রাইসা বিনতে করিম
পর্যালোচনা
বাংলাদেশের ভূমিকম্প ও বর্তমান পরিস্থিতি

ভূপৃষ্ঠ অনেকগুলো প্লেটের ওপরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। প্রতিটি প্লেটের পুরুত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্লেটগুলোর নিচে রয়েছে কিছু উত্তপ্ত ও গলিত পদার্থ। প্রতি বছরই এই ভূ-অভ্যন্তরীণ প্লেটের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। কারণ, ভূ-অভ্যন্তরের উত্তপ্ত ও গলিত গ্যাসগুলো যখন ভূপৃষ্ঠের কোনো ফাটল অথবা আগ্নেয়গিরির মুখ দিয়ে বের হয়, তখন ওই গ্যাসের জায়গা খালি হয়ে পড়ে। ভারসাম্য রক্ষার জন্য অন্য প্লেট এসে তার ওপর গিয়ে দেবে যায়। প্লেটের এই স্থানান্তরের কারণে ভূপৃষ্ঠে প্রচন্ড কম্পনের সৃষ্টি হয়। আর এই কম্পন তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যেটিকে আমরা ভূমিকম্প বলে থাকি। অর্থাৎ প্রাকৃতিক কারণে ভূমি কেঁপে ওঠাই হলো ভূমিকম্প।
সারা পৃথিবীতে গড়ে প্রতি বছর সাড়ে ছয় হাজারের মতো ভূমিকম্প হয়ে থাকে, যার সবগুলো আমরা টের পাই না। কারণ অধিকাংশই মৃদু আকারের হয়ে থাকে। কিন্তু প্রচন্ড আকারে অনুভূত ভূমিকম্পগুলো কয়েক সেকেন্ডেই ঘটিয়ে দিতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। ভূমিকম্পের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভূপৃষ্ঠজনিত কারণ অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে গলিত পদার্থের স্থানান্তরের ফলে ওই ফাঁকা স্থানের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ভূপৃষ্ঠের প্লেটগুলোর ও স্থানচ্যুতির ফলে ভূমিতে কম্পন সৃষ্টি হয়। আগ্নেয়গিরিজনিত কারণেও ভূমিকম্প ঘটে। অনেক সময় আগ্নেয়গিরির গলিত লাভা বের হওয়ার ফলে ভূপৃষ্ঠে কম্পন সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রয়েছে ভূগর্ভস্থ বাষ্প। ভূগর্ভস্থ বাষ্প বেড়ে গেলে ভূত্বকের নিম্নভাগে ধাক্কা দেয় এবং ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ ছাড়া তাপ বিকিরণ, ভূপাত, শিলাচ্যুতি ও হিমবাহের প্রভাবেও ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
তীব্রতার দিক দিয়ে অগভীর, মধ্যবর্তী ও গভীর এই তিনভাগে ভূমিকম্পকে ভাগ করা হয়েছে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ভূপৃষ্ঠের ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে হলে সেটি অগভীর অর্থাৎ তখন সেখানে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হবে। ৭০-৩০০ মিটারের মধ্যে হলে সেটি মধ্যবর্তী অর্থাৎ মাঝারি কম্পন অনুভূত হবে এবং ৩০০ মিটারের বেশি গভীরে হলে সেটি গভীর অর্থাৎ সেখানে প্রচন্ড ভূমিকম্প অনুভূত হবে। ভূমিকম্পের স্থায়িত্ব সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে অল্প কয়েক মিনিট পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই সব লন্ডভন্ড করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর শক্তিশালী ক্ষমতা রাখে এই কম্পন। ভূমিকম্পের মান নির্ণায়ককে রিখটার স্কেল বলা হয়। স্কেলের মান ১-১০ পর্যন্ত ধরা হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৫-৫.৯৯ হলে মাঝারি, ৬-৬.৯৯ হলে তীব্র এবং ৮-এর অধিক অত্যন্ত ভয়াবহ। ভূমিকম্প পরিমাপের আরেকটি উপায় হলো মোমেন্ট ম্যাগনিচিউট পদ্ধতি এবং ভূমিকম্পনের একক হলো ম্যাগনিচিউট।
বাংলাদেশ স্বভাবতই প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত একটি দেশ। প্রতি বছরই এই দেশের মানুষ নানা ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের ও আতঙ্কের বিষয় হলো, অন্য সব দুর্যোগের প্রতি মোটামুটি সচেতন ও প্রস্তুতি থাকলেও ভূমিকম্পের জন্য কোনো সচেতনতা ও প্রস্তুতি কোনোটিরই পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। অন্যান্য দুর্যোগের চেয়ে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ ভূমিকম্পের আগে কোনো আগাম সংকেত পাওয়া যায় না। কিন্তু গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভূমিকম্পের জন্য বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত করা যায়। বাংলাদেশ প্লেট বাউন্ডারির মধ্যে অবস্থান না করলেও ভৌগোলিকভাবে এটি ভূমিকম্প মন্ডলের আশপাশেই রয়েছে। ভূমিকম্পের জন্য বিপজ্জনক স্থানের ধরন অনুযায়ী বাংলাদেশকে ৩টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মাঝারি এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ রয়েছে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে। আর ভূমিকম্পের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম, মেঘালয়ের সীমান্তসংলগ্ন সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চল। কিছুদিন আগেই এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাই। গত মে মাসের ২৯ ও ৩০ তারিখে সিলেটে পরপর দুদিনে পাঁচবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, এই ভূমিকম্পের মধ্যে চারটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৪.১, ৪.৩ এবং ২.৮।
বিজ্ঞানীদের মতে, অনেক বড় কোনো ভূমিকম্প হওয়ার আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প ঘটে থাকে। সিলেটের এই ভূমিকম্পের ইতিহাস কিন্তু পুরোনো নয়। ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫ বা তার অধিক মাত্রার অনেকগুলো ভূমিকম্পের বেশির ভাগ এখানেই সংঘটিত হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের গবেষণা মতে, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং মিয়ানমার এই তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোণে সিলেট অঞ্চলের ডাউকি ফল্ট এবং আমাদের পূর্বের চিটাগাং, ত্রিপুরা বেল্টের পাহাড়ি এলাকার ভূগর্ভে শক্তিশালী ভূমিকম্পের শক্তি জমা হয়েছে। সেখানে প্রতি ১০০ বছরে ১ মিটার ভূমি সংকুচিত হয়। যেহেতু কয়েকশ বছর এখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের কোনো ইতিহাস নেই; তাই এখন ৭.৫-৮ মাত্রার ভূমিকম্প এখানে অনায়াসে হতে পারে। যার ফলে সিলেট ছাড়াও ঢাকা অঞ্চলটি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকা পৃথিবীর শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে ২০তম স্থানে অবস্থানে রয়েছে। ঢাকা নগরী নির্মিত হয়েছে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে। সাধারণত কোনো শহরের অবকাঠামো তৈরি হয় মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঢাকার ক্ষেত্রে কোনো মাস্টারপ্ল্যানই বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাই পুরো অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা এই শহরে জলাধার ভরাট করে বানানো হয়েছে বহুতল ভবন। মাটি পরীক্ষাবিহীন সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসন। অত্যধিক নগরায়ণের ফলে ঢাকায় এখন খোলামেলা জায়গা পাওয়াও দুঃসাধ্য ব্যাপার। যত্রতত্র ভবন গড়ে উঠছে, লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার কারণে নতুন করে কোনো মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হলেও তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
একদিকে অনিয়ন্ত্রিত ভবন; অপরদিকে সেই ভবনগুলোই আবার অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। একটি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য কোনো বিচক্ষণ স্থপতির সাহায্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন নিয়মবহির্ভূত ও বিল্ডিং কোড ছাড়া তৈরি হয়েছে। সরকারি অনুমোদন পেলেও তা কতটা কার্যকর, সেটি নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আবার নির্মাণসামগ্রীর মান ও শুদ্ধতা নিয়ে তো প্রশ্ন থেকেই যায়। এমনকি এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো পরীক্ষা করার জন্য সুষ্ঠু কোনো ব্যবস্থাও নেই। এই বিশাল শহরে এত এত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে ভূমিকম্পের মোকাবিলা কীভাবে করবে, তা বলা মুশকিল। শুধু ভূমিকম্পের জন্য যতটা ক্ষতি হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে অবকাঠামোগত কারণে। অনেক বড় কোনো ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এমতাবস্থায় বড় কোনো ভূমিকম্প হলে তা সামাল দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। এতগুলো ভবন ধসে পড়ার ফলে বিশাল আকারের কংক্রিটের স্তূপ জমা হবে। আর তার নিচে আটকা পড়বে অনেক মানুষ। ঢাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খোলা জায়গা নেই বলে মানুষ সহজেই নিরাপদ জায়গায় যেতে পারবে না। তাই এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আন্দাজ করলেই বোঝা যায় কতটা বিপজ্জনক হতে পারে পরিস্থিতি।
ভূমিকম্প নিয়ে সাধারণ জনগণের বিশেষ কোনো জ্ঞান নেই বললেই চলে। পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা অনেক বেশিই হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই সবার আগে দেশের জনগণকে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করতে হবে। যেহেতু কিছুদিন আগেই পরপর দুদিন কয়েক দফা ভূমিকম্প একসঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল। এতে বোঝাই যাচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্পের সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ। এমতাবস্থায় সবাইকে সচেতন ও সতর্ক হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
ভূমিকম্পের আগে, ভূমিকম্প চলাকালীন ও ভূমিকম্পের পর কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; সেসব কিছুই অনেক গুরুত্ব সহকারে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে। কী কী কাজ করলে ভূমিকম্পের ক্ষতি কিছুটা এড়ানো যাবে, তা জনগণকে বোঝানো প্রয়োজন। সঠিক উপায়ে ভবন তৈরি করা, ভবন তৈরির ক্ষেত্রে বিপজ্জনক স্থান বাদ দেওয়া, পরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ করা, বিল্ডিং কোড অনুসরণ করার দিকে নজর দিতে হবে। সেই সঙ্গে বাসার কক্ষগুলোতে একের অধিক দরজার ব্যবস্থা রাখা, ভবন নির্মাণে দক্ষ প্রকৌশলীর সাহায্য নেওয়া, পর্যাপ্ত খোলা জায়গার ব্যবস্থা রাখা, বিদ্যুৎ, গ্যাসলাইন বন্ধের নিয়ম পরিবারের সব সদস্যকে শেখানো ও বাসার ওপরের তাকে ভারী জিনিস না রাখা ও ভূমিকম্প চলাকালীন আতঙ্কিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রাখার দিকেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে দৌড়ে ভবনের বাইরে চলে যাওয়া বা খাটের নিচে অথবা টেবিলের নিচে অবস্থান নিতে হবে। উঁচু দালান থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা না করা, লিফ্ট ব্যবহার না করা। ভূমিকম্প পরবর্তীকালে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, উদ্ধারকাজে সাহায্য করা, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপজ্জনক ভবন ত্যাগ করা, ত্রাণ সরবরাহ করা ও সরকারের নির্দেশনা মেনে চলার বিকল্প নেই।
ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার, ফায়ার ব্রিগেড, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিমানবাহিনী, রেড ক্রিসেন্ট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে। অন্যান্য দুর্যোগের আগে যেমন পূর্বাভাস দেওয়া যায়, ভূমিকম্পের আগে তা দেওয়া যায় না বলেই ভূমিকম্প সবার জন্যই অনেক আতঙ্কের একটি বিষয়। যেহেতু বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ভূমিকম্পের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে; তাই দুর্যোগপূর্ব সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
"




































