মুহাম্মদুল্লাহ আহনাফ
দৃষ্টিপাত
আমানতের গুরুত্ব ও খিয়ানতের ভয়াবহতা

‘আমানত’ শব্দটি আরবি ‘আমনুন’ মূলধাতু থেকে নির্গত হয়েছে। যার অর্থ ভরসা করা, আস্থা রাখা। অর্থাৎ কাউকে বিশ্বাস করে তার কাছে কোনো কিছু গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলে। আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য দায়িত্ব। বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে আমানতের খেয়ানত না করার কথা বারবার পড়েছি। আমানতের খিয়ানতকারী সম্পর্কে কঠিন হুশিয়ারির বর্ণনাও পেয়েছি। আমাদের মাঝেও আমানত নিয়ে অনেক আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। যেমন ধরুন, আমাদের মাঝ থেকে কেউ কারো কাছে কিছু একটা রাখল অথবা কোনো কিছু বলল, তখন বস্তুটি রেখে বা বলেই সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয় এটা তোমার কাছে আমানত হিসেবে রাখলাম। আমরাও কথা দিয়ে দিই যে, তোমার আমানত আমি গ্রহণ করলাম। কিন্তু একবারও ভেবে দেখি না যে, সে যা আমার কাছে রেখেছে তা কী আদৌ আমানত হবে কি-না। একবারও ভেবে দেখি না, অন্যের রাখা সবকিছুই কী গোপন রাখা আমানত গ্রহীতার জন্য ফরজ কি-না?
আমানত রাখার সময় ভেবে-চিন্তে রাখা : আমানত হলো, সাধারণত কারো কাছে কোনো হালাল উপায়ে অর্জিত অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত রাখা। এখানে একটা বিষয় ভালোভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তা যেন অবৈধভাবে উপার্জিত না হয়। যেমন, চুরি, ডাকাতি, ছিনিয়ে আনা সম্পদ আমানত রাখলে তা আমানত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং তার মূল মালিকের খোঁজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে অবগত করতে হবে এবং তার অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি আমানত গ্রহীতা সব জেনেও মূল মালিকের কাছে বিষয়টি গোপন রাখে তবে চোর, ডাকাত এবং ছিনতাইকারী চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই করে যে গোনাহের কাজ করল, গচ্ছিত রাখনেওয়ালা সত্যকে গোপন রেখে ততটুকুই গোনাহের কাজ করল। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মানুষ যখন কোনো অন্যায়কারীকে দেখেও অন্যায় থেকে তার হাতকে প্রতিরোধ করবে না, অতিসত্বর আল্লাহ তাদের সবার ওপর ব্যাপক আজাব নাজিল করবেন।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।
সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই। একটি সমাজে অপরাধ তখনই বেড়ে যায়, যখন অপরাধী বারবার অপরাধ করে পার পেয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! ন্যায়বিচারে তোমরা অটল থেক, আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য প্রদানকালে যদিও নিজেদের প্রতিকূলে যায় অথবা বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের, সে ধনী হোক বা গরিব, আল্লাহই উভয়ের জন্য উত্তম অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে নিজ নিজ খেয়ালখুশির বশীভূত হয়ো না।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১৩৫)।
অন্যায়ের প্রতিবাদ মোমিন ব্যক্তি কখন কিভাবে করবে তার নির্দেশনাও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করো, যদি সে তাতে সক্ষম না হয়, তবে সে যেন মুখে প্রতিবাদ করে; আর যদি সে তাতেও সক্ষম না হয়, তবে মনে মনে তা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করো। এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৯)।
কোন কোন বস্তু আমানত হিসেবে হবে : আমানত শুধু ধনসম্পদ নয়, বরং ব্যাপকার্থে যেকোনো জিনিস গচ্ছিত রাখাকেই আমানত বলে। আমানত শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিষয়বস্তু ব্যাপক। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম, শিক্ষকতা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব, মজুরি ইত্যাদি সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ মানুষের সুস্থ বিবেক, হাত-পা, চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ঠোঁট ইত্যাদি প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই অপরের কাছে আমানতস্বরূপ। পক্ষান্তরে নিজের কাছেও আমানতস্বরূপ। এগুলোর ব্যবহার প্রসঙ্গে বিচার দিবসে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘চোখের খিয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।’ (সুরা আল মুমিন : ১৯)। অনুরূপভাবে, শরিয়তের ফরজ কাজ, সতীত্বের হিফাজত, ফরজ গোসল, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদিও আমানত। এ কারণে বেশির ভাগ মনীষী বলেন, ‘দ্বীনের যাবতীয় কর্তব্য আমানতের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে কুরতুবি, ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯)।
হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর একদা রাতের বেলা বাতির আলোতে রাষ্ট্রীয় কাজ করছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে তার কাছে এলেন। আলী (রা.) বাতি নিভিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাব দিলেন, এতক্ষণ আমি সরকারি কাজ করছিলাম। তাই সরকারি তৈল ব্যবহার করেছি। এখন তো ব্যক্তিগত কাজ করছি। সরকারি বাতি ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানত হবে।
দায়-দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে যোগ্য, কর্মদক্ষ এবং আমানতদার ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত। অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া কেয়ামতের লক্ষণ। এ মর্মে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষায় থাক। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা আমানত নষ্টকরণের শামিল। আর এমনটি করা হলে বুঝবে কিয়ামত সন্নিকটে।’ (বোখারি : ৫৯)।
একটি দেশ বা জাতির উন্নতি বা অবনতির পিছনে আমানতদারীর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ আমানতদারিতা এমন এক মহৎ গুণ যার উপর জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। দেশ বা জাতির জন্য বিভিন্ন পদে দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি সে তার কাছে গচ্ছিত রাখা গোপন তথ্য অন্যের কাছে পাচার করে দেয় তবে সে দেশ বা জাতিকে সহজেই কাবু করা সম্ভব হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআয়ালা কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা আন নিসা : ৫৮)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তোমাদের ওপর ন্যস্ত আমানতের খিয়ানত করো না। অথচ তোমরা এর গুরুত্ব জানো।’ (সুরা আনফাল : ২৭)।
আমানতের খিয়ানত করা কবিরা গুনাহ ও মুনাফিকের আলামত, আর আমানত রক্ষা করা ঈমানদারের আলামত। হাদিসে এসেছে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই, আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন নেই।’ (সুনানে বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, মিশকাত, পৃষ্ঠা ১৫)।
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বোঝা যায় যে, কোনোভাবেই আমানতের খেয়ানত করা যাবে না। যার কাছে যার আমানত রাখা হয়েছে তাকে তার আমানত যথাযথ ফিরিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমানতের খেয়ানত করা কবিরা গুনাহ ও মুনাফেকের পরিচায়ক। হাদিসে মুনাফেকির পরিচয় এভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে সুস্পষ্ট মুনাফিক। আর যার মধ্যে এ স্বভাবগুলোর কোনো একটি থাকে, তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফেকির একটি স্বভাব থেকে যায়। আর তা হলো, তার কাছে কেউ কোনো আমানত রাখলে তার খেয়ানত করে। সে কথা বললে মিথ্যা বলে। ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং ঝগড়া করলে গাল-মন্দ করে।’ (বোখারি, মুসলিম, নাসাঈ, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)। অন্য হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফেকের আলামত ৩টি: যখন সে কথা বলে মিথ্যা বলে। ওয়াদা করলে বরখেলাপ করে এবং আমানত রাখলে এতে খেয়ানত করে।’ (মিশকাত)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যখন দুই পক্ষ মিলে যৌথ কোনো কাজ করে, আমি তখন তাদের তৃতীয় পক্ষ হই। যে পর্যন্ত তারা পরস্পরের সঙ্গে খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা না করে।’ (সুনানে আবু দাউদ)।
রাসুল (সা.) আরো বলেন, ‘যে তোমাকে বিশ্বাস করে তার বিশ্বাস রক্ষা করো, আর যে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।’ রাসুল (সা.) অন্যত্র বলেছেন, ‘মোমিনের মধ্যে আর যত দোষই থাক, খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাচার থাকতে পারে না।’ (মুসনাদে আহমদ)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমানতের খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন হাজির করা হবে এবং বলা হবে, তোমার আমানত ফিরিয়ে দাও। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেমন করে ফিরিয়ে দেব? দুনিয়া তো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার কাছে যে জিনিসটি আমানত রাখা হয়েছিল, সে জিনিসটিকে জাহান্নামের নিম্নস্থলে হুবহু দেখানো হবে। অতঃপর বলা হবে, তুমি সেখানে নেমে পড়ো এবং একে নিয়ে এসো। অতঃপর সে নেমে যাবে এবং জিনিসটি ঘাড়ে করে নিয়ে আসবে। জিনিসটি তার কাছে দুনিয়ার সব পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হবে। সে মনে করবে জিনিসটি নিয়ে এলেই হয়তো সে জাহান্নামের আজাব থেকে নিষ্কৃতি পাবে। কিন্তু জাহান্নামের মুখের কাছে আসামাত্রই আবার আমানতের জিনিসসহ জাহান্নামের নিম্নস্থানে পতিত হবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে।’
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা খিয়ানত করো না, কেননা খিয়ানত কতই না শাস্তি ও তিরস্কারযোগ্য অপরাধ।’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমার সঙ্গে চারটি জিনিস থাকলে পৃথিবীর সব হারিয়ে ফেললেও তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না : ১. আমানতের হিফাজত; ২. সত্যবাদিতা; ৩. উত্তম চরিত্র ও ৪. পবিত্র রিজিক (আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ৭৯৮৯)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের আমানতের গুরুত্ব বুঝে তার খেয়ানত থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ নবীন লেখক ফোরাম
"




































