মো. জাহিদুল ইসলাম

  ২১ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬

সাফল্য-ব্যর্থতায় মহাযজ্ঞের সমাপ্তি

ফুটবল পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে শুধু একটি খেলা নয়, এটি আবেগ-ভালোবাসা। আর এ ভালোবাসা সর্বোচ্চ চূড়া হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রতি চার বছর পরপর যখন এ মহারণ মাঠে গড়ায়, তখন থমকে দাঁড়ায় গোটা বিশ্ব। মাঠের সবুজ ঘাসে রচিত হয় নতুন নতুন ইতিহাস। কোনো দল সাফল্যের মহাকাব্য লিখে অমরত্ব লাভ করে, আবার কোনো পরাশক্তি ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়ে ভক্তদের উপহার দেয় সীমাহীন হতাশা।

২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে থাকবে। সুবিশাল মহাযজ্ঞে ফুটবল বিশ্ব দেখেছে এক অভূতপূর্ব রোমাঞ্চ, অবিশ্বাস্য সব অঘটন, বুকভাঙা কান্না আর শেষ পর্যন্ত এক নতুন রাজার রাজ্যাভিষেক। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় তুলেছে লুইস দে লা ফুয়েন্ত-লামিন ইয়ামালের স্পেন। টিকিটাকা ঘরানার সঙ্গে আধুনিক গতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে স্প্যানিশরা যেভাবে পুরো টুর্নামেন্ট শাসন করল, তা ফুটবল ইতিহাসে এক রূপকথার মতো। অপরাজেয় এক অভিযাত্রা ২০১০ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষা। অবশেষে ২০২৬ সালে এসে সোনালি ট্রফিতে আবারও চুমু আঁকল স্প্যানিশরা। তবে এ জয় শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, এটি হলো নিখুঁত ফুটবলশৈলী এবং তারুণ্যের জয়জয়কার। একসময় স্পেনের ফুটবল মানেই ছিল শুধু পাসিং ফুটবল বা ‘টিকিটাকা’। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেন দেখিয়েছে এক ভিন্ন রূপ। তারা শুধু বল পজিশন ধরে রাখেনি, বরং প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে উইং দিয়ে আক্রমণ করেছে অবিশ্বাস্য গতিতে। মধ্যমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক দুর্দান্ত ভারসাম্য ছিল এই দলে। এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে সাফল্য ও ব্যর্থতার এক রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল সবেই শেষ হলো ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত একটি আসর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৪৮টি দলের এ মহাযজ্ঞে যেমন দেখা গেছে নতুন পরাশক্তিদের উত্থান, তেমনি ছিল চিরচেনা জায়ান্টদের ভেঙে পড়ার গল্প।

প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেক সমালোচনা ও সংশয় ছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, ছোট দলগুলো বিশ্বমঞ্চে বুকচিতিয়ে লড়াই করেছে, যা ফুটবলকে আরো বেশি বিশ্বায়ন ও রোমাঞ্চ এনে দিয়েছে। তথাকথিত ‘ছোট’ দলগুলো আফ্রিকার বা এশিয়ার পরাশক্তিদের মতোই ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় দলকে হারিয়ে চমকে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বের নাটকীয়তা ছিল এ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে স্টেডিয়ামগুলোর গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বিশেষ করে সকার (ফুটবল) নিয়ে উত্তর আমেরিকায় যে নতুন জোয়ার তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ফুটবলের দারুণ সাফল্য। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি ছিল কিছু চেনা জায়ান্ট বা ফেভারিট দলের গ্রুপ পর্ব বা নকআউটের শুরুতেই বিদায় নেওয়া। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং কৌশলী ভুলের কারণে বিদায় নিতে হয়েছে বড় বড় তারকাখচিত দলকে।

তিনটি বিশাল দেশজুড়ে খেলা হওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করতে হয়েছে। এর ফলে অনেক বড় তারকা নকআউট পর্বে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং তাদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে ব্যর্থ হন। বেশ কয়েকজন বিশ্বসেরা ফুটবলার, যাদের নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তুমুল উন্মাদনা ছিল, তারা প্রত্যাশার চাপ সামলাতে না পেরে বা ইনজুরির কারণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে যে ফুটবলে এখন আর কোনো দলকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মাঠের লড়াইয়ে কৌশল আর মানসিক শক্তির জয় হয়েছে, আর নামের ওপর ভরসা করে থাকা দলগুলোকে বিদায় নিতে হয়েছে খালি হাতে।

এ স্পেনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল তরুণ তুর্কিদের ওপর কোচের অগাধ বিশ্বাস। টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা উইঙ্গারদের গতি এবং ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। একইসঙ্গে মাঝমাঠে অভিজ্ঞ মিডফিল্ডারদের চতুর পাসিং ও গেম রিডিং দলকে কঠিন সময়ে ভেঙে পড়তে দেয়নি। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত স্পেনের প্রতিটি ম্যাচ ছিল আধিপত্যের গল্প। নকআউট পর্বে কঠিন প্রতিপক্ষদের একে একে বিদায় করে দিয়ে ফাইনালে নিজেদের স্নায়ু ধরে রেখেছিল তারা। ফাইনালে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্প্যানিশদের যে গর্জন, তা ছিল বিশ্ব ফুটবলে তাদের নতুন সাম্রাজ্য শুরুর ঘোষণা।

এ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ফুটবল মানচিত্রের সম্প্রসারণ। এশিয়া ও আফ্রিকার দলগুলো যেভাবে ইউরোপ-আমেরিকার জায়ান্টদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে, তা ছিল দেখার মতো। ‘ছোট দল’ বলে যে ফুটবলে এখন আর কিছু নেই, তা এ টুর্নামেন্টে প্রমাণ হয়েছে। নবাগত দলগুলোর লড়াকু মানসিকতা ফুটবলকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর স্টেডিয়ামগুলোয় প্রতি ম্যাচে গ্যালারি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সকার’ নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা ফুটবলের বাণিজ্যিক ও সামাজিক প্রসারে এক বিশাল মাইলফলক। প্রতিটি ভেন্যুতে উৎসবমুখর পরিবেশ এবং চমৎকার ব্যবস্থাপনা এ আয়োজনকে সফল করেছে।

চার দলের গ্রুপ ফরম্যাট বহাল রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল নিখুঁত। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোয় যেভাবে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে টেবিলের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছিল, তা কোটি কোটি দর্শককে টিভির সামনে ধরে রেখেছিল। শেষ মুহূর্তের গোল এবং নকআউটে যাওয়ার সমীকরণ এ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর আসরে পরিণত করে। যেখানে আলোর ঝলকানি থাকে, সেখানে অন্ধকারের গল্পও থাকে। এ বিশ্বকাপ যেমন অনেকের জন্য আনন্দের বার্তা এনেছে, তেমনি কিছু পরাশক্তি ও তারকার জন্য ছিল চরম হতাশার।

এ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী কিছু পরাশক্তির অকাল বিদায়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, দুর্বল রক্ষণভাগ এবং ট্যাকটিক্যাল ভুলের কারণে অনেক ফেভারিট দল কোয়ার্টার ফাইনাল বা তার আগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে না পারা বা নকআউটের শুরুতেই বিদায় নেওয়া দলগুলোর জন্য এ বিশ্বকাপ ছিল একটি দুঃস্বপ্ন। ফুটবলপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন বর্তমান যুগের সেরা কিছু মহাতারকার জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখার জন্য। কিন্তু প্রত্যাশার প্রচণ্ড চাপ, প্রতিপক্ষের কড়া মার্কিং এবং বয়সের ভারে অনেক বড় বড় তারকা নিজেদের নামের প্রতি বিচার করতে পারেননি। বিশ্বমঞ্চে তাদের এ নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স এবং অশ্রুসিক্ত বিদায় ভক্তদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে। এ টুর্নামেন্ট আমাদের শিখিয়েছে যে, শুধু অতীতে জেতা ট্রফি বা নামের ওপর ভরসা করে আধুনিক ফুটবলে টিকে থাকা সম্ভব নয়। মাঠে যারা ৯০ মিনিট রক্ত জল করা পরিশ্রম করবে এবং সঠিক কৌশল অবলম্বন করবে, শেষ হাসি তারাই হাসবে। আর সেই হাসির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশটি ছিল স্পেন। চমৎকার ও নান্দনিক ফুটবল খেলে বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে তারা প্রমাণ করেছে, তারাই এ মুহূর্তে বিশ্বের সেরা। ২০২৬ বিশ্বকাপ একদিকে যেমন ব্যর্থদের আত্মসংশোধনের বার্তা দিয়ে গেল; অন্যদিকে সাফল্যের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে স্পেনের রাজমুকুট পরানোর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি হলো।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়