শফিকুল ইসলাম

  ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অভিমত

প্রযুক্তির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হোক

অতীতে আমাদের ঘুম ভাঙত মোরগের ডাকে। এখন ঘুম ভাঙে স্মার্টফোন বা আইফোনের রিংটোনে। সবই প্রযুক্তির অবদান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদিও প্রযুক্তির কল্যাণে সম্ভব হয়েছে। আমরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অনেকভাবে উপকৃত হই। আবার অনেকেই নানাভাবে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার। এরই মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। সাইবার বুলিয়িং কেবল ঘৃণিত কাজ নয় বরং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) অ্যাক্ট-২০০৬-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাইবার বুলিয়িং বলতে এমন একটি কাজকে বোঝায়, যা অনলাইন প্ল্যাটফরমে ইলেকট্রনিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটে। যেমন- টেক্সট মেসেজ, ই-মেইল, চ্যাট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট, যেখানে মানুষ হয়রানিমূলক, হুমকির উদ্দেশ্য নিয়ে নেতিবাচক, ক্ষতিকারক বা গড়পড়তা বিষয়বস্তু শেয়ার করে অন্যকে অপমান বা বিব্রত করে। এটি অবৈধ বা অপরাধমূলক আচরণ বললেই শেষ হবে না। বরং এটা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনকি ভুক্তভোগী আত্মহত্যাও করে থাকে। ইন্টারনেটের যুগে সবাইকে সচেতন হতে হবে এ বিষয়ে এবং সরকারকে এটা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আর কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার না হয় বা কারো যেন মৃত্যুবরণ করতে না হয়।

সাইবার বুলিয়িং এবং অনলাইনে চরিত্র হনন সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে নারীর বিরুদ্ধে এমন ঘটনা বেশি ঘটছে; সংবাদমাধ্যমে তা জানতে পাই। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের একটি অংশ বিরক্তিকর, অশালীন মন্তব্য পোস্ট করে এবং মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে সোশ্যাল মিডিয়ায় টেনে আনে। বিশেষ করে যখন ভিকটিম বা অভিযুক্ত নারী হয়, তখন বুলিয়িং আরো খারাপ পরিস্থিতি ধারণ করে। পর্যবেক্ষণ ও অনলাইন সতর্কতার অভাবে সাইবার বুলিয়িং চলতে থাকে অব্যাহতভাবে এবং অপরাধীরা শাস্তি থেকে পার পেয়ে যায়। বর্তমানে সাইবার বুলিয়িং সমাজের জন্য কালো থাবা। একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ সাইবার বুলিয়িংয়ের শিকার।

তবে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সাইবার অপরাধ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় পক্ষপাতমূলক মনোভাব দেখিয়ে থাকে। যদিও ঢালাওভাবে বলা যাবে না, কারণ অনেক ভালো পুলিশ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যও রয়েছেন। অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হলেও আইনের সঠিক প্রয়োগ করতেই হবে। অন্যথায় এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলবে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে, যাতে কেউ বৈষম্যের শিকার না হন। রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী বিষয়, ভুয়া অনলাইন সংবাদ এবং ধর্মীয় অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে পারে এমন পোস্টসহ সাইবার বুলিয়িংয়ের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি এবং তা বন্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিদিন সাইবার ক্রাইম বিষয়ে ৬০ থেকে ৭০টি অভিযোগ পেয়ে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অপরাধী কর্তৃক প্রায়ই আপত্তিকর এবং অশ্লীল পোস্ট ও মন্তব্য। সাইবার বুলিয়িংয়ের অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ফারহানা আফরোজ নামে এক নারী সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হন। ফেসবুকে তার ছবিটি ভাইরাল হয় এবং তাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়, যেখানে তিনি যশোর শহরে তার বিয়ের অনুষ্ঠান উদযাপন করতে বন্ধুদের একটি মোটরকেডে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ২৬ জুন আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বরগুনা শহরে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় স্ত্রীকে চিৎকার করে তার স্বামীকে আক্রমণকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে। পরে তদন্তকারীরা দাবি করেন, স্ত্রী এ হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিল এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখানে দুটি ঘটনা উল্লেখ করলাম। এ রকম শত শত ঘটনা ঘটছে। এজন্য সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সরকার বিভিন্ন উপায়ে ইন্টারনেট সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে জেল-জরিমানাসহ অনেক পদক্ষেপ নিতে পারে। এ ছাড়া আইসিটি মন্ত্রণালয় বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। তাহলেই সমাজবিরোধীরা এ ধরনের সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধে লিপ্ত হতে সাহস পাবে না। ইন্টারনেটের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহারই কাম্য।

লেখক : শিক্ষক

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close