ড. শাহনাজ পারভীন
বিশ্লেষণ
ভাষার ইশারা ও ইশারার ভাষা

ভাষা আন্দোলন একটি চেতনার নাম। একটি স্বাধীন দেশের অঙ্কুরাবৃত্ত, একটি স্বাধীনসত্তার প্রকাশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই উপ্ত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে খুব সহজেই স্বপ্নের স্বাধীনতার পেখম মেলেছিল দিগিদিক। এ দেশের মানুষ বন্দিদশা থেকে মুক্তির সনদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তারা অনুভব করেছিল আন্দোলন, সংগ্রামের মাধ্যমে সবকিছুই আদায় করে নেওয়া সহজ। যেমনটি তারা আদায় করেছিল ভাষার মাধ্যমে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর আমাদের ‘ভাষা শহীদ’। ৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত ভাষা শহীদদের অবদান কতটুকু সেটা আজ পৃথিবীর মানচিত্রে জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নাম দেখলেই বোঝা যায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার পর কিছুদিন পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেছিল যে, ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম হয়। দানা বেঁধে ওঠে বাংলাভাষার মর্যাদার দাবিতে আন্দোলন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে কার্জন হলের এক জনসভায় ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করার পর সেই আন্দোলন আরো গতি পায়। গড়ে তোলে দুর্বার আন্দোলন। ক্ষুদ্রতম একটি স্ফুলিঙ্গ যেমন একটি প্রকান্ড দাবানল সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের গণ-আন্দোলনের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ থেকে ১৯৫২ সালে সৃষ্টি হয়েছিল একটি দাবানল এবং সেই দাবানলই কালক্রমে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল।
প্রকৃতিতে প্রচন্ড শীতের তান্ডব কমে গেছে। গাছে গাছে, কুড়িতে কুড়িতে, ফুলের সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছে। আকাশে-বাতাসে আনন্দধ্বনি। পাখিদের নতুন নতুন কলকাকলিতেও শীতের জড়তা ভেঙে ভাষার নতুন মাধুর্যের সুর ছড়াচ্ছে। নতুন ভাষার গুঞ্জনে কাঁপছে পৃথিবী। সারা পৃথিবীর পাতায় পাতায়, ডালে ডালে, জলে, স্থলে, শাখায় শাখায় মঞ্জুরিতে মৌমাছির গুঞ্জনে ভাষার পিউপাপিয়া উড়ছে যেন। সৃষ্টির কত রহস্য। কখনো কখনো এই অসংখ্য রহস্যময় পৃথিবীতে কিছু কিছু রহস্য ভেদ করার মতো জ্ঞান সৃষ্টিকর্তা আমাদের দেননি। আমাদের শুধু দেখে যেতে হয়। দেখে দেখে শিখে যাওয়ার অনন্ত প্রচেষ্টায় রত থাকতে হয়। তেমনি একটি রহস্য ভাষার ইশারা। সম্ভবত পৃথিবীতে মুখের ভাষা সৃষ্টির আগেই ইশারা ভাষার উদ্ভব ঘটে।
ইশারা বা সাংকেতিক ভাষা বা প্রতীকী ভাষা বা সাইন ল্যাংগুয়েজ বলতে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিশেষ নড়াচাড়া বা ভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করাকে বোঝায়। যারা অর্বাচীনÑ যাদের ঠোঁটে বচন নেই, তারা ঘরোয়া ইশারার মাধ্যমে বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এই ভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে। হাত ও বাহু বিশেষভাবে নড়ানোর মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতিতে ইশারা ভাষা বোঝানো হয়। মুখের ভাষায় যোগাযোগ করা অসম্ভব হলে এই ভাষা ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া মুখের বিভিন্ন ভঙ্গিমা, কাঁধের ওঠানামা কিংবা আঙুল তাক করাকে মূলত ইশারা ভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে প্রকৃত ইশারা ভাষা বলতে হাত ও আঙুল দিয়ে সৃষ্ট সুচিন্তিত ও সূক্ষ্ম দ্যোতনাবিশিষ্ট সংকেত সমষ্টির ব্যবহারকেই আমরা বুঝে থাকি। আঙুল ছাড়াও এর সঙ্গে সাধারণত মুখমন্ডলের অভিব্যক্তিও যুক্ত করা হয়। মূক ও বধির লোকেরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ইশারা ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন ইশারা ভাষা রয়েছে।
সারা বিশ্বে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের মনের ভাব বিনিময়ের জন্য ইশারা ভাষাই একমাত্র উপায়। মনের ভাব প্রকাশ করা এ ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়ে পালিত হয় বাংলা ইশারা ভাষা দিবস। ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৭ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। দেশে বর্তমানে শ্রবণ প্রতিবন্ধীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনের প্রকাশ ঘটে এ ভাষার মাধ্যমে। বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন ইশারা ভাষা রয়েছে। আদিবাসী ইশারা ভাষা, নৃতাত্ত্বিক ইশারা ভাষা রয়েছে। বাক প্রতিবন্ধীদের ভাষার ব্যাপারে চার হাজার চিহ্ন আছে। ইশারা ভাষার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পৌঁছাতে পারে না, সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে।
এ ছাড়া অটিস্টিক, নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের অনেকে ইশারা ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে অটিস্টিক, নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদেকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়। অটিস্টিক, নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের মতো এখনো পর্যন্ত শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীরা ওইভাবে গুরুত্ব পায় না। বর্তমান দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সুযোগ্যকন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল প্রতিবন্ধী ও অটিজম শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন। দেশে ব্রেল পদ্ধতি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উচ্চশিক্ষায় সম্পৃক্ত করা হয়, কিন্তু ওইভাবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে বাকপ্রতিবন্ধীরা উচ্চশিক্ষায় সম্পৃক্ত হতে পারছে না। বর্তমান সময়ে অটিজম নিয়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাকপ্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে ওইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাই যথাযুক্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইশারা ভাষার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ইশারা ভাষীদের অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। বধির স্কুলগুলোতে ইশারা ভাষার একটা চল আছে। সেটাকে বিশ্বমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বাকপ্রতিবন্ধীদেরও মূল উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে ভাষা প্রযুক্তির সাহায্যে ইশারা ভাষার একটা স্ট্যান্ডার্ড কোড তৈরি করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা ব্যবহার করণে প্রমিতকরণ সম্ভব হয়েছে, তেমনি ইশারা ভাষাকে স্ট্যান্ডার্ড করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে একটি স্ট্যান্ডার্ড কোড তৈরি করতে হবে। বাংলা ইশারা ভাষা শেখা এবং বধিরদের মানবাধিকার পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে জাতিসংঘ ঘোষিত ও বিশ্ব বধির সংস্থার স্বীকৃত ভাষাটি সবাইকে শেখানোর প্রয়োজন এখন সময়ের। সব ধরনের প্রতিবন্ধীকে যদি একটি স্ট্যান্ডার্ড ভাষা কোডের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলেই আমাদের বাংলা ভাষা আন্দোলন সার্থক ও সার্বজনীন হবে বলে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস।
লেখক : কবি, ভাইস প্রিন্সিপাল
উপশহর মহিলা কলেজ, যশোর
"




































