নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

আগাম জাতের ধান

চালের ঘাটতি থাকবে না

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভাবিত আগাম আমন জাতের ধানের অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একদিকে উৎপাদন ভালো, অন্যদিকে ১০০ দিনের মধ্যে পাকে এই ধান। এ ধান কেটে আলু, সরিষাসহ অন্যান্য ফসল করার সুযোগ থাকায় মানুষের ঘরে আশ্বিন-কার্তিক মাসেও খাবার থাকবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে চালের ঘাটতি থাকবে না। দুই ফসলি জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। নতুন উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলো দ্রুত কৃষকের কাছে ছড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

বিনা সূত্রে জানা গেছে, টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য কৃষি গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করে চলেছেন বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাত। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা দূরীকরণসহ সমগ্র দেশের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন আমন মৌসুমের জন্য উচ্চফলনশীল ও স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট বিনাধান-১৬ এবং বিনাধান-১৭। বিনাধান-১৬ এর জীবনকাল মাত্র ৯৫-১০০ দিন এবং গড় ফলন ৬.০ টন/হেক্টর, (বিঘাপ্রতি ২৪ মণ)। বিনাধান-১৭ এর জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন এবং গড় ফলন ৬.৫টন/হেক্টর, (বিঘাপ্রতি ২৭ মণ)। অতীতে আমন ধানের জীবনকাল ছিল ১৬০-১৭০ দিন এবং ফলন ছিল বিঘাপ্রতি মাত্র ৪-৫ মণ এবং গাছ লম্বা হওয়ায় ঢলে পড়ত। দীর্ঘ জীবনকাল বিশিষ্ট হওয়ায় উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক বছরে দুটির বেশি ফসল চাষ করতে পারত না। প্রায় ১৫/২০ বছর আগে দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা হতো উত্তরবঙ্গসহ যমুনা পাড়ের অঞ্চলগুলোতে। যা আমাদের কাছে মঙ্গা বা মরা কার্তিক নামে পরিচিত। এই মরা কার্তিককে ভরা কার্তিকে রূপান্তর করার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বিনাধান-৭, বিনাধান-১৬ ও বিনাধান-১৭। আগেও আমন ধানের তুলনায় বিনার এই জাতগুলোর জীবনকাল প্রায় ৫০-৬০ দিন কম হওয়ায় আশ্বিন মাসে বিনার আমনের জাত পেকে যায়। ফলে আমন কাটার পর এই অঞ্চলের কৃষক সহজেই একবার বা দুবার আলু চাষ করে থাকে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য রংপুর অঞ্চলে দুইবার আলু চাষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আগাম আলুতে কৃষক অধিক লাভবান হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যাতে আর নেমে না যায়, সেদিকে নজর রাখতে এবং কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক আউশের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, সেক্ষেত্রে (আলু (আগাম)-আলু (নাবি)-আউশ (বিনাধান-১৯ ও ২১/ ব্রি ধান ৪৮)-আমন (বিনাধান-১৬/১৭)) শস্যবিন্যাসটি বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত করতে পারলে শস্যের নিবিড়তা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। অগ্রিম ফসল ঘরে ওঠায় মঙ্গার সময় প্রান্তিক কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া, খাদ্য হিসেবে ধানের খড়ের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে লাভজনক শস্যবিন্যাস যেমন- আমন-আলু (আগাম)-আলু (নাবি)-আউশ, আমন-সরিষা-বোরো অথবা আমন-আলু-সবজি এমনকি আমন-আলুর সঙ্গে মিষ্টিকুমড়া (সাথী ফসল)-বোরো আউশ প্রবর্তন করে তথা এই এলাকার দুই ফসল জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ফলস্বরূপ বর্তমান সরকার এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীসহ সারা দেশের জন্য অভিশপ্ত মঙ্গা তথা দুর্ভিক্ষ চিরতরে দূর করেছে।

দেশি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আগাম জাতের আমন ধান চাষ করলে দেশের উত্তরাঞ্চলে আর কখনো মঙ্গা ফিরে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুর রাজ্জাক। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বর্তমান সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে এরই মধ্যে দেশ থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। মানুষ মঙ্গার কথা ভুলে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত আগাম জাতের আমন ধানের চাষ রংপুর, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করতে পারলে দেশে ভবিষ্যতে আর কখনো মঙ্গা ফিরে আসবে না, থাকবে না ভাতের অভাব। ধানের এ জাতগুলো ভবিষ্যতে যাতে মঙ্গা ফিরে না আসতে পারে, সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেবে। তিনি বলেন, এখনো সারা দেশে আমনের ফসল আসতে যেখানে ১-২ মাস সময় লাগবে, সেখানে এই মুহূর্তে আমন ধান পেকেছে। বিনার উদ্ভাবিত এ জাতগুলোর অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এক দিকে উৎপাদন ভালো, অন্যদিকে ১০০ দিনের মধ্যে পাকে। এ ধান কেটে আলু, সরিষাসহ অন্যান্য ফসল করা যাবে। মন্ত্রী এ জাতগুলো দ্রুত কৃষকের কাছে ছড়িয়ে দিতে নির্দেশ দেন। ফসলের নতুন বিন্যাসকে দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। এ উন্নত আগাম জাতগুলো চাষ করলে মানুষের ঘরে আশ্বিন-কার্তিক মাসেও খাবার থাকবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close