ডিন জোন্সের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত সবাই

ডিন মারভিন জোন্স (জন্ম : ২৪ মার্চ ১৯৬১ - মৃত্যু : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০)

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

ক্রীড়া ডেস্ক

কী পেস, কী স্পিন যেকোনো বোলিং অ্যাটাক সামলানোর খেলার ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন। ফুটওয়ার্কও ছিল দেখার মতো। ২২ গজের মধ্যে দৌড়ানোতেও ছিলেন দারুণ ক্ষিপ্র। খেলোয়াড়ি জীবন ছাড়ার পর পেশাদার ধারাভাষ্যকার বনে গিয়েছিলেন। কোচের ভূমিকাতেও বেশ সফল। চলমান ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) বিশেষজ্ঞের মতামত দিতেন অফিশিয়াল ব্রডকাস্টার স্টার স্পোর্টসের মুম্বাইয়ের স্টুডিও থেকে। পরশু রাতেও কলকাতা নাইট রাইডার্স ও মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মধ্যকার ম্যাচে ধারাভাষ্য দিয়েছেন। সেই ডিন জোন্স যে গতকাল এতটা আকস্মিকভাবে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবেন, তা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কেউই ভাবতে পারেননি। দাপটের সঙ্গে বোলিং অ্যাটাক সামলানো এই অস্ট্রেলিয়ান নিজেই করলেন হার্টঅ্যাটাক! দ্রুত হাসপাতালে নিয়েও ফেরানো গেল না তাকে। মৃত্যুকালে এই কিংবদন্তিতুল্য ক্রিকেটারের বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

কাল বেলা ১১টার দিকে নাস্তা খেয়ে আইপিএল সম্প্রচার সংক্রান্ত এক ব্রিফিং সেশনে উপস্থিত হন ডিন জোন্স। কাজ শেষে দক্ষিণ মুম্বাইয়ের যে সাত তারকা হোটেলে তিনি ছিলেন, তার বারন্দাতেই সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এমন সময় সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে জোন্স মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। হোটেলে থাকা অ্যাম্বুলেন্সে করে তৎক্ষণাৎ তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জোন্সের মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বকাপ জয়ী এই অস্ট্রেলিয়ানের আকস্মিক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ এবং হতবাক ক্রিকেট বিশ্ব। এক বিবৃতিতে স্টার স্পোর্টস লিখেছে, ‘অতীব দুঃখের সঙ্গে আমরা ডিন জোন্সের মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি। তিনি আকস্মিক হার্টঅ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছেন। আমরা তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। এই কঠিন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই আমরা। প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের ব্যাপারে আমরা অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’

ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহালিও জোন্সের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। শোক জ্ঞাপন করেছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট আরো বহু মানুষ। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস টুইট করেছেন, ‘ভয়াবহ সংবাদে ঘুম ভাঙল। তুমি নিছক আমার বিরুদ্ধে খেলা একজন প্লেয়ার ছিলে না। তুমি ছিলে আমার বন্ধু, আমার ভাই। পৃথিবীতে যেখানে যেখানে ক্রিকেট খেলা হবে, তোমার উপস্থিতি আর তোমার হাসি মিস করবে ক্রিকেটপ্রেমীরা। ওপারে শান্তিতে থাকো ডিনো।’

১৯৮৪ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল ডিন জোন্সের। একই বছরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে আত্মপ্রকাশ তার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছেন ৫২টি টেস্ট। মোট সংগ্রহ ৩৬৩১ রান। টেস্টে ১১টি সেঞ্চুরি। ওয়ানডে খেলেছেন ১৬৪টি। রান ৬০৬৮। সেঞ্চুরি ৭টি।

১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ২১৬ রান করলেও ১৯৮৬ সালে চেন্নাইয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ২১০ রানের কালজয়ী ইনিংস খেলেছিলেন জোন্স। সেই ইনিংসের জন্যই তিনি উপমহাদেশে সম্যক পরিচিত এবং বিখ্যাত। ভারত-অস্ট্রেলিয়ার সেই টেস্ট ম্যাচ টাই হয়েছিল। চেন্নাইয়ের অসহনীয় গরমে ব্যাট করতে করতে পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন জোন্স। অসুস্থ হয়ে মাঠেই বমি করে ফেলেছিলেন। তবু দমে যাননি। ভেজা রুমাল গলায় জড়িয়ে ব্যাটিং চালিয়ে গেছেন। ম্যাচের পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে স্যালাইন দিতে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, পরের বছরই ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। অজি অধিনায়ক অ্যালান বর্ডারের সেই বিশ্ব জয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন জোন্স।

অবসরের পর তার আবির্ভাব হয়েছিল ধারাভাষ্যকার হিসেবে। মাঠে নেমে কোন দল কী স্ট্র্যাটেজি নেবে, মূলত তা আগে থেকেই অনুমান করার চেষ্টা করতেন জোন্স। পাশাপাশি কোন ক্রিকেটারের কোথায় কী ভুল হয়েছে, তাও ধরিয়ে দিতেন। তাই তার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘প্রফেসর ডিনো’।

তবে একবার ধারাভাষ্য দিতে গিয়েই গভীর বিপাকে পড়েছিলেন জোন্স। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি টেস্ট ম্যাচে হাশিম আমলা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ও দেখতে উগ্রপন্থিদের মতো।’ দ্রুত জোন্সকে বরখাস্ত করে সংশ্লিষ্ট চ্যানেল। এরপর বেশ কিছুদিন তাকে ধারাভাষ্য দিতে দেওয়া হয়নি। পরে ক্ষমা চেয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাভাষ্যকারের প্যানেলে ফেরেন। কিন্তু তার কাজ মূলত ছিল স্টুডিওতেই। এ ছাড়া পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) ইসলামাবাদ ইউনাইটেড ও করাচি কিংসের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন জোন্স। তার অধীনে শিরোপাও জিতেছে ইসলামাবাদ।

চলমান আইপিএল শুরুর আগে তিনি ভারতে এসেছিলেন ম্যাচ নিয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত দিতে। কিন্তু বিধি বাম! যে দেশের মাটিতে অমর দ্বিশতরানের ইনিংস খেলেছিলেন, সেখানেই সবাইকে হতবাক করে শেষ হয়ে গেল জোন্সের জীবনের ইনিংস।

 

 

"