এম. খান
মুক্তমত
বিশ্বজনীন বাবা স্মরণে

মহান আল্লাহর অন্যতম নেয়ামত ‘বাবা’। সন্তানের ভূ-পৃষ্ঠে আমন্ত্রণের আহ্বায়ক যিনি তিনি কৃতজ্ঞতাভাজন ‘বাবা’। ধরার ধুলিতে সন্তান আবির্ভাবের ক্ষণ হতে বয়োঃপ্রাপ্ত পর্যন্ত ‘বাবা’ আদর্শিক, শিক্ষা-দীক্ষায় উপযুক্ত করে কর্মে সংযোগসহ পরিণয় সূত্রে পৃষ্ঠপোষকতায় যার অসামান্য ভূমিকা তিনি বাবা।
‘বাবা’ আবদারের ম্যাজিক কার্ড : জীবনের স্তরে স্তরে দুর্জয়, দুর্লভ, দুনির্বার, সর্বংসহা, যুধিষ্ঠির ও অকুতোভয় তিনি হলেন ‘বাবা’। যিনি সন্তানের ওপর প্রলয়ংকারী কুণ্ডপ্রভাব কখনোই দেয়নি। এক কথায় সন্তানের শক্তি, সাহস, নির্ভরতাসহ বেড়ে উঠার নেপথ্য কারিগড় যার অপর নাম ‘বাবা’।
মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ত্রিশজন মুক্তিযোদ্ধার ৯ মাস আশ্রয়, সুরক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহের জন্য স্বীকৃত গাজীপুরের মোত্তারপুর গ্রামের গান বাড়ির বাংলো। তাছাড়াও সনাতন ধর্মীদের আশ্রয়দানসহ সমাজে আরো নানা অবদানে পরহিত, পরিকীর্তিত এ পরাৎপরায় সুখ্যাতি ছিল। গ্রামের নারী-পুরুষদের সঙ্গে আমার তিন চাচা ও বাবার অসামান্য অবদানের কারণে স্থানীয় রাজাকাররা ‘খান বাড়ির’ বিপক্ষে অবস্থান নেয়। যা প্রকাশ পায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের কৃতকর্মের মাধ্যমে।
স্মৃতি-১ : জুলাই ১৯৭৭। আমি গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। প্রায় রাতেই গ্রামবাসী থাকত ডাকাত আতঙ্কে। সেজন্য রাতে রাস্তার মোড়ে পাহাড়া থাকত- বস্তিয়ালা জাগো... স্বরে চিৎকারের পর বাবা, আমি এবং ছোট ভাই (বয়স ৪) ব্যতীত বাড়ির সবাই অন্যত্র ছিল। তামসী রাত ২টার দিকে চাচাতো ভাই রোমান, পনির এবং আজগর চিৎকারে বলে ডাকাত আসছে... তখনই ডাকাত দল তাদেরকে গুলি করলেও মিস হয়। গুলির শব্দের আগেই অবস্থানরত বাড়িতে সবাই পশ্চিমের পাটক্ষেতে এবং বাবা আমার ডান হাতে ধরে ও সুপ্ত ভাইকে কোলে নিয়ে দক্ষিণের পাটক্ষেতে লুকায়। সে সময় বৃষ্টিসহ বজ্র চমকানিতে ভাই কেঁদে ওঠে। বাবা তার মুখ চেপে ধরে ডাকাতের কবল থেকে আমাদের প্রাণরক্ষা করে। তাই আমার বার্তা- যাদের বাবা আছেন, তারা সৌভাগ্যবান। বাবাকে সময় এবং ভালোবাসা দিবেন, কেননা যেকোনো মূহূর্তে এ সময়টা থেমে যাবে।
স্মৃতি-২ : ভাদ্রের গোধূলি ১৯৭৮ খ্রি.। বাবা উঠানে নতুন আমন ধান ছাটাই শেষে ক্লান্তি নিবারণে চা-পানে স্থানীয় সেগুনতলা বাজারে যাবে।
যাবার কালে আমাদের ছোট্ট পুকুরে দৃশ্যমান এক মানব শিশুর পায়ের বৃদ্ধা আঙুল ভাসছে। তাৎক্ষণিক বাবা তাকে ধরতে গিয়ে দেখে চাচাতো ভাই (জয়নুল আবেদীন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা) এর মেয়ে মনি। বাবা চিৎকার করে বলে মনি পুকুরে ডুবে গেছে- তখন বায়ুবেগগামী সবাই এসে দেখে মনি মুমূর্ষু। চাচাতো ভাই রোমান, পনির এবং বাড়ির সবার উপস্থিতিতে ঝাঁকিয়ে পানি বের করে ক্রমান্বয়ে সুস্থ হয়। সেদিন মনির করুণ পরিণতি দেখে মনির মা মাটিতে ধাপড়ায়ে কেঁদেছে। মহান আল্লাহ মনিকে সুস্থ করেন এবং বর্তমানে ইউএসএ কর্মরত। মনির মা এবং আমার বাবাসহ অসংখ্য মা-বাবা মহাকাশে অবস্থান করছেন। তাদের না বলা কথা বিনয়ের সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। মহাকাশের পানে যখনই চোখ যায়, মনে হয় উজ্জ্বল নক্ষত্রটি তুমি। বাবা চলে গেলেন ঠিকই উনার শূন্যতা টের পাই প্রতি নিশ্বাসে।
স্মৃতি-৩ : ১৯৭৮ খ্রি. শীতের প্রভাতকল্লায় স্কুলের প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ শুনি আমাদের গোশালে অগ্নিকাণ্ড। নিমিষেই গোশালা, খড়ের পাড়া ভস্মীভূত। লাল বাছুরটা পুড়ে মৃত্যুবরণ করে, গাভিটার লেজ পোড়া যায়। পরিশেষে দৃশ্যমান ১টি কোদাল, ১টি দা এবং ১টি কুড়াল বেহাত হয়। সেদিনের সে কঠিন মূহূর্তে বাবা আমাদের শান্ত ও সংযতের পরামর্শ দেন।
স্মৃতি-৪ : ১৯৮৪ খ্রি. এসএসসি পরীক্ষার ১০ দিন আগে বড় বোনের আশীর্বাদ নিতে ঢাকায় যাই। দু’দিন পর বাড়ি ফিরে শুনি পড়ার ঘরে সিঁধ কেটে সব নিয়ে গেছে সিঁধেল চোর। সেদিন পরিধানের সার্ট-প্যান্ট ছাড়া অবশিষ্ট ছিল না। পরদিন বাবা আদরের খাসিটি বিক্রি করে নতুন জামা-কাপড় সংগ্রহ করেন। সে দিনও কঠিন মুহূর্তে বাবা আমাদের শান্ত ও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তাই বিশ্বজনীন বাবা দিবসে- সন্তানের একদণ্ড শান্তি আর একটু হাসি ফোটাতে যারা স্বীয় স্বতেজ জীবনটা নিঃশেষ করেন তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
masudkhan6919@gmail. com
"





































