সালাহ উদ্দিন বাবর

  ২১ জুলাই, ২০২৬

রাজধানীতে বেপরোয়া ছিনতাইকারী চক্র

রাজধানী ঢাকায় দিন-রাতের ব্যবধান যেন আর নেই। সুযোগ পেলেই সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের শিকারে পরিণত হচ্ছেন পথচারী, যাত্রী কিংবা ব্যবসায়ীরা। মুহূর্তেই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা, মোবাইল, মূল্যবান সামগ্রী; অনেক ক্ষেত্রে হামলারও শিকার হচ্ছেন মানুষ। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হলেও থামছে না তাদের তৎপরতা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, পুলিশের খাতায় যা এসেছে, তার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। কেননা ভুক্তভোগীদের অনেকেই মামলা করতে চান না।

রাজধানীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। বিশেষ করে মধ্যরাত ও ভোররাতে নির্জন সড়ক, গলি কিংবা গণপরিবহনের আশপাশে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারী চক্র। সুযোগ বুঝেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হামলা চালিয়ে টাকা, মোবাইল, মোটরসাইকেল বা অন্যান্য মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় নতুন কেউ এলেই তারা হয়ে যায় ছিনতাইকারী চক্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই ছুরি বা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করা হয়। কেউ বাধা দিতে গেলে শারীরিক হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ।

রাজধানীর সবুজবাগের বাসিন্দা ও পেশায় ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান গত ২ জুলাই মোটরসাইকেলে ছেলেকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে আত্মীয়ের বাসা থেকে ফিরছিলেন। পথে কল্যাণপুরে পানি কিনতে থেমেছিলেন তারা। এ সময় দেশীয় অস্ত্রের মুখে তাদের অপহরণ করে একটি পুরোনো ভবনের চিলেকোঠায় নিয়ে আটকে নির্যাতন করে দুর্বৃত্তরা। পরে ৫০ হাজার টাকা আদায় করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। গত ৪ জুলাই কলাবাগান এলাকায় জিম থেকে ফেরার পথে দুই বন্ধুর রিকশার গতিরোধ করে গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। পরে এ ঘটনায় জড়িত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৬ জুলাই কারওয়ানবাজার ও শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় পৃথক দুই অভিযানে ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে ৪ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। গ্রেপ্তাররা হলো হৃদয়, রাশেদ, মো. শামীম ওরফে সাগর ও মো. শাহ আলম।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, সোমবার সিটি-ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ কর্তৃক সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে কাওরান বাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চলাকালে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে হৃদয়, রাশেদ ও মো. শামীম সাগরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে শিশু মেলার সামনে ওভার ব্রিজের ওপরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা করলে হাতেনাতে মো. শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে ৩টি ছুরি উদ্ধার করা হয়। ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত পদক্ষেপ নিলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে হিমশিমই খেতে হচ্ছে বাহিনীর সদস্যদের। এমনকি হামলার শিকারও হতে হচ্ছে তাদের। গত ১৬ জুন আদাবরে একটি দোকানে ঢুকে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর পরপরই ছিনতাইকারীদের আস্তানায় রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় ছিনতাইকারীদের চাপাতির আঘাতে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও উপপরিদর্শক (এসআই) তরুণ কুমার গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাল্টা গুলিতে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করে পুলিশ। ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডিএমপির ৮টি অপরাধ বিভাগে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩৪টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মে মাসে ৩৩টি, মার্চ ও এপ্রিল মাসে মামলা হয়েছে ২৫টি করে, ফেব্রুয়ারি মাসে ২২টি এবং জানুয়ারি মাসে ২৯টি। অর্থাৎ গত কয়েক মাসের তুলনায় মে মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। চলতি জুন মাসেও রাজধানীজুড়ে বেশ কয়েকটি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ছিনতাইয়ের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ওয়ারী বিভাগে, ৩২টি। সবচেয়ে কম মামলা হয়েছে লালবাগ বিভাগে ৪টি। এছাড়া রমনা বিভাগে মামলা হয়েছে ১২টি, মতিঝিল বিভাগে ২১টি, তেজগাঁও বিভাগে ২৪টি, মিরপুর বিভাগে ১৪টি, গুলশান বিভাগে ১৫টি এবং উত্তরা বিভাগে ১৪টি।

বর্তমানে রাজধানীতে ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী রয়েছে ওয়ারী বিভাগে ৩০৮ জন। সবচেয়ে কম রয়েছে মিরপুর বিভাগে ৫৩ জন। এছাড়া রমনা বিভাগে ১৫২ জন, লালবাগ বিভাগে ১৫৯ জন, মতিঝিল বিভাগে ১৬৮ জন, তেজগাঁও বিভাগে ২৪০ জন, গুলশান বিভাগে ৬৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী রয়েছে। এসব ছিনতাইকারীর ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে। নাগরিকদের অভিযোগ ও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজধানীতে শতাধিক স্থানে সক্রিয় রয়েছে ছিনতাইকারী চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। উদ্ধার করা হচ্ছে ছিনতাই হওয়া বিভিন্ন সামগ্রীও। তবে গ্রেপ্তারের পর কয়েকদিনের মধ্যেই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন তারা। এছাড়া নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় এ অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা এখনো চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, পুলিশে কাজ দুই রকমের হয়। একটি হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধ হওয়ার আগেই বিট পুলিশিং ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। একটা হচ্ছে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পূর্বে এবং আরেকটি পরে। এছাড়া নিয়মিত অভিযান, টহল, আসামি গ্রেপ্তারসহ অপরাধ নির্মূলে পুলিশের পক্ষ থেকে রুটিন অনুযায়ী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া যদি পুলিশের জনবল-যানবাহন এবং কিছু টেকনিক্যাল সাপোর্ট বাড়ানো হয়, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য আরো সহজ হবে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মো. ইবনে মিজান বলেন, ‘আমাদের অভিযানের ফ্রিকোয়েন্সিটা বাড়িয়েছি। আগে হয়তো সপ্তাহে এক-দুবার ব্লক রেইড করতাম, এখন মোটামুটি একদিন পরপরই দেখা যাচ্ছে যে অপরাধপ্রবণ এলাকাকে টার্গেট করে করে ব্লক রেইড করি।’ ডিএমপির ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন ডিআইজি নজরুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত প্রচুর এরকম ছিনতাইকারী ধরছি, চালান হচ্ছে আবার কয়েকদিন পরে বেরও হয়ে আসছে। এরপর আবার তারা একই কাজ করতেছে। আমাদের বেকারত্ব, সুশিক্ষা না থাকা, এগুলোই মূল সমস্যা।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সিসিটিভির আওতা বাড়ানো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল জোরদার, দ্রুত বিচার এবং জনসচেতনতা এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ছিনতাইয়ের ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এখন চুরি ও ছিনতাইকে সহজে জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সময় শেষ। এসব অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা গ্রহণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ মামলার বিবরণটা এমনভাবে লেখা হয় অধিকাংশ ঘটনায়- যাতে সে দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। এ মামলার এফআইআরটা জামিন পাওয়ার উপযোগী করে লেখা- এ পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়