধকে উসকে দেয়। শিশুরা সমাজের সবচেয়ে অনুন্নত ও অরক্ষিত অংশ। তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে না। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সমাজের একশ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষ তাদের ওপর হিংস্রতা চরিতার্থ করে। আমরা মনে করি, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় না হলে মানুষ এতটা পশুতুল্য হতে পারে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। শিশু রামিসা ও আয়াত হত্যা মামলার রায়ে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড যেভাবে আইনগত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, একইভাবে লক্ষ্মীপুরের মেহেদী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদেরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এসব মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা এখন সময়ের দাবি, যাতে অপরাধীরা স্পষ্ট বার্তা পায় যে, শিশুদের গায়ে হাত দিলে রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কেবল আইনি কঠোরতা দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। বলা প্রাসঙ্গিক যে, শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংস অপরাধ মানুষের মৌলিক নৈতিকবোধকে আঘাত করে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও শিশু বিকাশের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুর মানসিক সুরক্ষা, ট্রমা-সচেতন সহায়তা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বলা বাহুল্য, দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর শিশু সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশু হত্যা ও নির্যাতন শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িত। তাই অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশব্যাপী সব শিশুর যত্ন, নিরাপত্তা, মানসিক সুরক্ষা ও বিকাশের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাই শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র আমাদের কাম্য।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়