সরকারি তেল চুরির মচ্ছব!

নারায়ণগঞ্জে পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপো

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বার্মাশীল ও এসওরোড এলাকায় গড়ে উঠেছে চোরাই তেল চক্র। বিমানে জ্বালানি তেল জেট-ওয়ান, অকটেন, পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেন্স ও জিওবি তেল চুরি করে বিক্রি হচ্ছে।

প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি তেল খোলাবাজারে বিক্রির জন্য চুরি করলেও পুলিশ রয়েছে নীরব। এই তেল চুরি ব্যবসা করে বার্মাশীল ও এসওরোড এলাকার অর্ধশত লোক কোটিপতি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ তেল চুরি ব্যবসা ছেড়ে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। মেঘনা ও পদ্মা অয়েল কোম্পানির এজেন্টশিপ নিয়ে এখনো অনেকেই বৈধ ব্যবসার আড়ালে করছে চোরাই তেলের ব্যবসা। এই তেল চুরিকে কেন্দ্র করে একাধিকবার সংঘাত-সংঘর্ষ ও অগ্নিকা-ের মতো ঘটনা ঘটেছে। তবুও তেল চুরির ব্যবসা বন্ধ হয়নি। ডিপো থেকে ট্যাংকলরি তেল বোঝাই করে গন্তব্যে যাওয়ার পথে ডিপো গেট থেকে শুরু করে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে শতাধিক তেল চোরদের ঘুণ্টি ঘরের সামনে তেলবোঝাই লরিটি থামিয়ে অবাধে তেল চুরি করে নামাচ্ছে। স্থানীয় থানা পুলিশ এই দৃশ্য দেখেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো তেল চোরদের ঘুণ্টি ঘরে গিয়ে বসে চা পান সিগারেট পান করে বকশিস নিয়ে চলে যায়। ডিপো দুটির প্রবেশদ্বার সড়কটি প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর নিজস্ব সড়ক। প্রতি মাসে লাখ লাখ লিটার জ্বালানি তেল চুরি হচ্ছে। সম্পূর্ণ বাইরে বিক্রি নিষিদ্ধ বিমানের তেল জেট-ওয়ান ও অবাধে বিক্রি হচ্ছে। রঙিন কেরোসিনের সঙ্গে এক প্রকার রাসায়নিক সাদা পাউডার মিশিয়ে কেরোসিনের রং সাদা করে অকটেন, পেট্রল ও জেট-ওয়ানের সঙ্গে মিশিয়ে ভেজাল করে বিভিন্ন পেট্রলপাম্পসহ বিভিন্ন জায়গায় বাজারজাত করছে ভেজাল তেল। পদ্মা ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহাবুব আলম জানান, গড়ে দৈনিক ১২ লক্ষাধিক লিটার বিমানের জ্বালানি তেল জেট-ওয়ান সরবরাহ করা হয় এখান থেকে। এ ছাড়া এ ডিপো থেকে দৈনিক (শুক্রবার ব্যতীত) ১৪-১৫ লাখ লিটার পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন, ফার্নেশ ও জেবিও সরবরাহ করা হচ্ছে। মেঘনা ডিপো থেকে শতাধিক লরি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি লরি থামিয়ে সর্বনিম্ন চারটি (৮০ লিটার) করে দৈনিক ৮ হাজার লিটার মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার লিটার এবং বছরে তা দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৯৬ হাজার লিটার তেল। মেঘনা ডিপোর ব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান জানান, এই ডিপো থেকে দৈনিক ১১-১২ লক্ষাধিক লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, প্রচুর তেল মজুদ রয়েছে বলে তিনি জানান।

পদ্মা ডিপো থেকে ১২৭টি ট্যাংকলরির মাধ্যমে বিমানের তেল নিয়ে ডিপো থেকে বের হওয়ার পর ঘুণ্টি ঘরের সামনে লরি থামিয়ে প্রতিটি লরি থেকে সর্বনিম্ন চার টিন করে (৮০ লিটার) করে তেল চুরি করে বিক্রি করছে। দৈনিক ১০ হাজার ১৬০ লিটার যা বছরে দাঁড়ায় ৩৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ লিটার। যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। ডিজেল অকটেন, কেরোসিন, পেট্রল সরবরাহ করছে ১৫০ ট্যাংকলরির মাধ্যমে। প্রতিটি লরি থামিয়ে চারটিন (৮০ লিটার) করে (শুক্রবার ব্যতীত) দৈনিক ১২ হাজার লিটার তেল চুরি করছে, যা বছরে দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার লিটার। ট্যাংকলরি চালকদের তথ্য মতে লরি থেকে চুরি করে তেল বিক্রির বিনিময়ে কুর্মিটোলা ডিপো কর্মকর্তাদের লরিপ্রতি ৩ হাজার ৫০০, করে টাকা ও তেল পরিমাপককে ৫০০, করে টাকা দিতে হচ্ছে। ওই টাকার বিনিময়ে পথে তেল চুরি করে বিক্রি পরিমাপে কম না দেখিয়ে চালান বুঝে রাখে। তেল বিক্রি করে কুর্মিটোলা ডিপোতে টাকা না দিলে পরিমাপের সময় তেল সর্ট দেখানো হয় যার কারণে বাধ্য হয়ে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। এলাকাবাসী জানায়, পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর পেছনে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডিপোতে তেল খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ তেলের জাহাজ থেকে গভীর রাতে এলাকার প্রভাবশালীরা তেল চুরির মচ্ছবে মেতে উঠে।

তেল চুরির বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম (মন্ডল) বলেন, আমিও তেলের ব্যবসা করছি তবে তা বৈধভাবে পদ্মা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিলারশিপের মাধ্যমে। এলাকার অনেকেই মেঘনা ও পদ্মা ডিপো থেকে এজেন্টশিপ নিয়ে বৈধভাবে তেলের ব্যবসা করছেন বলে কাউন্সিলর জানান। এরপরও যদি কেউ অবৈধ ব্যবসা করে থাকে তাহলে তা প্রশাসন দেখবে বলে কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম জানান। এদিকে মেঘনা ডিপোর ব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান বলেন ডিপোতে তেল চুরির কোনো সুযোগ নেই, ডিপোর বাইরে তেল চুরির বিষয়ে বলেন এটা আমার দেখার বিষয় নয়, থানা পুলিশ দেখবে। স্থানীয়দের তথ্যে মতে তেল চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন হচ্ছে, অকিলউদ্দিন ভূঁইয়া, শাহজালাল, মো. মাসুম, সাইজুদ্দিন, মেহেদী, ফজলুর রহমান, মনির, রিপন কাজী, আক্তার, মিজান, রহমত, ওয়াশিম, জাহ্ঙ্গাীর, আরমান, বাদল, হাবিব, মিজান, আমির প্রধান, শহিদ, আলম, আসলাম, সাইফুল, শাহজামান, জাহাঙ্গীর, সালাউদ্দিন, জসিম, আলাউদ্দিন, ইকবাল, নুরু, কামাল, মনির, মোবারক, আলমগীর, রাজ্জাক, কালু, শামীম, তানজিল, ইস্রাফিল, বলনুরা, সোহাগ, মনির, রিপন, আলাউদ্দিন, মিন্টু, রবিউল, সজিব, হাসান, আশরাফ, বাচ্চু, হাফেজ, আজিম, আরিফ, সালেহ আহম্মদ, মোক্তার, নূর আলম, আলামিন ভূঁইয়া, শহিদ ভূঁইয়া, জাহাঙ্গীর, শাজাহান, আমির হোসেন প্রধান, কবির ভূঁইয়া রিপন, জুয়েল, জাহাঙ্গীর (২), সায়েদ আলী, মানিক, কাশেম, বুইট্টা ফারুক, জালাল, ফয়সাল, দুইক্ষ্যা বাবুল, অহিদ, শাহিন, নাইম, নাসির, জাহাঙ্গীর, টিটু, আকরাম, আবীর, হিন্দু বাচ্চু, নাছির উদ্দিন, মোস্তান ও রনির আস্তানা। মেঘনা ডিপোকে ঘিরে চোরাই সিন্ডিকেট হচ্ছে ফিরোজ, মনির, বাচ্চু, ইকবাল, ফারুক, কালাম, রিপন, মনির, ওরফে তেল চোর ইকবাল, ল্যাংড়া রবিউল ওরফে লোহা রবিউল, মানিক, মাহাবুব, সিরাজউদ্দিন সিরাজুল, বাচ্চু, রাসেদ মাহাজন, শরীফ, আফজাল, আজিজ, ইবনে সাউদ, নীরব, আলমগীর, স্বপন। চোরাই তেলের ব্যবসা করে বার্মাশীল ও এসওরোড এলাকার অর্ধশত লোক কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। একাধিক বাড়ি ও গাড়িসহ অঢেল সম্পদ করেছেন।

পদ্মা ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহাবুবুল আলম জানায়, জাহাজ থেকে তেল পরিমাপ করে ডিপোতে উঠানো হয়, মোট তেলের মধ্যে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ ট্রানজিট লস দেখানো নিয়ম রয়েছে, এর বেশি দেখালে আমরা জাহাজের ভাড়া টাকা থেকে তেলের টাকা কেটে রাখি, ডিপো থেকে তেল চুরির কোনো সুযোগ নেই বলে ব্যবস্থাপক দাবি করেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ডিপো দুটিতে স্থানীয় তেল চোর সিন্ডিকেট চক্র ডিপোর মেইন গেটে নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে আঁতাত করে অবাধে ডিপোর মধ্যে অনায়াসে প্রবেশ করছে বিনা বাধায়। এদিকে বার্মাশীল এলাকার ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. জাহিদ জানায়, পদ্মা ডিপো থেকে বিমানের জ্বালানি তেল কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তেল পরিমাপ করে রাখে, তেল কম হলে তা লগ বইতে সর্ট লিখে দেয়, লরিরর ভাড়া টাকা থেকে তা পরিশোধ করতে হচ্ছে। জাহিদ স্বীকার করেন অন্যান্য তেল পেট্রল পাম্পে সরবরাহ করার সময় লরি চালকরা পাম্পের লোকদের সঙ্গে আঁতাত করে কিছু তেল চুরি করে নিজের খরচের জন্য। যারা তেল চুরির সঙ্গে জড়িত তারা ডিপোত প্রবেশ করতে গেটে নিরাপত্তারক্ষীদের রেজিস্ট্রার খাতায় তাদের নাম লিপিবদ্ধ করতে হয় না, বেনামে তারা যখন তখন ডিপোতে প্রবেশ করছে। তেল চুরি সিন্ডিকেটের ব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, তেল চুরির ব্যাপারে কেউ অভিযোগ দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চোরাই তেল চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এই চোরাই তেল সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

 

 

"