সুমনা আক্তার
মুক্তমত
আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী : তরুণদের প্রত্যয়

একটি শিশুকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তুমি কেমন পৃথিবীতে বড় হতে চাও?’ সে হয়তো বলবে, যেখানে আকাশ নীল, নদী স্বচ্ছ, পাখির কণ্ঠে সকাল শুরু হয় আর গাছের ছায়ায় বিকেল কাটে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, আজকের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় আমাদের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলা এখন আর শুধু পরিবেশবাদীদের কাজ নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী হতে পারে তরুণ সমাজ।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিশ্বব্যাংকের তালিকায়, বন্যা ঝুঁকিতে শীর্ষ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এর প্রভাব কোনো দূরের আশঙ্কা নয়, ২০২২ সালেই দেশের পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছিল। গবেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১৩-১৫ মিলিয়ন মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হতে পারে। অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন আমাদের কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আজ আমরা যে পরিবেশ রেখে যাচ্ছি, আগামী প্রজন্মকে সেই বাস্তবতার সঙ্গেই জীবনযাপন করতে হবে। তরুণদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের উদ্যম, সৃজনশীলতা এবং পরিবর্তন আনার সাহস। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলনের পেছনে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। একজন তরুণ যখন একটি গাছ লাগায়, প্লাস্টিক ব্যবহার কমায়, অন্যকে সচেতন করে কিংবা পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন সে শুধু একটি কাজই করে না। বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সবুজ পৃথিবী গড়ার প্রথম শর্ত হলো বৃক্ষরোপণ এবং বৃক্ষ সংরক্ষণ। শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি তুলে গাছ লাগানো নয়, বরং সেই গাছকে বড় করে তোলার দায়িত্বও নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে এবং পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো যেতে পারে। একটি গাছ শুধু অক্সিজেনই দেয় না, এটি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, মাটির ক্ষয়রোধ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি প্লাস্টিকদূষণ কমাতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আমাদের নদী, খাল, কৃষিজমি এবং সমুদ্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তরুণরা যদি কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল বহন এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক বর্জনের অভ্যাস গড়ে তোলে, তবে একটা বড়ো পরিবর্তন সম্ভব। ব্যক্তিগত অভ্যাসের ছোট পরিবর্তনই সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করে।
এই পরিবর্তনের ছবি এখন বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে। সাতক্ষীরার তরুণ জলবায়ুকর্মী এস এম শাহীন আলম ‘উপকূল এক্সপ্রেস’ নামে পরিচিত হয়ে উপকূলীয় মানুষের জলবায়ু-সংকটের গল্প বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন। সিলেটে তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের নেতৃত্বে খোয়াই নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে, যেখানে নদী রক্ষার সঙ্গে সবুজায়নের কাজ একসঙ্গে এগিয়েছে।
এখানে একটা বৈপরীত্যও লক্ষণীয়। বিশ্বের কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য, তবু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই দেশকেই সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ২১.৮৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পরিবেশ রক্ষায় প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মাত্র বিনোদনের মাধ্যম না বানিয়ে সচেতনতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনলাইন ক্যাম্পেইন, পরিবেশবিষয়ক ভিডিও, তথ্যচিত্র এবং গবেষণাভিত্তিক কনটেন্ট মানুষের চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একজন সচেতন তরুণ শত মানুষের মধ্যে সচেতনতার বীজ বপন করতে সক্ষম।
আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ পৃথিবী গড়তে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবেশ সচেতনতা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও কলেজে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পরিবেশবিষয়ক বিতর্ক বা কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। যখন শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ শিখবে, তখন তারা ভবিষ্যতে আরো দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে উঠবে। একটি সবুজ পৃথিবী গড়ার জন্য শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ানোও ভবিষ্যতের জন্য জরুরি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করা, গণপরিবহণ ব্যবহার, সাইকেল চালানোর অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সৌরশক্তির মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করা কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হবে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, পৃথিবীকে বদলানোর জন্য বিশাল কোনো কর্মসূচি দরকার। বাস্তবে, একটি গাছ লাগানো, একটি প্লাস্টিকের বোতল নির্ধারিত স্থানে ফেলা, একটি শিশুকে পরিবেশ সম্পর্কে শেখানো কিংবা একটি সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াও পরিবর্তনের অংশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কথার চেয়ে আমাদের কাজ থেকেই বেশি শিক্ষা নেবে। আগামী প্রজন্ম যেন ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ নয়, সবুজে মোড়া একটি পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে পায়- সেই প্রত্যয় নিয়েই আজকের তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
"






































