ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি

সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহার বিচার শুরু

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক

জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংক থেকে ৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এই আদেশের মধ্যদিয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সাবেক প্রধান বিচারপতি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হলেন। তাকে পলাতক দেখিয়েই এ মামলার বিচার কাজ চলবে। ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক নাজমুল আলম গতকাল বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন। পাশাপাশি মামলার অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর জন্য ১৮ আগস্ট দিন ঠিক করে দেন তিনি। মামলায় আরো ১০ জনের বিরুদ্ধেও এদিন একই আদেশ এসেছে। আসামিদের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীকে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য এ দিন কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। একই মামলায় জামিনে থাকা ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীম এবং সাবেক এসইভিপি গাজী সালাহউদ্দিনও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী রুহুল ইসলাম খান জানান, আদালতে হাজির তিন আসামিকে নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে জানতে চাওয়া হয় তারা দোষী না নির্দোষ। বাবুল চিশতী, শামীম ও সালাহউদ্দিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সুবিচার চান। তাদের আইনজীবীরা মামলা থেকে অব্যাহতিরও আবেদন করেন।

শুনানি শেষে বিচারক পলাতক আটজনসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর সিদ্ধান্ত দেন।

মামলার অপর আসামিরা হলেন ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) সাবেক ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান, একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, রণজিৎ চন্দ্র সাহা ও তার স্ত্রী সান্ত্রী রায়। আসামিদের মধ্যে কেবল বাবুল চিশতী অন্য মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। আর বিচারপতি সিনহা অবস্থান করছেন কানাডায়।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতি ২০১৭ সালে বিদেশে পাড়ি জমানোর পর দুদক অভিযোগ পায়, তিনি ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দুই ব্যক্তির নেওয়া ঋণের ৪ কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছিলেন। অভিযোগ পেয়ে ওই বছরই তদন্তে নামে দুদক। দীর্ঘ তদন্তে পর গত বছরের ১০ জুলাই সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর আসামি শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য পরদিন তারা ওই ব্যাংক থেকে ২ কোটি টাকা করে ৪ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ঋণের আবেদনে উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়, যার মালিক ছিলেন তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। ঋণের জামানত হিসেবে আসামি রণজিৎ চন্দ্রের স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের নামে সাভারের ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করা হয় ঋণের আবেদনে। ওই দম্পতি এস কে সিনহার পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার এজাহারে। মামলার এজাহারে বলা হয়, ৭ নভেম্বর ঋণের আবেদন হওয়ার পর ‘অস্বাভাবিক দ্রুততার’ সঙ্গে তা অনুমোদন করা হয়। পরদিন ৪ কোটি টাকার দুটি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয় এস কে সিনহার নামে। ৯ নভেম্বর সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার অ্যাকাউন্টে জমা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে ক্যাশ, চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে এস কে সিনহার ভাইয়ের নামে শাহজালাল ব্যাংকের উত্তরা শাখার অ্যাকাউন্টে দুটি চেকে ২ কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয় ওই বছরের ২৮ নভেম্বর। আসামি রণজিৎ চন্দ্র ঋণ দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির প্রভাব ব্যবহার করেন। রণজিৎ চন্দ্রের ভাতিজা হলেন ঋণ গ্রহীতা নিরঞ্জন এবং অপর ঋণ গ্রহীতা শাহজাহান ও রণজিৎ ছোটবেলার বন্ধু। ঋণ গ্রহীতা দুজনই অত্যন্ত গরিব ও দুস্থ। তারা কখনো ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও পর্যবেক্ষণের পর ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা। তিনি একই বছরের ১৩ অক্টেবর অস্ট্র্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। অস্ট্র্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুর যান ৬ নভেম্বর। পরে ১০ নভেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে কানাডায় যাওয়ার পথে সেখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন গত বছরের ১৪ নভেম্বর।

 

"