গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

  ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

মুক্তমত

প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করুন

প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু তার পরও বর্তমানে এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাকসবজি, মাছ-মাংসসহ দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা পলিথিন ব্যবহার করছি। অনেক সময় কাগজের ব্যাগ কিংবা পলিথিনের বিকল্পব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও প্রতিনিয়ত পলিথিন ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ায় আমরা সেই পথে আগাতে পারছি না। বিশেষ করে শহরের মানুষ থলে (ব্যাগ) ব্যবহার না করায় পলিথিনের ওপর অধিক নির্ভরশীল। কারণ গ্রামের মানুষ কাঁচাবাজার বা মুদি মালামাল কিনতে সব সময় একই থলে ব্যবহার করে। পাশাপাশি দেখা গেছে, শহরের অধিকাংশ পরিবার খাদ্যদ্রব্য পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে ফ্রিজে রাখে। আমরা অনেকেই জানি না পলিথিনে মোড়ানো খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করলে খাদ্যদ্রব্য এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কবলে পড়ে। ফলে আমরা মারাত্মক চর্মরোগসহ ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছি। এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের অসচেতনতার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্লাস্টিক দূষণের নতুন নতুন উৎস তৈরি হচ্ছে। সঙ্গে এই দূষণের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে জেলেদের ফেলে দেওয়া ও হারিয়ে যাওয়া নাইলনের জাল। এগুলো একদিকে যেমন নদীর পানিকে বিষিয়ে তুলছে, সঙ্গে মাছের পেটে যাচ্ছে। ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধের বিধান করেছিল। হাইকোর্ট একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন এবং প্লাস্টিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেটি বেশিদিন কার্যকর থাকেনি। এর পেছনে আমাদের অসচেতনতা, প্রশাসনের গাফিলতি আর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই মূলত দায়ী। মাঝেমধ্যে দেখি প্রশাসন কর্তৃক বাজারে ভ্রামম্যাণ আদালত পরিচালনা হয়, এতে কিছু দোকানদারকে জরিমানা করা হচ্ছে। আবার অনেক দিন ধরে বাজারে ইচ্ছেমতো পলিথিন ব্যবহার করা হলেও সেদিকে প্রশাসনের কোনো নজর নেই। যে কারণে পরে আবার যা তাই হয়ে যাচ্ছে। পলিথিনে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে বাজার। গত বছর জুলাই মাসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে দেয় আন্তর্জাতিক চক্র। ওই বর্জ্যরে ভাগাড়ে পলিথিন, ছেঁড়া ও নাইলনের জাল থাকায় তাতে পেঁচিয়ে অনেক মাছ, কাছিম, ডলফিন প্রাণ হারিয়েছে। এতে সমুদ্র সৈকতসহ আশপাশের নদীনালায় জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষণ হয়েছিল। এভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব পলিথিন এবং প্লাস্টিকের জন্য পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

দেখা গেছে, পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর এ বিষয়টি নিয়ে আমরা অধিকাংশ মানুষ এখনো অজ্ঞ রয়েছি। এটি পচনশীল না হওয়ায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতি করছে। আর আমরা পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা না করেই যথেচ্ছভাবে এটি ব্যবহার করে যাচ্ছি। বিশেষ করে বর্তমানে দেশে পলিথিনের অতিমাত্রায় ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ১২৪ টন প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য তৈরি হয়। যার ৮৬ শতাংশ আবার ব্যবহার করা হয়। বাকি যে অংশটি ব্যবহৃত হয় না, তার বেশির ভাগটা পলিথিন।

এগুলো সরাসরি মাটি ও পানিতে গিয়ে জমা হচ্ছে। ফলে মাটি ও পানির জৈব গুণ নষ্ট করছে। একই সঙ্গে তা খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে। এই প্লাস্টিক এমন একটি পদার্থ, যার আয়ুষ্কাল অনেক বছর। এটিকে আমরা যখন ব্যবহার করে মাটিতে বা পানিতে ফেলছি তখন এটি মাটি বা পানির সঙ্গে মিশতে পারে না। ফলে মাটিতে পানি ও প্রাকৃতিক যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে তার চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। যার ফলে মাটির গুণগত মান হ্রাস পায়। অন্যদিকে জলজ পরিবেশের ওপর এসব প্লাস্টিক কিংবা পলিথিনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় মাছসহ জলজ উদ্ভিদ মারা যাচ্ছে।

এজন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়টির ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বর্তমানে পলিথিনের পাশাপাশি ওয়ানটাইম বোতল, প্লেট, চামচ, কাপসামগ্রী ব্যবহারে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এগুলোর প্রতি এখনই দৃষ্টি রাখতে হবে। পাশাপাশি এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের পাটশিল্পের দিকে সুনজর দিতে হবে। উৎকৃষ্ট মানের পাটের অন্যতম উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশ পাটের সৃষ্টিশীল ব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার হ্রাস করতে পারে। সুতরাং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনা করে অভিযান চালালে হবে না। নিয়মিত এবং অধিক গুরুত্ব দিয়ে এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যেখান থেকে পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে সেসব কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : ধর্ম ও সমাজসচেতন লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়