প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২১ জুলাই, ২০২৬

কূটনৈতিক সমাধানে এখনো প্রস্তুত ওয়াশিংটন : রুবিও

ইরানে টানা দশম দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

টানা দশম দিনের মতো রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সোমবার সকালে ও আগের রাতে রাতে তেহরান, সিরিক, জাস্ক, তাবরিজ ও চাবাহারসহ একাধিক শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ হামলা এমন একসময়ে হলো, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোয় তাদের তৃতীয় সেনাসদস্যের মৃত্যুর ঘোষণা দিয়েছে। একইসঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক মাস আগে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান সংঘাতের মধ্যে কার্যত ভেঙে পড়েছে। খবর আলজাজিরা ও বিবিসির। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের মাহশাহর ও ইমাম খোমেইনি বন্দরনগরীতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া দক্ষিণ উপকূলবর্তী হরমোজগান প্রদেশের সিরিক ও জাস্ক শহরের কাছে এবং বুশেহর প্রদেশের খভোরমুজ শহরের আশপাশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আইআরআইবি আরো জানায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাবরিজ শহরের কাছে তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের কোনারাক ও চাবাহার শহরে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। রাজধানী তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, সর্বশেষ মার্কিন হামলায় আবারও ইরানের দক্ষিণ উপকূলকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাবরিজে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত হলে, সাম্প্রতিক এ উত্তেজনা শুরুর পর এটিই হবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরটিতে প্রথম হামলা।

আসাদি বলেন, ‘আমরা আবারও গোলাগুলি ও পাল্টা হামলার আরেকটি রাত পার করছি।’ তিনি জানান, ইরানি পক্ষও পাল্টা হামলার প্রস্তুতির কথা বলছে। ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে তিনি বলেন, লোরেস্তান প্রদেশ থেকে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর আগে কুয়েত জানায়, তারা ‘শত্রুতাপূর্ণ ড্রোন হুমকির’ মোকাবিলা করেছে। রবিবার দ্বিতীয়বারের মতো বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। জর্ডানেও সাইরেন বাজলে দেশটির সেনাবাহিনী জানায়, তারা ইরানের ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। কুয়েত সরকার জানায়, রবিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্টে হামলা হয়েছে- যাতে আগুন লেগে যায়। তাদের দাবি, এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা। এদিকে সমুদ্রপথে উত্তেজনাও বেড়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, হরমুজ প্রণালীতে চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকেই তারা লক্ষ্যবস্তু করছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চারটি জাহাজ তাদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ‘অনিরাপদ পথ’ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল। এর মধ্যে দুটি জাহাজ ফিরে যায়, আর বাকি দুটি একটি ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি আইআরজিসি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং আরেকটি জাহাজ অচল করে দিয়েছে- যাতে তাদের ঘোষিত নৌ অবরোধের ‘পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করা যায়। সেন্টকম আরো জানায়, শনিবার উত্তর ইরাকে ইরানের একটি ভূপাতিত ড্রোনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় একজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন।

এছাড়া শুক্রবার জর্ডানে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার স্থানে ‘অজ্ঞাত পরিচয়ের মানবদেহের অবশিষ্টাংশ’ পাওয়া গেছে এবং সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। শুক্রবারের ওই হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরেকজন সেনাকে নিখোঁজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ এ মৃত্যুর ফলে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। এছাড়া ৪২০ জনেরও বেশি সেনা আহত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে শুরু হওয়া এ সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তীব্র হয়েছে।

কূটনৈতিক সমাধানে এখনো প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র : রুবিও

যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে তিনি বলেন, কোনো সমঝোতা বাস্তবসম্মত হতে হবে এবং ইরানকে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পালন করতে হবে। রবিবার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রুবিও বলেন, এক সপ্তাহ আগে ইরানের একটি বিবৃতি দেওয়ার কথা ছিল, যেখানে তারা ঘোষণা করত যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর আর হামলা চালানো হবে না। কিন্তু সেই ঘোষণা দেওয়ার পরিবর্তে ইরান তিনটি জাহাজে হামলা চালায়। তার ভাষায়, ঘটনাটি গত শুক্রবার বা শনিবার ঘটেছে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তনের আগে ইরানকে নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রুবিও আরো দাবি করেন, বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরে ‘ক্রমবর্ধমান বিভাজন’ দেখা যাচ্ছে। তার মতে, একদিকে রয়েছে আরো উগ্রপন্থি কট্টরপন্থিরা, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের ওপর হামলা চালিয়ে যেতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি পক্ষ, যারা ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ইরানের জন্য গঠনমূলক কিছু করতে চাওয়া ব্যক্তিরা যদি দেশটির রাষ্ট্রব্যবস্থা বা অন্তত আলোচনার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন, তাহলে সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হবে। ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে রুবিও অভিযোগ করেন, দেশটি তাদের বিপুল আর্থিক সম্পদ প্রক্সি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর পেছনে ব্যয় করেছে। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে হোক বা তেল রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে হোক, ইরানি সরকার যে অর্থই পেয়েছে তার প্রতিটি পয়সা হিজবুল্লাহর পেছনে বিনিয়োগ করেছে।

তিনি আরো বলেন, এছাড়া তারা হামাসে বিনিয়োগ করেছে এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া, হিজবুল্লাহ ও হামাসকে সমর্থন দিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। তার মতে, এ অর্থ ইরানের জনগণের কল্যাণে এবং দেশ গঠনে ব্যয় করা উচিত ছিল। রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলতে থাকা এবং দেশটি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ রাখার সময় পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহন নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রই বহন করবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিশ্বের পক্ষ থেকে জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে একমাত্র তারাই। এ কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, অন্যান্য দেশও এগিয়ে এসে অন্তত এ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সেবা পরিচালনার ব্যয় বহনে আর্থিক সহায়তা দিক বলে জানান রুবিও। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় হলো, তারা কি এমন একটি আন্তর্জাতিক নৌপথকে ইরানের মতো একটি দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেবে, যা তার ভাষায় ‘সম্পূর্ণ অবৈধ, আইনবহির্ভূত এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়