ক্রীড়া ডেস্ক

  ৬ ঘণ্টা আগে

আলোচনা-সমালোচনায় ঘেরা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপকে এক মাসে অনুষ্ঠিত ১০৪টি সুপার বোলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে ৪৮টি দল। কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলেছে। তবে এতে কি টুর্নামেন্টের মান কমে গেছে?

এ ছাড়া ছিল বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন বিরতি, আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন। এতে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন দেখিয়ে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পেয়েছে।

অত্যধিক টিকিটমূল্যও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু এতে কি দর্শকদের উপস্থিতি কমেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ভিসা জটিলতা ও ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফ্লোরিয়ান বালোগুনের লাল কার্ড বাতিলের জন্য হস্তক্ষেপ করেন। এদিকে ফিফার প্রধান রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা সময় নষ্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং ফুটবলের বিভিন্ন নিয়মে পরিবর্তন আনেন। কিন্তু এসব পরিবর্তন কি সত্যিই কার্যকর হয়েছে।

চলুন বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

বিশ্বকাপ ৪৮ দলে সম্প্রসারণ কি সত্যিই সার্থক ছিল? নতুন দলগুলোর অংশগ্রহণের কারণে গ্রুপ পর্বে ছিল নানা চমক ও রঙিন গল্প। বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণই হলো নতুন দলগুলোর অভিষেক দেখা। আর সেই দিক থেকে কেপ ভার্দে ছিল অন্যতম বড় চমক। মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে ড্র করে নিজেদের গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। অন্যদিকে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারের পরও কুরাসাও ইকুয়েডরের বিপক্ষে চমকপ্রদ ড্র করে। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রও পর্তুগালের বিপক্ষে ড্র করে নকআউট পর্বে ওঠে যায়। এই গল্পগুলো না থাকলে গ্রুপ পর্ব অনেকটাই একঘেয়ে হয়ে যেত, কারণ শক্তিশালী দলগুলো তুলনামূলক সহজেই নিজেদের কাজ সেরে নিয়েছে। মোট ৭২টি ম্যাচ খেলার পরও মাত্র ১৬টি দল বিদায় নেওয়ার আগে পুরো একটি বিশ্বকাপেই মোট ম্যাচের সংখ্যার সমান ছিল। এর সঙ্গে ফিফার নতুন নিয়মও সমালোচিত হয়েছে, যেখানে গোল ব্যবধানের আগে হেড-টু-হেড ফলাফলকে টাইব্রেকার হিসেবে ধরা হয়।

আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল নকআউটে ওঠার সুযোগ পাওয়ায় অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ে, কিংবা অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া জানত যে ড্র করলেই উভয় দল পরবর্তী পর্বে যাবে। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। এরপর নকআউট পর্ব থেকেই প্রকৃত নাটকীয়তা শুরু হয়। কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে কঠিন লড়াইয়ে আটকে রাখে, যদিও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে যায়। ফলে তারা দুই বিশ্বকাপ ফাইনালিস্টের (আর্জেন্টিনা ও স্পেন) বিপক্ষেই নির্ধারিত ৯০ মিনিটে অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব অর্জন করে। বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ না হলে কেপ ভার্দে এই আসরে খেলতেই পারত না। আর ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনিয়া, যিনি কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক অভিষেকে বড় ভূমিকা রেখেছেন, তার গল্পও বিশ্ববাসীর সামনে আসত না।

হাইড্রেশন বিরতি : ফিফার দাবি ছিল, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই হাইড্রেশন বিরতি চালু করা হয়েছে। ক্রীড়ার ন্যায্যতা বজায় রাখতে প্রতিটি ম্যাচেই সমানভাবে এই বিরতি দিতে হবে। এমনকি আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এয়ার-কন্ডিশন্ড) স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম কার্যকর ছিল। যুক্তরাজ্যের বাইরে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এই বিরতির সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করে। রেফারি বাঁশি বাজানোর ২০ সেকেন্ড পর বিজ্ঞাপন শুরু করা যেত এবং খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার অন্তত ৩০ সেকেন্ড আগে তা শেষ করতে হতো। টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, এই বিরতিগুলো নিয়ে দর্শকদের অসন্তোষও তত বেড়েছে। বারবার খেলা থেমে যাওয়ায় গ্যালারি থেকে জোরালো দুয়োধ্বনি শোনা গেছে।

বিবিসি স্পোর্টকে বিশেষজ্ঞরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ফক্স স্পোর্টসে বিশ্বকাপের একটি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের গড় মূল্য ছিল ২ লাখ থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ ও নকআউট পর্বে এর দাম বেড়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। বাস্তবে এই বিরতিগুলো কার্যত ট্যাকটিক্যাল টাইম-আউট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোচরা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের কৌশলগত নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে বেশ কয়েকটি ম্যাচের গতিপথও বদলে গেছে।

অন্য লিগেও কী এই বিরতি চালু হতে পারে : উয়েফা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই নিয়ম চালু করবে না। ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় লিগগুলোতেও এটি গ্রহণ করা হবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তবে আগামী বিশ্বকাপে আবারও এই হাইড্রেশন বিরতি দেখা গেলে তা মোটেও অবাক হওয়ার মতো হবে না।

কোলিনার সময় বাঁচানোর নতুন নিয়ম কি সফল হয়েছে : এই বিশ্বকাপে ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কোলিনার প্রধান লক্ষ্য ছিল খেলার গতি বাড়ানো। তিনি রেফারিদের নির্দেশ দেন, থ্রো-ইন, গোল-কিক ও বদলির সময় যেন খেলোয়াড়রা দ্রুত কাজ শেষ করেন। পাশাপাশি অযথা সময় নষ্ট করতে মিথ্যা চোটের অভিনয়ও কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা করা হয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রায় প্রতিটি বিলম্বের জন্য অতিরিক্ত সময় যোগ করা হয়েছিল। ফলে একটি ম্যাচের গড় দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছিল ১০১ মিনিট ২২ সেকেন্ড, যেখানে বল মাঠে ছিল গড়ে ৫৮ মিনিট ৩ সেকেন্ড। এবারের বিশ্বকাপে হাইড্রেশন বিরতির সময় বাদ দিলে একটি ম্যাচের গড় দৈর্ঘ্য ৯৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড, আর বল মাঠে ছিল গড়ে ৫৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ, খেলার সময় কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু সেই সময় অর্জনের জন্য ম্যাচের মোট দৈর্ঘ্য অনেক কম লেগেছে। ২০২২ সালে ম্যাচের মোট সময়ের ৫৭.৪ শতাংশ বল খেলায় ছিল। এবার সেই হার বেড়ে ৬০.৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

এই পরিবর্তনকে দুই দিক থেকেই সফল বলা যায়। খেলার গতি আগের তুলনায় আরো স্বাভাবিক হয়েছে, খেলোয়াড়দের সময় নষ্ট করার প্রবণতা কমেছে, দর্শকদের বিরক্তিও কমেছে এবং তারা আরো বেশি সময় ধরে প্রকৃত ফুটবল উপভোগ করতে পেরেছেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়