নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৩০ জুলাই, ২০২১

রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়াসহ তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার এ প্রস্তাব মেনে না নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণগ্রহণ করলে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো কঠিন হবে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র। তখন ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশেই চিরতরে রেখে দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত ‘রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক’টি মতামতের জন্য পাঠায়। এতে উল্লেখ করে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কোনো মতামত না পেলে ওই প্রস্তাব সরকার মেনে নিয়েছে বলে তারা ধরে নেবে। বিশ্বব্যাংকের এই রিফিউজি পলিসি রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য দেশে অবস্থিত সব উদ্বাস্তুর জন্য প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ বিষয়ে মতামত চাইলে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ওই বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্কের তিনটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ১. উদ্বাস্তু ও হোস্ট কমিউনিটির জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা। ২. উদ্বাস্তুরা যেদেশে অবস্থান করছে, সেই সমাজে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া অথবা তাদের ফেরত পাঠানো। ৩. দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে করে নতুন উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়া সম্ভব হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ এই তিনটি উদ্দেশ্য আকারেণ্ডইঙ্গিতে বা মুখে বলত; কিন্তু এই প্রথমবারের মতো তারা বিষয়টি লিখিত আকারে উপস্থাপন করল।’

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব মেনে নিলে রোহিঙ্গারা যেকোনো স্থানে চলাচল করতে পারবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারবে বা ব্যবসা করতে পারবে। শুধু তাই না তাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে সামাজিক পরিচয়পত্রও দিতে হবে।’

সামাজিক পরিচয়পত্র : রোহিঙ্গাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্পদ ব্যয় করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া অন্য অনেক দেশ তাদের দেখভালের জন্য জাতিসংঘকে অর্থ প্রদান করে। এই অর্থ প্রদানের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে এবং এর ফলে বাড়তি বোঝা বাংলাদেশের ওপর চাপানোর একটি চেষ্টা আছে বিদেশিদের। এ বিষয়ে আরেক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি অর্থদাতারা চাইছে রোহিঙ্গাদের উপার্জনের ব্যবস্থা; যাতে করে নিজেদের ব্যয় তারা নিজেরাই মেটাতে পারে। এ ছাড়া তাদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, অবাধ চলাচলের বিষয়েও তারা জোর দিচ্ছে। এজন্য রোহিঙ্গাদের সিভিল নিবন্ধন অর্থাৎ পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধনসহ অন্য বিষয়গুলো চালু করার প্রস্তাব করছে তারা।

প্রত্যাবাসনই একমাত্র পথ : এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। তাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের জন্য যদি আমরা এসব মেনে নেই, তবে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি যে লক্ষ্যগুলো আছে, সেগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এজন্য আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।’

উদ্বাস্তু সমস্যা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এটি তিনভাবে সমাধান করা যায়। একটি আছে অন্তর্ভুক্তীকরণ, আরেকটি হচ্ছে তৃতীয় দেশে সেটেলমেন্ট এবং অপরটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন। আমাদের জন্য তৃতীয় দেশে সেটেলমেন্ট ফিজিবল না, কারণ সংখ্যাটি অনেক বড়। যদি সংখ্যা ৩০ বা ৪০ হাজার হতো; তাহলে বিভিন্ন দেশে ভাগ করে দেওয়া যেত। তবে সংখ্যাটি তো ১০ লাখের ওপরে। এখন পৃথিবীর কোনো দেশ এই পরিমাণ মানুষ নেবে না, এটাই বাস্তবতা।’

আরেকটি সমাধান হচ্ছে অন্তর্ভুক্তীকরণ, কিন্তু বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ এবং এখানে প্রচুর পরিমাণ শ্রমিক আছে। ফলে বাড়তি শ্রমিকের কোনো প্রয়োজন নেই এবং সে সম্ভাবনাও নেই।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘সুতরাং আমাদের জন্য একমাত্র অপশন হচ্ছে তাদের নিজ ভূমিতে টেকসই ও সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবাসন। অন্তর্ভুক্তীকরণের বিষয়ে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংক চিন্তা করতে পারে, কিন্তু আমরা এটি করতে পারব না এবং এটি তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে। গতবারই তারা আমাদের যখন এ ধরনের ভাষা বা পয়েন্ট বলেছিল; তখন তাদের আমরা বলেছি যে, এটি আমাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়।’

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘আমাদের নজরে যেটি আসছে, সেটি আমরা পয়েন্ট আউট করছি এবং সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছে তাদের বলছি যে, এ ধরনের শর্ত মানা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close