প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২১ জুলাই, ২০২৬

সুরমা-তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে বন্যার আশঙ্কা

ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার লাউয়ারগড়ে সর্বোচ্চ ১৪০ মিলিমিটার এবং সুনামগঞ্জে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর এতে জেলার বিভিন্ন নদনদীর পানি বাড়ছে। এরই মধ্যে ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে আবারও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী পাঁচ দিনে দিন সারা দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সুনামগঞ্জ : গতকাল সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৮.৮৬ মিটার, যা বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানি ৭.৩৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার নিচে। লাউয়ারগড়ে পানি ৭.৪৪ মিটার, যা বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার নিচে এবং দিরাইয়ে ৬.০৬ মিটার, যা বিপৎসীমার ৪৯ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে অধিকাংশ পয়েন্টেই পানির উচ্চতা বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার রাতে পাহাড়ি ঢলের পানি তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও এলাকায় আবারও লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। এতে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, রাতভর পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে এবং অনেক পরিবারকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা পিন্টু দাস বলেন, রাতে হঠাৎ করেই পাহাড়ি ঢলের পানি বাড়তে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির আঙিনায় পানি ঢুকে যায়। ঘরের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। আবারও ঢলের পানিতে আমাদের দুর্ভোগ শুরু হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা রকিব উদ্দিন বলেন, সারা রাতের বৃষ্টিতে সকাল থেকেই আমাদের চলাচলের রাস্তায় পানি জমে গেছে। পৌরএলাকায় বাসিন্দা হয়েও আমাদের এ কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়ে। আর এ রাস্তায় যখন পানি জমে তখন শিশু এবং কর্মজীবী মানুষের চলাচলে ভোগান্তি হয়। দ্রুত এ রাস্তার সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা দরকার। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলের চাপ অব্যাহত রয়েছে। ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে জেলার নদনদীর পানি আরো বাড়তে পারে। আর এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছি।

নীলফামারী : নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর ৫২.১০ সেন্টিমিটার, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বেড়ে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সকাল ৮টায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানি আরো বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজে ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

দেশের তিনটি নদীর চারটি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একইসঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ এবং ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় দেশের কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। এফএফডব্লিউসি জানায়, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আগামী দুদিন আরো বাড়তে পারে। এর ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। সুরমা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে, যদিও কুশিয়ারার পানি কিছুটা কমেছে। উভয় নদীর পানি আবারও বাড়তে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু এলাকায় নদীর পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করে চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, জিঞ্জিরাম, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানিও বাড়ছে।

শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের কিছু এলাকায় এসব নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি অথবা বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যদিও পদ্মার পানি স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী পাঁচ দিন এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের কিছু স্থানে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে এবং নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আপার করতোয়া, আপার আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী, আত্রাই ও ঘাঘট নদীর পানিও বাড়ছে। নওগাঁ ও নাটোর জেলার কিছু এলাকায় আত্রাই ও ছোট যমুনা নদী সতর্কসীমায় পৌঁছে নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। চট্টগ্রাম বিভাগের সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে সাঙ্গু, হালদা ও মাতামুহুরী নদীর পানিও দ্রুত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়