সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

  ১৪ অক্টোবর, ২০২১

শিশুদের সংশোধনে ব্যতিক্রমী শাস্তি

অর্ধশতাধিক মামলায় শিশুকিশোরদের অপরাধের জন্য তাদের সংশোধনের সুযোগ দিতে ব্যতিক্রমী রায় দিয়েছেন সুনামগঞ্জের একটি আদালত। রায়ে ৭০ শিশুকে তাদের অপরাধের জন্য এক বছরের সাজা দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সাজার জন্য তাদের কারাগারে যেতে হবে না বরং নিজের বাড়িতে থেকেই বাবা-মায়ের কথা শুনতে হবে এবং ভালো কাজ করতে হবে। সুনামগঞ্জের শিশু আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এই রায় দিয়েছে।

অভিযুক্তদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের শিশু আদালতে বিচার করা হয়। আদালত কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে না পাঠিয়ে তাদের বাবা-মায়ের কাছেই হস্তান্তর করেছে।

আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি হাসান মাহবুব জানিয়েছেন, ‘৫০টি মামলায় ছয়টি শর্তে ৭০ শিশুকে আদালত প্রবেশন দিয়েছে। এই এক বছর তাদের এসব শর্ত মেনে চলতে হবে। এক বছর পর তাদের আবার আদালতে এসে উপস্থিত হতে হবে।’

‘তখন যদি দেখা যায় যে, তারা সব শর্ত মেনে চলেছে, তাহলে তারা মুক্তি পেয়ে যাবে। কিন্তু সেটা যদি না হয় তাহলে তাদের আবার সাজা পেতে হতে পারে।’

চুরি, মারামারি, শ্লীলতাহানি, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া, ফেসবুকে অশ্লীল ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ইত্যাদি অভিযোগে এই শিশুদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের বয়স ১৪ বছর থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। সরকারি কৌঁসুলি মাহবুব হাসান জানিয়েছেন, প্রত্যেক শিশুকে ছয়টি করে শর্ত বেঁধে দিয়েছে আদালত। সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেককেই এসব শর্ত মানতে হবে। প্রতিদিন তাদের দুটি করে ভালো কাজ করতে হবে। তাদের যে ডায়রি দেওয়া হয়েছে, সেখানে এসব ভালো কাজের বর্ণনা লিখে রাখতে হবে। বাবা-মা এবং গুরুজনদের কথা মেনে চলতে হবে। বাবা-মায়ের যতœ ও সেবা করতে হবে। ধর্মীয় আচার নিয়মিত পালন করতে হবে। নিয়মিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে হবে। অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়ানো যাবে না।

এই এক বছর সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রবেশন কর্মকর্তা তাদের কর্মকাণ্ড তদারকি করবেন। প্রতি তিন মাস পরপর প্রবেশন কর্মকর্তা এই বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেবে।

‘কারাগারে না গিয়ে ভালো কাজের মাধ্যমে তারা যাতে সংশোধন হতে পারেন, সুনাগরিক, ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরির জন্য এই রায়ের মাধ্যমে আদালত তাদের সুযোগ দিয়েছেন।’

এই বছরের ২০ জানুয়ারি ৩৫টি মামলায় ৪৯টি শিশুকে মা-বাবার জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় আদালতের পক্ষ থেকে বিশ্বের মনীষীদের জীবনী গ্রন্থও উপহার দেওয়া হয়। সেই শিশুদের ১০টি শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের অক্টোবরে ১০টি মামলায় ১৪টি শিশুকে এ ধরনের সাজা দিয়েছিল এই আদালত। সেসব শিশুর বিরুদ্ধেও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে টাকা নেওয়া, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে একজনের ছবির সঙ্গে অন্যের ছবি যুক্ত করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে অশ্লীল ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, শ্লীলতাহানি, মাদক রাখা, জুয়া খেলা, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া এই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি জাকির হোসেনের এই আদালতে ৫৪টি পারিবারিক মামলায় আপস নিষ্পত্তি হওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর হাতে ফুল দিয়ে মিলমিশ করে দেওয়া হয়েছিল।

মামলা মুক্তি পাওয়া শিশু শহরের আরপিন নগর এলাকার বাসিন্দা মানিক মিয়া ছেলে সুজন মিয়া বলেন, আদালতকে ধন্যবাদ। আমাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন। আমরা আদালতের দেওয়া শর্তগুলো মেনে চলব।

দোয়ারাবাজার উপজেলার ফরমান আলীর ছেলে পারভেজ আলম বলেন, পরিবারের মামলায় আমার নাম দেওয়া হয়। প্রতিনিয়ত হাজিরা দিতে হতো। কিন্তু আদালত আজ যে রায় দিলেন তার জন্য কৃতজ্ঞ, আমি আদালতের সব আদেশ নিষেধ মেনে চলব।

এদিকে আদালতের এমন রায়ে খুশি অভিভাবকরা। ছাতক উপজেলার দিঘলী চাকলপাড়া গ্রামের মাসুক আলী বলেন, এ রায়ে আমরা খুশি।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের শিশু ও মানব পাচার ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত পিপি হাসান মোহাম্মদ সাদি বলেন, বিচারক মো. জাকির হোসেন যে রায় দিয়েছেন তার সত্যিই প্রশংসনীয়। এ রায়ে শিশুরা জীবনমান উন্নয়নে সুযোগ পাবে।

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close