মোনেম শাহরিয়ার শাওন
মুক্তমত
শিক্ষা কাঠামোর সংস্কার সময়ের দাবি

মানুষ অজান্তেই নিজের সঙ্গে কথা বলে। নিজেকে জানার চেষ্টা করে। আর সেই জানতে চাওয়ার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার ফলেই আস্তে আস্তে তার জানার পরিধি বৃদ্ধি পায় এবং বুদ্ধিনির্ভর প্রাজ্ঞ ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নিজেকে জানো’। নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। নিজেকে জানো বলতে সক্রেটিস আসলে কোন জানাকে বুঝিয়েছেন? ভাবনার বিষয়।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমাদের দেশে এক কোটিরও অধিক ছাত্রছাত্রী বসিয়ে রাখা হয় শিক্ষাঙ্গনের চারপায়াধরা চেয়ার-টেবিলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের সম্ভাবনাকে পাঠচক্রের মধ্যে চক্রবত করে রাখছে একটি দুর্বল সিস্টেম। আদৌ শিক্ষার্থীরা নিজেদের সৃজনশীল প্রতিভাকে টিকিয়ে রাখতে উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না। কেননা এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈষয়িক মান নির্ধারিত হয় ‘মানবসম্পদ’ স্লোগানে। যে শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের সম্পদে রূপান্তর করার বিনয়ী প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় সেই শিক্ষার মান কতখানি সফলতার দ্বার বেয়ে হাঁটছে তা পর্যালোচনার বিষয়। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভাবনায় নিজেকে সম্পদ হিসেবে ভাবার ধারণা ঘুচে দেওয়া, প্রতিভা বিকাশের নামান্তর বটে। বিষয়টি এমন যে, তার জন্য একটি রাস্তা তৈরি করে রাখা হয়েছে, তাকে বাধ্য হয়ে ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হবে। দেশের পাবলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পরীক্ষার দিকে তাকালেই প্রশ্নদৃশ্যের উত্তর মেলে। ‘সম্পদ’ শব্দটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের যৌক্তিকতা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেওয়া সম্ভব। তবে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষিত হোক না কেন এর বিপরীত সমান্তরালে ‘সম্পদ’ কনসেপ্টটি মানুষের মানবিক গুণাবলির ধাঁচে নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করে। যদি তা জ্ঞানার্জনের পর্যায়ে ঘটে তাহলে কালপরিক্রমায় এটি মৌলিক সমস্যায় পরিণত হয়। ছাত্ররা নিজের ভেতরের সম্ভাবনানুযায়ী জ্ঞানচর্চা করতে পারছে না।
প্রযুক্তি এখন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গেছে। মানুষকে হাজারো বছর ধরে অন্য প্রত্যয়রা নিয়ন্ত্রণ করতে পরেনি। কারণ তৎঅবধিকাল থেকে মানুষ তার মানবীয় গুণাবলি চর্চা করত। কিন্তু কালপরিক্রমায় এখন সেই মানবীয় গুণাবলির চর্চা কমতে শুরু করছে। যার ফলে মানুষের মন এখন প্রযুক্তি সাপেক্ষে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ সূচকে সূচকে প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্কে জায়গা করে নিচ্ছে।
যদি তা দ্বারা উপলব্ধি গঠন করা যেত তাহলে দেশে আইনের প্রয়োজন হতো না, বিচার, স্বাধীনতা, সাম্যের প্রয়োজন হতো না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচতে পারত। পৃথিবীতে যে পরিমাণ সমস্যা নির্ণয়ের জন্য সময় ব্যয় হয়েছে, যতখানি আলোচনা হয়েছে তার সমাধান কল্পে অর্ধেক সময়ও ব্যয় হয়নি। ফলে দেখা যায় সমস্যার পরিমাণ দিন দিন বাড়লেও সুস্থ সমাধানের কোনো হদিস মেলে না। এই একটা বৈশ্বিক নেতিকারণ প্রবণতার ফলে অনুকরণ প্রক্রিয়াটি আমাদের মনে গেঁথে গেছে। ধরা যাক, বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে জার্মানকে অনুসরণ করে। সৃজনশীলতা ও মেধা বিকাশের আঙ্গিকে জার্মান ছাত্ররা বাংলাদেশের ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু কেন? কারণ তাদের শিক্ষা প্রদানের বুনিয়াদি পরিবেশগুলো আমাদের দেশের তুলনায় জার্মানে ইউনিকপর্যায়ের হয়ে থাকে, যা আমাদের ছাত্রদের জিনোম ভ্যালু বেশি হওয়া সত্ত্বেও শুধু সুস্থ পরিকল্পিত সিস্টেম বাস্তবায়নের কারণে তাদের ছাত্ররা এগিয়ে যাচ্ছে এ দেশের ছাত্রদের তুলনায়। আর এ দেশের ছাত্ররা গোলকধাঁধায় যুগের পর যুগ পার করছে। যার ফলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশে গিয়ে বাংলাদেশ যতই তাদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করোক না কেন এর মধ্যে একটি ডিমান্ড থেকেই যায়। জার্মান শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের সময় শিশুশ্রম, মাদক-ধারণা, মৌলিক অধিকার আলোচনা, বছরের পর বছর বীজগণিতের সূত্র-পাটিগণিত চর্চা না করিয়ে; প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় যাবৎ মেডিটেশন করানো হয়। নিজেকে চেনানো হয়, নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে তাদের মস্তিষ্কে একটি স্পেস তৈরি হয় এবং সেখানে সে নিজের জাতিসহ সব মানুষের দায়িত্বের দায়বদ্ধতা অনুভব করে।
একটি দেশ পরিবর্তন করতে গেলে দেশের মানুষদের আত্মিক পরিবর্তন দরকার। মেথাপিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ছাড়া মানুষ কখনো নিজেদের প্রকৃতিসহ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। একটি বোমা নিক্ষেপ দ্বারা যখন এক শ মানুষকে হত্যা করা হয় তখন হত্যাকারী হত্যা করার কাজে অনুতপ্ত নাও হতে পারে; যদি না তার ভেতর মোরাল সেন্টিমেন্ট না থাকে। শুধু হত্যাকারী নয়, বরং হত্যাকাণ্ড ঘটার সময় যে নীরব দর্শকরা রয়েছে তাদেরও অনুভূতি বিলীন হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আইনের প্রায়োগিক পরিবেশ হবে শুধু সংগ্রাম। নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, ‘যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা’। যুদ্ধ-দর্শকও মানবতার কম শত্রু নয়।
তাই একটি দেশের মোট বাজেট থেকে সামরিকে, সড়কে সর্বোচ্চ বরাদ্দ না দিয়ে শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত। প্রতিটি লাইব্রেরির পাশে একটি মেডিটেশন রুম, প্রতিটি হাসপাতালে প্রার্থনাগার, প্রতিটি উপজেলায় ‘মুক্তকণ্ঠ ও গবেষণাপত্র’ শিরোনামে প্রতিযোগিতা, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপার্টমেন্টভিত্তিক বাধ্যতামূলক গবেষণাপত্র জারির ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়মসেবার পূর্ণবাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষা জগতের পুনঃশুভসূচনা করতে পারে আমার দেশ। তাহলে আগামী কয়েক যুগে এ দেশ বিশ্বজাতীয়তায় গোল্ডেন পিরিয়ড তৈরি করবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
"




































