মাসুম বিল্লাহ
দৃষ্টিপাত
আধুনিকতার আলোয় ম্লান হচ্ছে মানবিকতার প্রদীপ

সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, বদলে যায় মানুষের জীবনযাত্রার ধরন। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ আজ এমন এক যুগে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা জীবনকে করেছে সহজ, দ্রুত ও গতিশীল। পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। কয়েক সেকেন্ডে দূর দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, মুহূর্তেই পাওয়া যায় অজানা তথ্য। কিন্তু এই অভাবনীয় অগ্রগতির ভিড়ে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। মানুষ কি সত্যিই মানুষের আরো কাছে এসেছে? নাকি আধুনিকতার উজ্জ্বল আলোয় কোথাও ম্লান হয়ে যাচ্ছে মানবিকতার প্রদীপ?
একসময় বাংলার গ্রামীণ সমাজ ছিল পারস্পরিক সম্পর্ক, বিশ্বাস ও ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। তখন সমাজ মানেই ছিল পরিবার, আর গ্রামের মানুষ মানেই ছিল একে অপরের আপনজন। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় সবাই ছিল পরস্পরের পাশে। আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু রক্তের বন্ধনে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিবেশী, গ্রামের প্রবীণ মানুষ কিংবা দূর সম্পর্কের পরিচিতজনও হয়ে উঠতেন আপনজনের মতো। সেকালের গ্রামীণ জীবনের সরলতা ছিল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হতো কর্মব্যস্ততা। কৃষকের মাঠে যাওয়া, গৃহস্থের ঘরের কাজ, পুকুরঘাটে নারীদের মিলন, সন্ধ্যায় উঠানে বসে গল্প-আড্ডা। সবকিছুর মধ্যেই ছিল সামাজিক বন্ধনের উষ্ণতা। তখন মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল সম্পর্ক। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ছিল গভীর ও আন্তরিক।
আজ প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের অসীম সুযোগ দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু ভার্চুয়াল এই সম্পর্কগুলো কি সবসময় হৃদয়ের সম্পর্ক হয়ে উঠছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর সংখ্যা বাড়লেও বাস্তব জীবনে একাকিত্ব কেন বাড়ছে? একই ঘরে বসে থাকা মানুষও কেন আলাদা আলাদা পর্দায় ডুবে থাকে? এই ধ্রুব বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলছে। আগে প্রতিবেশীর বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে মানুষ ছুটে যেত। এখন অনেক সময় পাশের ঘরের মানুষের খবর রাখারও সময় হয় না। আগে গ্রামের কোনো অসুস্থ মানুষের পাশে পুরো সমাজ দাঁড়াত, এখন অনেক ক্ষেত্রে মানবিক সহযোগিতার জায়গা দখল করেছে আনুষ্ঠানিকতা। সম্পর্কের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা কমেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা কিছু টাকা বা স্বর্ণালংকারের জন্য একজন আরেকজনকে হত্যা করে। কখনো বা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও দুঃজনক হলো দুর্বৃত্তরা যখন কোনো মানুষকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায় তখন কেউই ওই আহত মানুষটার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় না। কোনো এক অজ্ঞাত ভয়ে। এটিই এখন বড় প্রশ্ন। তাহলে মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ কমে গেছে। সেকালে সমাজে প্রবীণদের প্রতি সম্মান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ। মুরব্বিদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ সমাজ পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে অনেক সমস্যা সামাজিকভাবে সমাধান করা হতো।
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, একটি জাতির মহানত্ত্ব ও নৈতিক অগ্রগতি বিচার করা যায় তার প্রাণীদের প্রতি আচরণ দেখে। অবশ্য সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও ছিল। সব সিদ্ধান্ত সবসময় ন্যায়সংগত ছিল না। তবে সামাজিক দায়বদ্ধতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জবাবদিহিতার যে চেতনা ছিল, তা আজকের সমাজের জন্যও শিক্ষণীয়। একসময় গ্রামের বাড়িগুলোতে নিরাপত্তার জন্য উঁচু দেয়াল, লোহার গেট কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল না। মানুষের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ছিল মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস। বাঁশের বেড়া, খোলা উঠান আর প্রতিবেশীর আন্তরিকতাই ছিল নিরাপত্তার প্রতীক। আজ আমরা নিরাপত্তার জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, কিন্তু মানুষের মনে অবিশ্বাস, দূরত্ব ও অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই বেড়েছে।
তবে অতীতকে কেবল সোনালি সময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পুরোনো সমাজে নানা সীমাবদ্ধতাও ছিল। নারীর অধিকার সীমিত ছিল, শিক্ষার সুযোগ কম ছিল, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল দুর্বল। আধুনিক সমাজ এসব ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এনেছে। তাই আধুনিকতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন হলো আধুনিকতার সুবিধার সঙ্গে অতীতের মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানো।
সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানবিকতা। অর্থ, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকে। শুধু বড় বড় ভবন নির্মাণ করে উন্নত সমাজ গড়া যায় না; উন্নত সমাজ গড়তে প্রয়োজন সুন্দর মন, সহনশীল আচরণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।
বর্তমান সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক সহাবস্থানের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের উৎসব ও আনন্দে অংশ নিত। প্রতিবেশীর বিপদকে নিজের বিপদ মনে করত। সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্য আজও আমাদের জন্য অনুসরণীয়। বিভাজন নয়, ঐক্যই পারে সমাজকে শক্তিশালী করতে।
আজ আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তির ব্যবহার কমানো নয়, বরং প্রযুক্তিকে মানবিকতার সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা। মোবাইল ফোন যেন মানুষের মধ্যে দেয়াল তৈরি না করে, বরং দূরত্ব কমানোর মাধ্যম হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন কৃত্রিম সম্পর্কের ভিড় না বাড়িয়ে সত্যিকারের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করে। আজ আমরা টিভি, মোবাইল ও কম্পিউটারের স্ক্রিনে আটকে গেছি। লাইক, শেয়ার এবং নানা মন্তব্যের প্রতিযোগিতায় মত্ত। তবে বস্তুত মন্তব্য হোক গঠনমূলক, লাইক করা হোক পাশের মানুষকে। শেয়ার করা হোক প্রতিবেশীদের ভালো কাজ। তাহলেই তৈরি হবে একটি সুবর্ণ গ্রাম তথা আদর্শ সমাজ।
একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের আচরণে, ভালোবাসায় এবং দায়িত্ববোধে। তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুললেই হবে না, তাদের শেখাতে হবে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা। কারণ প্রযুক্তি মানুষকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু মানবিকতাই মানুষকে মহান করে।
সত্যি বলতে, সেই পুরোনো দিনের গ্রাম, পুকুরঘাটের আড্ডা, মাটির ঘরের আন্তরিকতা কিংবা বিপদে-আপদে ছুটে আসা মানুষের সেই দৃশ্য হয়তো আর আগের মতো ফিরে আসবে না। কিন্তু সেই সময়ের ভালো দিকগুলো আমাদের বর্তমান সমাজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আধুনিকতার আলো প্রয়োজন, কারণ সেটিই সভ্যতার অগ্রযাত্রার পথ দেখায়। কিন্তু সেই আলো যেন মানবিকতার প্রদীপকে নিভিয়ে না দেয়। প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি হৃদয়ের উন্নয়নও জরুরি। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত যন্ত্র নয়, মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তাই আধুনিকতার পথে এগিয়ে যেতে যেতে আমাদের মনে রাখতে হবে সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু উন্নত জীবনযাপনে নয় বরং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসায়। মানবিকতার সেই প্রদীপ যতদিন জ্বলবে, ততদিন সমাজ থাকবে আলোকিত।
অতীতের প্রতি নস্টালজিয়া আমাদের আবেগ দেয়, কিন্তু তার শিক্ষা আমাদের পথ দেখায়। তাই হারিয়ে যাওয়া দিনের জন্য শুধু দীর্ঘশ্বাস নয়, সেখান থেকে প্রাপ্ত মানবিক মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সেদিন আর ফিরবে না তবে ফিরুক সেদিনের মূল্যবোধ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
"





































