প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ১৯ নভেম্বর, ২০২৪

নতুন সংবিধানে সরকারের মেয়াদ হতে পারে ৪ বছর

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নতুন সংবিধানের অধীনে সরকারের মেয়াদ হতে পারে চার বছর। কারণ, বর্তমান সময়ে জনগণ দ্রুত উন্নতি ও অগ্রগতি চায়। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কার্যক্রম শেষ করে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করছে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রবিবার ভিডিও সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করা হয়।

আল-জাজিরাকে দেওয়া ২৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকার, সংস্কার প্রক্রিয়া, আগামী নির্বাচন, সংখ্যালঘু পরিস্থিতি, ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনা ইস্যু, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে সৃষ্ট সংকট, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক কেমন হতে পারে- এমন অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ড. ইউনূস।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমা : সরকারের সময়সীমা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ড. ইউনূস বলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা স্থায়ী সরকার নই। নিয়মিত সরকার পাঁচ বছরের হয়। নতুন সংবিধানে সরকারের মেয়াদ চার বছর হতে পারে। কারণ, মানুষ আরো দ্রুত সময় সরকারের পরিবর্তন চায়। কাজেই এটা (অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ) নিশ্চিতভাবেই চার বছরের কম হবে। আরো কম হতে পারে। এটা পুরোপুরি নির্ভর করছে মানুষের চাওয়া ও রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়ার ওপর।

তিনি বলেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো চায় এটা (সংস্কার) বাদ যাও, নির্বাচন দাও। আমরা সেটাই করব। সেক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি চার বছর থাকছেন কি না, এ প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, আমি সেটা বলিনি যে চার বছর থাকব। আমি বলেছি, আমাদের মেয়াদ সর্বোচ্চ চার বছর হতে পারে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য সেটা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য, যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা।

নিজের রাজনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা নাকচ করে ড. ইউনূস বলেন, জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে রাজনীতিতে আসার কোনো ইচ্ছা নেই। আমি কোনো রাজনীতিক নই।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান : ভারতে চলে যাওয়া শেখ হাসিনার বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, তিনি ভারতে থেকে বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন এবং বিক্ষোভের ডাক দিচ্ছেন। ভারত সরকারকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের আপত্তির কথা জানানো হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী’ বলে আওয়ামী লীগের উল্লেখ করার বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, তিনি নিজেকে যা-ই বলুন না কেন, বাস্তবতা হলো ভারত সরকারও তাকে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী’ বলে সম্বোধন করেছে। তিনি আরো বলেন যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আবেদন করা হবে।

উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, ‘শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল। বাইডেন প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?’

উত্তরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনি বাংলাদেশে অবস্থান করলে এমনটা ভাবতে আপনাকে পাগলাটে হতে হবে। শিক্ষার্থীরা রাজপথে বিক্ষোভ করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন। যখন মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) সবদিক থেকে তার (শেখ হাসিনা) বাসার দিকে যাচ্ছিল, তখন তার পরিবারই তাকে পালাতে বলেছে। কারণ, অন্যথায়, মব পুরো বাড়ি দখল করবে।...এই পরিস্থিতিতে দেশ থেকে বের হতে সহায়তার জন্য তিনি সেনাবাহিনীকে ডেকেছিলেন। আর সেনাবাহিনী তাকে দেশ থেকে বের হতে, ভারতে চলে যেতে সহায়তা করেছিল। এভাবেই বিষয়টি ঘটেছিল।...এটা ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আর তাতে দেশের সব মানুষ যোগ দিয়েছিল।’

উপস্থাপক বলেন, ‘ঘটনা যখন ঘটল, তা কি আপনাকে অবাক করেছিল? কিংবা আপনি কি ধারণা করতে পেরেছিলেন যে এমন কিছু ঘটবে?’

এ প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনূস বলেন, ‘প্রথমত আমি তখন দেশে ছিলাম না। তাই ঘণ্টায় ঘণ্টায় কী ঘটছিল, তা আমি জানতে পারছিলাম না। গণমাধ্যমে যা আসছিল, আমি শুধু তা-ই জানতে পারছিলাম। আমি চূড়ান্ত ফলাফল জানতে পেয়েছিলাম।...কারণ আমাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমাকে ফোন করে বলা হয়েছিল, আমরা আপনাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এই পরিস্থিতিতে দেশে তিন দিন সরকার ছিল না। কারণ, আমি দেশে ছিলাম না। দেশে আসার পর আমি শপথ গ্রহণ করি। এভাবে সরকার গঠিত হয়। সুতরাং তখন এই অনিশ্চয়তা, অপ্রত্যাশিত বিভিন্ন ঘটনা ঘটছিল। এ সবকিছু ঘটানোর জন্য কেউ কোথাও থেকে পরিকল্পনা করেনি। এ রকম কিছু ঘটেনি।’

ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপ হয়নি, তার দলে বন্ধু আছে : সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ আসে। ট্রাম্পের সঙ্গে উত্তেজনা থাকা ও তা মোকাবিলা করা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে অতীতে কখনো আমার আলাপ-আলোচনা হয়নি। তাই ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার কোনো সমস্যা নেই। আর আপনি যদি রিপাবলিকান পার্টির কথা বলেন, তাহলে বলব, আমার ডেমোক্রেটিক পার্টিতে বন্ধু আছে, রিপাবলিকান পার্টিতেও বন্ধু রয়েছে। আমাকে কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল দিতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস) ভোট দিয়েছিল। এ বিষয়ে উভয় পার্টির সদস্যরা শতভাগ একমত হয়েছিলেন। আমাকে এ মেডেল দেওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। রিপাবলিকান পার্টি উদ্বিগ্ন বা ডেমোক্রেটিক পার্টি উদ্বিগ্ন বা ট্রাম্প উদ্বিগ্ন- এই হিসেবে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার কারণে হঠাৎ করে কোনো নেতিবাচক কিছুর উদ্ভব হবে- এমন শঙ্কা আমি দেখছি না। আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এমন নয়, যা প্রেসিডেন্ট কে, তার ওপর নির্ভর করে। দেশটির এই নীতির একটি স্থিতিশীল অংশ আছে।’

সংখ্যালঘুদের অধিকার ইস্যু : সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে ড. ইউনূসের কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনার প্রশাসন সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়টি যেভাবে সামলাচ্ছে, তা নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আপনি কীভাবে বিষয়টি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন?

উত্তরে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ের ওপর বারবার পূর্ণ মনোযোগ রাখছি। এ কারণে আমরা অব্যাহতভাবে মনে করিয়ে দিই যে দেখুন, আপনারা এ দেশের নাগরিক। সংবিধান আপনাকে আপনার অধিকার দিয়েছে, স্বাধীনতা দিয়েছে, নিজেকে প্রকাশ করার অধিকার দিয়েছে, নিজের ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছে। এগুলো সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে।...তাই সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সংবিধানে যেসব অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যাতে নাগরিকরা ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা।’

প্রধান উপদেষ্টাকে পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে হিন্দুসহ অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, তারা সংখ্যালঘু বলে নির্যাতিত হচ্ছে না, বরং আওয়ামী লীগের কারণে জনগণের ক্ষোভের শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের ব্যাপক সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রোপাগান্ডা।

ড. ইউনূস বলেন, ‘সহিংসতা বাড়েনি। আমি বলব, সহিংসতা কমেছে। বিপ্লবের সময় সহিংসতা শুরু হয়েছিল। হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে তাদের ওপর সহিংসতা হয়নি। তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের লোক ছিল। সুতরাং সহিংসতা হয়েছিল আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।...তারা (গণঅভ্যুত্থানকারীরা) আওয়ামী লীগের লোকজনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। আর এসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল।’

তাহলে আপনি কীভাবে এ বিভক্তির সুরাহা করতে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘না, আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে বিভক্তি দেখতে পাই না। আমরা বলেছি, আমরা সবাই মিলে একটি পরিবার। আমাদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা একে অপরের শত্রু। আমাদের আইন আছে, অধিকার আছে। আমাদের দায়িত্ব হলো সব নাগরিকের সব অধিকার নিশ্চিত করা।’

জলবায়ু ইস্যু : সাক্ষাৎকারে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে সেটা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, এ বিষয়ে সবার সচেতনতা জরুরি। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক ইস্যু। গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমেই এটি সমাধান করতে হবে। আমি প্রকল্পগুলোকে নিরুৎসাহিত করছি না। কিন্তু, এখানে একটি ওখানে একটি প্রকল্প নিয়ে এই সমাধান হবে না।

বিশ্বকে তিনি বার্তা দেন, আমাদের জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা না হলে পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করা যাবে না। বাংলাদেশের বিষয়ে তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে যে সিস্টেম ছিল, সেটার কারণে বাংলাদেশ গভীর দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। এটা থেকে দেশকে ফেরাতে আমাদের হাতে অনেক বড় কাজ। প্রতিটি খাত ধরে ধরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ড. ইউনূস বলেন, এই পরিবর্তন শুধু সাময়িক সময়ের জন্য নয়। এখানে মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে। যাতে ভবিষ্যতে সেই ধারায় সব চলতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়