চামড়া নিয়ে এবারও বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

‘প্রত্যেকবার ঈদির পর চামড়ার কিছু টাকা পাই, এবার পালাম না’

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এবারও বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। প্রকারভেদে প্রতিটি গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৪০০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১০ টাকায় কেনা হয়েছে। যদিও বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৬০০ টাকাও কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চামড়া কিনে বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তারা। চামড়ার বাজারে ধস নামায় বঞ্চিত হয়েছেন দুস্থরা। ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আলেম সমাজ। আড়ৎগুলোতে চামড়ার দাম একেবারেই কম, এতে চামড়া কিনেও বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি এসব ব্যবসায়ী।

রাজধানীর জিগাতলা ট্যানারি মোড় ও পোস্তার আড়তে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হতে দেখা গেছে। একজন ক্রেতা জানান, বড় গরুর চামড়া ৫০০-৬০০ ও মাঝারি গরুর চামড়া ৩০০-৩৫০ টাকায় কিনেছেন। আর চারটি ছাগলের চামড়া কিনেছেন ১০ টাকায়। চট্টগ্রামেও রাস্তার ধারে ভাগাড়ে অবিক্রিত চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব চামড়া নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বিক্রি হয়নি। রাজশাহীতে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঈদের ঠিক শেষ মুহূর্তে খামারিরা গরুর দাম পেলেও কোরবানি শেষ চামড়ার দাম পাননি ব্যবসায়ীরা। এদিকে ট্যানারিতে দেওয়া গত বছরের চামড়ার টাকা এখনো পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকরা। এ বছর ধারদেনা করে চামড়া কিনছেন অনেকে কিন্তু এর পরিণতি কী হবে জানেন না তারা।

‘প্রত্যেকবার দর পর চামড়ার কিছু টাকা পাই, এবার পালাম না বাবা।’ কথাগুলো আক্ষেপ করে বললেন যশোরের শর্শা উপজেলার বেনাপোলের বারোপোতা গ্রামের আল্লাদি বিবি (৮৫)। একইভাবে বড়বাড়িয়া গ্রামের ভিখারি সজ্জোত আলি (৯০) বলেন, ‘চামড়ার কডা টাকা পাতাম, তাও পালাম না। কচ্ছে চামড়া বিক্রি নেই।’

এদিকে চামড়া সংগ্রহকারী মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বশীলরা বলছেন, এ বছর চামড়ার দামে হতাশ তারা। বেশি দামের আশায় নিজেরাই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছেন। তবে যদি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করতে না পারলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।

আমাদের চুয়াডাঙ্গা, যশোরের বেনাপোল, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো খবরÑ

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গায় এবার ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল। করোনার কারণে সাধারণ মানুষ কম কোরবানি দিয়েছেন এবার। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম একেবারেই কম। একটি ছাগলের চামড়া আকারভেদে ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে, আর গরুর চামড়া একটি বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত।

খুচরা চামড়া বিক্রেতারা বলছেন, আড়তে নিয়ে চামড়া বিক্রি করলে গাড়ি ভাড়ার টাকা উঠছে না। তাই চামড়া বিক্রির জন্য না নিয়ে ফেলে দিলেই ভালো হতো। বলেন দামুড়হুদা উপজেলা সদরের দাস পাড়ার চামড়া আড়ৎদার বাবলুসহ অনেকেই।

জেলার বিভিন্ন এলাকার মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং (এতিমখানা) কর্তৃপক্ষ জানান, কোরবানির ঈদে আমরা প্রচুর চামড়া পেয়ে থাকি। ওইসব চামড়া বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের অনেক কাজ করা হয়। কিন্তু এ বছর চামড়ার দামে আমরা হতাশ। তাই চামড়া বিক্রি না করে নিজেরাই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছি বেশি দামের আশায়। তবে যদি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করতে না পারি তাহলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।

যশোরের বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, শার্শা উপজেলায় কোরবানির চামড়ার দাম না থাকায় এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো বিপাকে পড়ার শঙ্কা দেখছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে। এতিমখানা, হেফজখানা ও কওমি মাদ্রাসার অর্থের বড় একটা জোগান আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। যশোরের শার্শা ও বেনাপোলের ভুক্তভোগীরা বলছেন, বরাবরের মতো চামড়া পেলেও এবার দাম কম হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছে এ প্রতিষ্ঠানগুলো।

যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআচড়া হেফজখানার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা খায়রুল বাসার জানান, তাদের দরিদ্র, অসহায়, এতিম শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়। বছরের তিন থেকে চার মাসের ব্যয়ের অর্থ কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে আসত জানিয়ে তিনি বলেন, এবার চামড়ার দাম কম হওয়ায় সেটা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান শার্শার সামটা মুসলিম এতিমখানার সভাপতি লিয়াকত আলি ও তত্ত্বাবধায়ক আবুল বাসার এবং বেনাপোল বাজার এতিমখানার প্রধান মাওলানা আবুল হোসেন।

নাভারণের সিরামকাটি ওয়ালুম কওমি হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রধান আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, ‘নাভারণ কাজিরবেড় ও সিরামকাটি গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের কোরবানির চামড়া তারা পেয়ে থাকেন। এবার গরুর চামড়া পেয়েছি ১১২টি আর খাসির ২০৫টি। বেচাবিক্রির চেষ্টা করছি কিন্তু এখনো বেচতি পারিনি।’

উপজেলার নাভারণ বাজারে চামড়া বেচাকেনা করেন মির্জাপুর গ্রামের শফিউর রহমান ও দক্ষিণ বুরুজবাগান গ্রামের চঞ্চল হোসেন। তারা বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়া নিচ্ছে না শুনে তারা চামড়া কেনার সাহস হারিয়েছেন। বড় গরুর চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকায় কিনছেন। ছাগলের চামড়ার দাম ২০ টাকার ওপরে কেনেননি। বেনাপোলের বালুন্ডা হাইস্কুলের শিক্ষক মিজানুর রহমান কোরবানির ছাগলের চামড়ার ক্রেতা না পেয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় গ্রামাঞ্চলে এবারে কোরবানি পশু গরুর চামড়া কম দামে কেনাবেচা হয়েছে। গ্রামগুলো থেকে ফড়িয়া শ্রেণির ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন। এবারেও ফড়িয়া ও মৌসুমি চামড়া ব্যাবসায়ীরা স্থানীয় আড়ৎদারদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পুঁজি খাতে আগাম টাকা পাননি বলে জানা যায়। এসব ফড়িয়া ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরাই গ্রামে গ্রামে ঘুরে চামড়া কিনে এনে আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করেছেন।

উল্লাপাড়া সদরে এবারে দুজন আড়ৎদার চামড়া কিনেছেন। এদের একজন আড়ৎদার মো. মহাব্বত আলী জানান, তিনি বিগত বছরের চামড়া বিক্রির বকেয়া টাকা মোকাম বাজারের মহাজনদের কাছ থেকে এখনো পাননি। বিভিন্ন উপায়ে টাকা জোগাড় করে বেশকিছু সংখ্যক পরিমাণ গরু চামড়া কিনেছেন। তার আড়তে লবণ দিয়ে তা সংরক্ষণ করে রাখছেন।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অন্য সময় কোরবানির ঈদের দিনদুপুরের পর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে পশুর চামড়া এনে কমলগঞ্জ উপজেলা সদর, ভানুগাছ বাজার, শমশেরনগর, আদমপুর, পতনউষার, মুন্সীবাজারে অপেক্ষমাণ চামড়ার ক্রেতাদের কাছে বেশ ভালো দামে বিক্রি করা হতো। কিন্তু এবার গ্রাম থেকে বাজারে চামড়া নিয়ে এসে ক্রেতার খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ২-১ জন ক্রেতা পেলেও একটি গরুর চামড়া ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় কিনতে চান ক্রেতারা। আর ছাগলের চামড়া ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে চান ক্রেতা।

শমশেরনগর ইউনিয়নের শিংরাউলী গ্রামের ফজু মিয়া জানান, তিনি একটি বাসায় কাজ করেন। ঈদের দিন সে বাসার দুটি গরুর চামড়া নিয়ে বাজারে বিক্রি করেছেন মাত্র ৬০ টাকায়। আর তার রিকশা ভাড়া দিতে হয়েছে ৫০ টাকা। একই অভিজ্ঞতা ঘোষপুর গ্রামের রাসেল মিয়া, কনু মিয়ার।

কমলগঞ্জ উপজেলা সদরের চামড়া ব্যবসায়ী মনা, মজনু মিয়া ও রাসেল মিয়া। তারা বলেন, তিনি ৫০ টাকা থেকে শুরু করে সাইজ বুঝে ১৫০ টাকা দিয়ে প্রতিটি গরুর চামড়া কিনেছেন।

 

"