মো. তাহমিদ রহমান

  ১৯ জুন, ২০২৬

দৃষ্টিপাত

রোলার স্কেটিং হতে পারে বিশ্বজয়ের মাধ্যম

বাংলাদেশে খেলাধুলার জনপ্রিয়তার মানচিত্রে ক্রিকেট ও ফুটবলের আধিপত্য সুস্পষ্ট। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে নতুন নতুন ক্রীড়া চর্চার ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। সেই ধারায় রোলার স্কেটিং একটি সম্ভাবনাময়, আধুনিক এবং স্বাস্থ্যসম্মত ক্রীড়া হিসেবে দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু খেলাটি এখনো সীমিত পরিসরে আবদ্ধ। দ্রুত গতির পথচলায় স্কেটিং এমন একধরনের খেলা যা শরীর ফিট রাখার পাশাপাশি গতিময় জীবনের নিত্যদিনে স্বল্প দূরত্বের পথ চলতে সহায়তা করে। কখন থেকে বাংলাদেশে স্কেটিং শুরু হয়েছে তা সঠিক করে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে উচ্চশিক্ষিত পাশ্চত্য সংস্কৃতি জ্ঞান সম্পন্ন দু’একটি পরিবারে পারিবারিকভাবে স্কেটিং খেলা শুরু হয়। তাদের শৌখিনতায় ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সর্বপ্রথম ইস্কাটনে অবস্থিত ডেফোডিল নামক হোটেলে একটি স্কেটিং রিঙ্ক তৈরি হয়। কালের বিবর্তনে এবং সঠিক পরিচালনার অভাবে ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে রিঙ্কটি ভেঙে ফেলা হলে খেলাটি বিলীন হয়ে যায়।

অতপর ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে শিশুপার্কে বাচ্চাদের জন্য স্কেটিং রিঙ্ক নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েরা সেখানে আস্তে আস্তে স্কেটিং খেলায় মেতে উঠে। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে জানুয়ারির প্রথম দিকে আর্জেন্টিনার পেশাদার স্কেটিং কোচ প্রফেসর আর্তুরো গ্রেকো বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছেলের সমন্বয়ে রোলার স্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন। ক্রমে ক্রমে খেলাটি প্রসারিত হতে থাকে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জানুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সংশোধনী অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ১৯ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গঠিত হয় বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশন। বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা। এটি মূলত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়।

পাশ্চাত্য ক্রীড়া হিসেবে আমাদের দেশে স্কেটিং সেভাবে এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। তবু অযত্ন এবং অনাদরে থাকা এই খেলাটি দেশের জন্য অনেক সম্মান বয়ে এনেছে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্কেটিং এ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছিল। আমাদের ছেলেরা দেশে ও বিদেশে স্কেটিং এ বিভিন্ন ক্রীড়া নৈপুণ্যতা দেখিয়ে উল্লেখযোগ্য সম্মান অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল। যেমন ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের একজন কৃতি খেলোয়াড় মো. জাবেদ সর্বভারতীয় স্কেটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ৪র্থ এশিয়ান কাপ স্কেটিং প্রতিযোগিতায় মো. মাসুম বাংলাদেশের হয়ে দলগত তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিল। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১ম হেন্ড টু হেন্ড আন্তজার্তিক স্কেটিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের মাসুম ও নাদিম ২টি স্বর্ণ জয় করেছিল। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ার্ল্ড এশিয়া স্কেটিং এবং চায়না রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে চীনের জিনজিয়াং রাজ্যের কারামাই শহরে অনুষ্ঠিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড চায়না-আসিয়ান স্পিড রোলার স্কেটিং সিটি ইনভাইটেশনাল টুর্নামেন্ট’-এ বাংলাদেশের স্কেটাররা দুটি স্বর্ণপদকসহ মোট চারটি পদক জয় করে।

জুনিয়র-এ গ্রুপ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নাবীয়ুন ইসলাম পৃথিবী প্রথম দিনে ৫০০ মিটার স্পিড রেসে এবং দ্বিতীয় দিনে ১০০০ মিটার স্প্রিন্ট রেসে প্রথম স্থান অধিকার করে জোড়া স্বর্ণপদক অর্জন করেন। রোলার স্কেটিং কেবল একটি খেলা নয়; এটি এক ধরনের স্বাধীনতার অনুভূতি। চাকার ওপর ভারসাম্য রেখে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবার কাছেই রোমাঞ্চকর। রোলার স্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বহুমাত্রিক স্বাস্থ্য উপকারিতা। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কেটিং একটি কার্যকর কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম যা হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত স্কেটিং শরীরের ক্যালরি ক্ষয় করে, স্থুলতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে পায়ের পেশি, কোমর, নিতম্ব এবং শরীরের কেন্দ্রীয় অংশের পেশিগুলো সক্রিয়ভাবে কাজ করে। একইসঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা ও সমন্বয় ক্ষমতা উন্নত হয়। বর্তমান সময়ে শিশুদের মধ্যে মোবাইল ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটারনির্ভর জীবনযাত্রা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে কাটানোর ফলে স্থুলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং মানসিক চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রোলার স্কেটিং হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান।

এটি শিশুদের ঘরের বাইরে এনে সক্রিয় জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত করে। স্কেটিং শেখার সময় শিশুদের আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য, মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বারবার পড়ে গিয়ে আবার ওঠে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক দৃঢ়তাও বাড়ায়। শুধু শিশু নয়, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও স্কেটিং অত্যন্ত উপকারী। এটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং আনন্দ হরমোন হিসেবে পরিচিত এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়ায়। ব্যস্ত নগরজীবনে যেখানে মানুষের বিনোদনের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে, সেখানে স্কেটিং হতে পারে সুস্থ ও ইতিবাচক অবসর বিনোদনের একটি মাধ্যম। রোলার স্কেটিং-এর পথ বা জায়গাটিকে সাধারণত রোলার রিঙ্ক বলা হয়। এ ছাড়া স্কেটিং-এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি উন্মুক্ত স্থানকে স্কেট পার্ক বলা হয়ে থাকে। সময়ের বিবর্তনে শিশুপার্কের সেই স্কেটিং রিঙ্কটি এখন আর নেই। বাস্তবতা হলো, দেশে স্কেটিং ফেডারেশন থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের কোনো রোলার স্কেটিং রিঙ্ক বা ট্র্যাক এখনো গড়ে ওঠেনি। অনুশীলনের জন্য ফেডারেশনের যে রিঙ্কটি রয়েছে সেটাও আন্তর্জাতিক মানসম্মত নয়। এরই মধ্যে আমাদের স্কেটাররা দেশের জন্য যে সম্মানটুকু অর্জন করেছে তাতে আশা করা যায় যথাযথ যত্ন ও সুযোগসুবিধা পেলে স্কেটিং-এ স্বর্ণসম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত রিঙ্কের অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?

প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং পৃষ্ঠপোষকতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্কেটারদের উল্লিখিত অর্জনগুলো আশার আলো দেখাচ্ছে। ফলে এখনই সময় রোলার স্কেটিংকে একটি সম্ভাবনাময় ক্রীড়া ও জনস্বাস্থ্যবান্ধব কার্যক্রম হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার। বিশ্বের বহু দেশে এটি একইসঙ্গে বিনোদন, শরীরচর্চা, প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া এবং বিকল্প পরিবহন মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। উন্নত দেশগুলোতে পার্ক, উন্মুক্ত স্থান এবং বিশেষ ট্র্যাকে হাজারো মানুষ নিয়মিত স্কেটিং করেন। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি এখনো গড়ে না উঠলেও এর সম্ভাবনা মোটেও কম নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষকের অভাব এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংকট সত্ত্বেও দেশের কিছু প্রতিভাবান স্কেটার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছেন। এসব অর্জন প্রমাণ করে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা পেলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো বড় সাফল্য এনে দিতে সক্ষম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশে এখনো অধিকাংশ স্কেটার পার্ক, খোলা রাস্তা অথবা অস্থায়ী জায়গায় অনুশীলন করেন। অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে। ফলে খেলোয়াড়দের দক্ষতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী ট্র্যাক, আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা ছাড়া বিশ্বমানের স্কেটার তৈরি করা কঠিন। এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি রোলার স্কেটিংকে সম্ভাবনাময় ক্রীড়া হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের স্কেটিং রিঙ্ক বা ট্র্যাক নির্মাণ করতে হবে। ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি আধুনিক স্কেটিং কমপ্লেক্স স্থাপন করা যেতে পারে। প্রশিক্ষক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কোচ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। খেলোয়াড়দের বিদেশে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিলে তাদের দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে ক্রিকেট ও ফুটবলের তুলনায় স্কেটিংয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে স্কেটিং প্রতিযোগিতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে পারে। বাংলাদেশে রোলার স্কেটিং সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক অবকাঠামো এবং যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা।

রাষ্ট্র, ক্রীড়া সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট খাত এবং অভিভাবক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই খেলাটি নতুন প্রজন্মের কাছে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। দেশে প্রতি বছর জাতীয় ক্রীড়া সপ্তাহে স্কুল ও কলেজ ভিত্তিক স্কেটিং প্রতিযোগিতা, জাতীয় স্কেটিং প্রতিযোগিতা, আন্তঃক্লাব স্কেটিংসহ নানা ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের ট্র্যাক, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একদিন হয়তো বাংলাদেশের স্কেটাররাই বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকা উঁচু করে ধরবেন। রোলার স্কেটিং তাই শুধু চাকা পায়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প নয়; এটি সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা এবং মুক্তির এক অনন্য যাত্রা। এই সম্ভাবনাময় ক্রীড়ার বিকাশে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়