নিতাই চন্দ্র রায়

  ১৯ জুন, ২০২৬

মতামত

পুষ্টি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ফল চাষ

ময়মনসিংহ মহানগরের নতুন বাজার ও স্বদেশি বাজার দেশী ও বিদেশি ফল বিক্রির জন্য বিখ্যাত। এ দুটি বাজারে যেসব বিদেশি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে আঙুর, বেদানা, আপেল, নাশপাতি, খেজুর ও ড্রাগন উল্লেখযোগ্য। যদিও ড্রাগন নামের বিদেশি ফলটি এখন বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে নতুন বাজারে প্রতি কেজি বেদানা ৬৫০ টাকা, আঙুর (লাল) ৬০০ টাকা, আপেল ৩০০ টাকা, মাল্টা ২৭০ টাকা ও ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। বিদেশি ফলের তুলনায় দেশি ফলের দাম অনেক কম এবং দেশি ফল বিদেশ থেকে আমদানি করা ফলের চেয়ে কম পুষ্টিকর নয়। এখন আষাঢ় মাস। সারা দেশে ফলের বিপুল সমারোহ। এসব দেশি ফলের মধ্যে রয়েছে- ফলের রাজা আম, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাম, পেঁয়ারা, লটকন, বাঙ্গি, তরমুজ, লেবু, তালের শাঁস ও জামরুল প্রভৃতি।

গত ১৯ জুন, ২০২৫ রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চত্বর ও মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ফল মেলা-২০২৫। তিন দিনব্যাপী ওই ফল মেলায় বক্তারা বলেন, দেশি ফল খেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। আমরা বর্তমানে বিদেশে প্রচুর পরিমাণে আম, কাঁঠাল ও পেঁয়ারা রপ্তানি করছি। দেশের ৬৪টি জেলা ও ৪৩১টি উপজেলায় - এই ফল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলার উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় ফল সবার কাছে পরিচিত করে তোলা। অনেকে আবার দেশীয় ফল চেনেন না। চিনলেও কিনতে চান না। তারা ফল বলতে বুঝেন বিদেশ থেকে আমদানিকরা আঙুর, বেদানা, আপেল, কমলা, নাশপাতি, মাল্টা ও খেজুর ইত্যাদি। দেশীয় ফলের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বিদেশি ফলের চেয়ে অনেক বেশি। দামও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর ফল বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এসব ফলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, পেঁয়ারা। চীনে বাংলাদেশ থেকে এবার নতুন করে আম রপ্তানি করা হচ্ছে। রপ্তানি বাড়লে কৃষক ফলের ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি ফলে প্রচুর পরিমাণে খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন বিদ্যমান, যা দানাজাতীয় শস্যে অপ্রতুল। কোনো প্রকার প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই ফল সরাসরি খাওয়া যায়। অনেক ফল আবার কাঁচা-পাকা উভয় অবস্থায় খাওয়া যায়। নিয়মিত ফল খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ক্লান্তি দূর হয় এবং সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। তাই শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ফল অত্যন্ত জরুরি। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে ফলের উৎপাদন কম হওয়ায় এবং আর্থিক দৈন্যতা ও সচেতনার অভাবে আমরা চাহিদার তুলনায় অনেক কম ফল খাচ্ছি। প্রয়োজন মেটাতে হলে ফলের উৎপাদন বহুলাংশে বাড়াতে হবে।

ফল চাষের অনেক সুবিধা আছে। ফল গাছ বসতবাড়ির আশপাশ, গ্রামীণরাস্তার পাশে, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, মিল-কারখানা, কবরস্থানের পতিত জমিতে রোপণ করা যায়। এমনকি ছাদ বাগানেও আম, পেয়ারা, পেঁপে, করঞ্চা, লেবু প্রভৃতি ফলের চাষ করা যায়। এ ছাড়া পুকুরপাড়ে বাণিজ্যিকভাবে কলা, পেঁপে, লেবুর ও বিদেশি ফল ড্রাগনে চাষ করা যায়। ফল চাষের আর একটি সুবিধা হলো- এটির চারা একবার রোপণ করে অনেক দিন সুস্বাদু ফল পাওয়া যায়। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিতরণ করা যায়। অতিরিক্ত ফলবিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়।

জনসংখ্যার তুলনায় কম জমি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের শীর্ষ ১০টি গ্রীষ্ম-লীয় ফল উৎপাদনকারী দেশের অন্যতম বাংলাদেশ। কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনের নবম এবং পেয়ারা উৎপাদনে সপ্তম। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গত ১৮ বছরে ফলের উৎপাদন গড়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ করে বেড়েছে। ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে জনপ্রতি ফল গ্রহণের পরিমাণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা জরিপে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯৫ দশমিক ৫ গ্রাম ফল ভোগ করেছেন আর ২০১০ সালে এই গড় ছিল ৪৪ দশমিক ৭ গ্রাম।

এক সময় দেশে কাঁঠাল, আম, কলা ও পেঁপে ছিল প্রধান ফল। এখন বাংলাদেশের মানুষ ২০ থেকে ২২ প্রজাতির ফল নিয়মিত ভোগ করছেন। বর্তমানে দেশে কুল, কামরাঙা, কদবেল, লেবু, লটকন, জাম, আনারস, আতা, শরিফা, সফেদার মতো স্থানীয় ফলের পাশাপাশি চাষ হচ্ছে স্ট্রবেরি, আঙুর, মাল্টা, ড্রাগন, অ্যাভোকাডো ও রাম্বুটানের মতো বিদেশি ফল। আজ থেকে এক দশক আগে দেশে ৫৬ ধরনের ফলের চাষ হতো। এখন হচ্ছে ৭২ ধরনের ফলের চাষ। ফল উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রপ্তানি। কমছে আমদানিনির্ভরতা। সাশ্রয় হচ্ছে কষ্টে উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ ৪০টির বেশি দেশে রয়েছে বাংলাদেশের ফলের চাহিদা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে আমের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, পেঁপে আড়াই গুণএবং লিচু উৎপাদন বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া গত ৫/৬ বছরে দেশে বিদেশি ফল ড্রাগন, অ্যাভোকাডো এবং দেশী ফল- বাতাবি লেবু, তরমুজ, খরমুজ , লটকন, আমড়া ও আমলকির উৎপাদনও বেশ বেড়েছে। বাংলাদেশের উর্বর মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কাজেই ফল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সম্ভব। বর্তমানে দেশে ২ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে ১ কোটি ২২ লাখ টন ফল উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ফল বাজারে বাংলাদেশের ফল রপ্তানি তেমন উল্øেখযোগ্য নয়। তবু প্রতি বছর পৃথিবীর ৪০টি দেশে বাংলাদেশের ফল রপ্তানি হয়। রপ্তানিকৃত উল্লেখযোগ্য ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁঠাল, আম, আনারস, জারা লেবু, এলাচি লেবু, আমড়া, জলপাই, সাতকরা, তৈকর, কদবেল, আমলকী, তেঁতুল, বেল, কামরাঙ্গা ও চালতা উল্লেখযোগ্য। উপমহাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি ফলের যথেষ্ঠ চাহিদা রয়েছে।

একটি দৈনিক পত্রিকায় (বণিক বার্তা ২৩. ৬. ২০২৫) প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৬ জেলা- যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুড়া, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরজুড়েই বাড়ছে ফলের চাষ। কারণ স্বল্প খরচ, উচ্চফলন, পর্যাপ্ত বাজার চাহিদাও ভালো দামের কারণেই ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন ওই এলাকার কৃষক। যশোর অঞ্চলে মোট ৫৩ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে বর্তমানে বিভিন্ন ফলের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে হচ্ছে ১০ ধরনের বিদেশি ফল, যার বার্ষিক উৎপাদন ৬০ হাজার ৯০৫ টন। এক সময় এসব বিদেশি ফলের চাষ হতো শুধুই শখের বশে বাড়ির আঙ্গিনায়, পুকুরপাড় কিংবা ছাদবাগানের সীমিত পরিসরে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে চাহিদা ও চাষ লাভজনক হওয়াতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে ফলগুলোর আবাদ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে অন্যেিদক আমদানিনির্ভরতা কমে সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

আজ থেকে ৬ থেকে ৭ বছর আগে ড্রাগন ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ফল। পাওয়া যেতো শুধু সুপারশপগুলোতে। এখন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এমনি গ্রামাঞ্চলের ফলের দোকানগুলোতে মিলছে ড্রাগন ফল। এই বিদেশি ফল আগে খুচরা বাজারে বিক্রি হতো ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে।

ড্রাগন ফলের অনেক উপকারিতা রয়েছে। ড্রাগন ডায়াবেসিট ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। ড্রাগন ফল ভিটামিন-সি-এর একটি প্রধান উৎস। ভিটামিন-সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি হজমে উন্নতি ঘটায়। হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করে। বার্ধক্যজনিত ত্বকের বিরুদ্ধে লড়াই করে। চুলকে নরম ও চকচকে করে সৌন্দর্য বাড়ায়। ড্রাগনে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, যা হাড়কে শক্তিশালী করে বার্ধক্যজনিত আঘাত এবং ব্যথা এড়াতে সহায়তা করে। এটি চোখের রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। ড্রাগন ফল গর্ভাবস্থায় নারীদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয় ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে।

দেশে দুই ধরনের ফল আমদানি করা হয়- তাজা ফল ও শুষ্ক ফল। তাজা ফলের মধ্যে রয়েছে- আপেল, আঙুর, মাল্টা, কমলা, বেদানা, নাশপাতি ও স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফল। অন্যদিকে শুষ্ক ফলের মধ্যে রয়েছে- খেজুর, কিশমিশ, আলুবোখরা ও বিভিন্ন বাদাম জাতীয় ফল। প্রতি বছর এ দেশে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন ফল আমদানি করতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। সরকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে ফল আমদানিকেও নিরুৎসাহিত করেছে। ফলে দেশের বাজারে বিদেশি ফলের প্রাপ্যতা শতকরা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে আমাদের বছরব্যাপী ফল চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। বারোমাসি আম, বারোমাসি পেয়ারা ও বারোমাসি কাঁঠালের মতো ফলের জাতগুলো দ্রুত কৃষক পর্যায়ে বিস্তার করতে হবে। প্রয়োজনে ফল উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে এইসব ফলের চারা বিতরণ এবং কৃষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি ও বিএডিসির নার্সারিগুলোতে এসব ফলের চারা সহজলভ্য হতে হবে। এ ছাড়া বেসরকারি নার্সারিগুলোতে এইসব বারোমাসি ফলের মাতৃগাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়