তানহা খানম

  ৯ ঘণ্টা আগে

মুক্তমত

শিক্ষা ক্ষেত্রে এআই : বিপ্লব নাকি মেধা বিকাশের অন্তরায়?

একসময় কোনো জটিল বিষয়ে সাহায্যের জন্য শিক্ষার্থীদের নির্ভর করতে হতো বই, শিক্ষক কিংবা কোচিংয়ের ওপর। আজ সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক সহকারী- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, ধারণা ব্যাখ্যা করছে, এমনকি গবেষণার প্রাথমিক সহায়তাও করছে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে আমাদের। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পৃথিবীতে Artificial Intelligence (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ডিপসিকসহ বিভিন্ন এআই ব্যবহার করে খুব সহজেই তাদের পড়ালেখাবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে ফেলছে। এআই-এর মাধ্যমে অতি দ্রুত শিক্ষার্থীরা এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশনসহ বিভিন্ন একাডেমিক রিসার্চে নানা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, জটিল সমস্যা সমাধান এবং নতুন ধারণা অন্বেষণ করতে পারে। এআই শিক্ষাকে করেছে সহজলভ্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সময়োপযোগী এবং জ্ঞান অর্জনের পথে আরো কার্যকর। কিন্তু, এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এআই কি শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে আশীর্বাদ হয়ে কাজ করছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কিছু চ্যালেঞ্জ?

এআই-এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বয়ে আনতে পারে শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিলতা। এআই শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা হ্রাস করে। এটির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা একজন শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীরা অতি সহজে ও দ্রুত যেকোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, তারা আর গভীরভাবে চিন্তা করতে চায় না। এআই প্রদানকৃত উত্তরই তারা হুবুহু গলাধঃকরণ করে পরীক্ষার হলে গিয়ে খাতায় উগলে দিচ্ছে। এটি তাদের আত্মনির্ভরশীলতা হ্রাস করে তাদের করে তুলছে অলস। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশ, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানকে শানিত করা। কিন্তু, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীর চিন্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের রূপান্তরিত করছে যান্ত্রিক মানবে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘প্রবন্ধ লেখার শুরতেই এআই টুল যেমন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি গঠন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কে কগনিটিভ ডেড তৈরি হয়।’ তাছাড়াও এআই যে সবসময় সঠিক তথ্য প্রদান করে এমনটাও নয়। প্রায়সময়ই দেখা যায়, চ্যাটজিপিটি, জেমিনির মতো এআই টুলগুলো ভুল তথ্য প্রদান করছে। এআই প্রায়ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাল্পনিক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করে থাকে, যাকে এআই পরিভাষায় হ্যালুসিনেশন বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও এআই ব্যবহারকারীর ডেটা প্রাইভেসি বা গোপনীয়তার ঝুঁকি বহন করে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, গ্রেড এবং আচরণগত ডাটাবেজ এআই সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকে। Velvetech- এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ডেটা হ্যাকারদের কবলে পড়া এবং বাণিজ্যিকভাবে অপব্যবহার হওয়ার চরম ঝুঁকি বহন করে থাকে। তাহলে কি আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে Artificial Intelligence (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বন্ধ করে দেব?

উত্তর হলো-না। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। তবে এর ব্যবহার হতে হবে নিয়ন্ত্রিত, বিচক্ষণ, দায়িত্বশীল ও মানবকল্যাণমুখী। শিক্ষাক্ষেত্রে এআই-এর সঠিক ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং এজন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই এর মৌলিক সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে- রাখতে হবে এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা, এটির কার্যকর ব্যবহারের নিয়ম এবং প্রযুক্তিটির সুবিধা-সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনামূলক চিন্তা করার সক্ষমতা। এআইকে মানুষের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করে শিক্ষার শক্তিশালী সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, যা একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের তথ্যের সত্যতা যাচাই, সঠিক উৎস খুঁজে বের করা এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে। একইসঙ্গে, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। সবশেষে বলা যায়, ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থা হতে চলেছে আরো প্রযুক্তিনির্ভর, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও দক্ষতাভিত্তিক। সেই বাস্তবতায় Artificial Intelligence (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে এর দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর। এআইকে মানুষের বিকল্প নয়, বরং চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার সহায়ক হিসেবে কাজে লাগাতে পারলেই প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে উঠবে একটি আরো সমৃদ্ধ, উদ্ভাবনী ও টেকসই শিক্ষাব্যবস্থা।

লেখক : শিক্ষার্থী

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

tanhakhanom990@gmail

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়