‘দ্বিতীয় ডান্ডি’ সরিষাবাড়ীর কান্নার ৮ বছর
হাজারো শ্রমিকের পায়ের শব্দে এখন ভোর আসে না যেখানে

তুঘলকি কারখানার সাইরেনটা আর বাজে না আট বছর ধরে। যে চত্বরে একসময় হাজারো শ্রমিকের পায়ের শব্দে ভোর হতো, সেখানে এখন ভর করেছে শ্মশানের নীরবতা।
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার একসময়ের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড ‘আলহাজ জুট মিল’ আজ কেবলই এক কঙ্কালসার ধ্বংসাবশেষ। ৩৯ একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এই কারখানার মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি আর পরিত্যক্ত ভবনের আড়ালে চাপা পড়ে আছে হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সপ্ন, ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার নির্মম আকুতি। ১৯৬৭ সালের যে গৌরব সরিষাবাড়ীকে দেশের ‘দ্বিতীয় ডান্ডি’র মর্যাদা এনে দিয়েছিল, ২০১৮ সালের ২১ জুলাই উৎপাদন বন্ধের পর তা আজ শুধুই এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস।
সোনালী অতীতের করুণ পরিণতি: বকেয়া ও ঋণের বেড়াজাল: ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রপ্তানিমুখী জুট মিলটিতে একসময় দিন-রাত মিলিয়ে কাজ করতেন প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার শ্রমিক। এখানে তৈরি সুতা, সুতলি ও চটের বস্তা বিদেশের বাজারে বিক্রি করে অর্জিত হতো বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু দীর্ঘদিনের লোকসান, অব্যবস্থাপনা আর ব্যাংক ঋণের জটিলতায় থমকে যায় এই চাকা।
মিল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, মোট লোকসান: প্রায় ৮০ কোটি টাকা। ব্যাংক ঋণ ১৫ কোটি টাকা। শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের বকেয়া: প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিসহ আরও প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) সুবিধা না পাওয়া এবং তৎকালীন কিছু শ্রমিক নেতার অনিয়ম মিলটিকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
মিল বন্ধ হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে চটকলের দক্ষ শ্রমিকেরা আজ বাধ্য হয়েছেন রিকশার হ্যান্ডেল ধরতে কিংবা রাজমিস্ত্রির কোদাল চালাতে।
নারী শ্রমিক সাবিনা বেগম জানান, "মিলে কাজ করে সপ্তাহে তিন হাজার টাকা পেতাম, সংসার ভালো চলত। এখন বেকার বসে আছি।"
সাবেক শ্রমিক আলমগীর এখন কোনোমতে অটোরিকশা চালিয়ে দিন পার করছেন।
জীবিকার খোঁজে কুমিল্লায় গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা মোজাম্মেল হক এখন কাজ করছেন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। সুযোগ পেলে এরা সবাই আবার নিজেদের চেনা কর্মস্থলে ফিরতে চান। আলহাজ জুট মিল বন্ধ হওয়ার ধাক্কা লেগেছে পুরো সরিষাবাড়ীর অর্থনীতিতে। স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী লালু মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, আগে সপ্তাহে যা বিক্রি হতো, এখন মাসেও তা হয় না। ভ্যানচালক ও পরিবহন শ্রমিকদের আয় কমে গেছে বহুগুণ।
সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন স্থানীয় পাট চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরও জেলায় ২৩ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পাট উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় মিলটি বন্ধ থাকায় কৃষকেরা পাটের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাট ব্যবসায়ী ফজলুল হকের মতে, দূর-দূরান্তে পাট পাঠাতে এখন পরিবহন খরচ ও ঝুঁকি দুই-ই বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করলে এই মিলটিকে আবার লাভজনক করা সম্ভব।
চারকোল উৎপাদন: পাটকাঠি থেকে চারকোল বানিয়ে তা ফেসওয়াশ, প্রিন্টার কালি ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
ভিসকস সুতা: পাট থেকে উচ্চমূল্যের ভিসকস সুতা তৈরি সম্ভব, যা আমদানিতে প্রতিবছর দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
মিলের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী খান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা এখনো উৎপাদন শুরু করতে প্রস্তুত। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা। ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ক্যাশ ক্রেডিট (সিসি) সুবিধা নিশ্চিত করা। এবং বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য জরুরি অর্থায়ন।









































