reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৩ আগস্ট, ২০২০

বিশ্লেষণ

দাস প্রথা ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়

রেজাউল করিম খান

দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে কারো আজ্ঞাবহ হয়ে জীবনযাপনের মধ্যে ভিন্ন ধরনের এক সুখ আছে। প্রবলের প্রতি আনুগত্যের যে প্রতিযোগিতা আমরা লক্ষ করি, তাতে আনন্দচিত্তে আপনিও লজ্জিত হতে পারেন। লেখার শুরুতেই এইটুকু পড়ে অধিকাংশ পাঠক হয়তো আমাকে কটুবাক্যে আত্মীয় হিসেবে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহী হতে পারেন। এতে আবশ্য আমার আপত্তি থাকবে না। কারণ জানি, এই লেখাটি শেষ পর্যন্ত আপনি পড়বেন। সেই আদিকাল থেকে যখন যূথবদ্ধ সমাজের সূচনা, রাজনীতির শুরু তখন থেকেই। রাজার নীতি বলে কথা! মানতে হয় দাস-অনুদাস প্রজাকে। অবাধ্যের জন্য কঠোর শাস্তি। সুতরাং শৃঙ্খল কাঁধে নিয়ে জীবনের ঘানি টেনে দ্রুত স্বর্গপ্রাপ্তির পথে যাত্রা করার মধ্যেই পরম শান্তি। সহস্র বছরের প্রাচীন জলা-জঙ্গলে পূর্ণ এই ভূমিতে কতই না বিচিত্র পেশাজীবীর আগমন। কোল-ভিল-সাঁওতাল, কুলি-কামিন, কামার-কুমার-ধীবর, মুচি-মেথর, আবাল-যুবক-বনিতা, সবাই রাজ-রাজন্যের সেবায় নিয়োজিত থেকে জীবন উৎসর্গ করেছেন। সে একসময় ছিল বটে। বেয়াড়া কালো মানুষের পিঠের চামড়া থেকে বের হওয়া রক্তে রঞ্জিত হয়েছে শাসকের চাবুক। ভাড়াটের লাঠির আঘাতে নিভে গেছে কতজনের জীবন প্রদীপ। তবু তারা থেমে যাননি। প্রতিবাদ করেছেন, বিদ্রোহ করেছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন লড়াইয়ের ময়দানে। এই হচ্ছে বঙ্গভূমির দাস গল্পের গৌরচন্দ্রিকা।

আজ আন্তর্জাতিক দাস বাণিজ্য স্মরণ ও রদ দিবস। ইউনেসকোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বছর ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে দাস বাণিজ্য স্মরণ ও রদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এখন দাস প্রথাকে মানব ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বলা হয়। তবে এখন দাস প্রথাকে যত অদ্ভুতই মনে হোক না কেন, একসময় এটিই ছিল স্বাভাবিক। বিত্তশালীদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল দাস। শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ঘরেও দাস থাকত। মানুষকে জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য করাকেই বোধকরি দাসত্ব বোঝায়। মানুষই হয়ে যায় অন্য এক মানুষের সম্পত্তি। এই দাস প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। সে যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকন জিতেছিলেন এবং দাস প্রথার বিলোপ ঘটাতে পেরেছিলেন। তবে আধুনিক সমাজে আজ পর্যন্ত সত্যিই কি দাস প্রথার বিলোপ ঘটেছে? সমাজবিদরা বলছেন, দাস প্রথার রূপান্তর ঘটেছে, কিন্তু তা সমাজে আজও বিদ্যমান।

কোন্টাকিন্টের কথা আশা করি অনেকেরই মনে আছে। ‘রুটস : দি সাগা অব অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি’ উপন্যাসে নিজের পূর্বপুরুষের জন্ম ইতিহাস বর্ণনার মধ্য দিয়ে আমেরিকান লেখক অ্যালেক্স হ্যালি দাস প্রথার নির্মমতা, দাসদের করুণ জীবনের কথা তুলে এনেছিলেন আমাদের সামনে। ওই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘রুটস’ বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ দেখার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সূত্রেই কোন্টাকিন্টে আমাদের পরিচিত। আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয়তম এই টিভি সিরিয়াল কাঁদিয়েছে এ দেশের মানুষকেও। এসব দাসের ছিল না কোনো স্বাধীনতা। প্রভুর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে বিয়েও করতে পারতেন না তারা। নিতান্ত পরাধীনতার মধ্যে থেকেও এ দাসরা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অত্যন্ত উঁচুমানের তুলা উৎপাদন করতেন। দাস প্রভুরাও তুলা চাষের জন্য ফ্রি লেবারের পরিবর্তে ক্যাপটিভ লেবারই পছন্দ করতেন। দাস প্রথাকে তারা জিইয়ে রাখতে চেয়েছিলেন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে। তাদের ধারণা ছিল, দাস শ্রমিকদের কাছ থেকে শ্রমশক্তির পুরোটাই নিংড়ে নেওয়া সম্ভব।

আধুনিক সমাজে সেই দাস প্রথা রদ করা হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী মহাজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে পরে শোধ দিতে না পারায় পুনরায় দাসে পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু আছে কয়েক প্রজন্মের দাস। এর বাইরে এখনো মানুষ পাচার হচ্ছে, মূলত নারী ও শিশুদের যৌন ব্যবসায়ে নিয়োজিত রাখার জন্য। এটিকে বর্ণনা করা হয় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ দাস বাণিজ্য হিসেবে। অবৈধ মাদকদ্রব্য পরিবহনে ব্যবহার করার কারণে একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অপরাধ ক্ষেত্র। মানুষের সুবিধাবাদী চরিত্রের কারণে দাস প্রথা সমাজ থেকে নির্মূল হয়নি। হবেই এটা জোর দিয়ে বলাও যাচ্ছে না। অবশ্য যদি প্রত্যাশিত সরকার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে, তাহলে দাস প্রথা কমে আসার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে সেই আশা দেখা যাচ্ছে না। আমরা যাদের কাজের লোক বলি, তারাও তো এক ধরনের দাস। আমরা ঘুম থেকে ওঠার আগে তারা বিছানা ছাড়ে। আর ঘুমায় আমরা শুতে যাওয়ার পর। তাদের কোনো কর্মঘণ্টা নেই, নেই নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, ছুটি নেই। অনেক বাড়িতে তাদের ভালোমতো খাবারও দেওয়া হয় না। অনেকে নিজেদের জন্য ভালোটা আর কাজের মানুষের জন্য কম দামের চাল বরাদ্দ করেন। তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণি এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদ করেন না। কারণ তাহলে তারা সুবিধাবঞ্চিত হবেন। ফলে এই প্রথা বজায় থাকছে। তাই বলাই যায়, দাস প্রথা সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়নি।

কলোনিয়াল দাসপ্রথা শুরু হয় পর্তুগিজ জলদস্যুদের মাধ্যমে, আফ্রিকা থকে দস্যুরা কালোদের ধরে নিয়ে ইউরোপে বিক্রি করত। পরে ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয়ও এ ব্যবসায় জড়িত হন। এমন হতো যে, হাজারখানেক ক্রীতদাস নিয়ে নৌজাহাজ রওনা দিয়ে ৫০০-এর কম দাস আমেরিকা গিয়ে পৌঁছাত। নিউ ওয়ার্ল্ড বা আমেরিকা গড়ে ওঠে কালোদের মর্মান্তিক শ্রমে, তারা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। দাস ছিল মুনিবের সম্পত্তি, বিনা পারিশ্রমিকে সে দাসকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারতেন। সেসময় অনেকেই ঋণের দায় থেকে বাঁচতে দাসত্বকে বরণ করে নিতে বাধ্য হতেন। দাসের সন্তানও দাস বলে গণ্য হতো। যুদ্ধে পরাজিত হয়েও অনেক সময় দাসত্ববরণ করতে হতো। অমানবিকভাবে সারা জীবন খেটে মরতে হতো তাদের। এ চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না, যদি না তাদের মুনিব তাদের মুক্তি দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসিত বাংলাসহ সারা বিশ্বেই দাস কেনা বেচার জন্য বাজার গড়ে উঠেছিল। এ বাজারে আফ্রিকার নিগ্রোদের চাহিদাই বেশি ছিল। তাদের জোর করে ধরে আনা হতো। আর বিক্রি করা হতো ইউরোপের বাজারে।

প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগে সমাজে মানুষ কেনাবেচার একটি প্রথা ছিল। যা দ্বারা বিভিন্ন মূল্যের বিনিময়ে মানুষ কেনা যেত। এই প্রচলিত প্রথাটিকেই দাস প্রথা বলা হয়ে থাকে। দাস অথবা দাসী বর্তমান বাজারের পণ্যের মতোই বিক্রি হতো। বর্তমানে যেমন পণ্য বেচাকেনার বাজার আছে, অতীতেও দাসদাসী বিক্রি অথবা কেনার আলাদা বাজার ছিল। সভ্যতা বিকাশের ধারায় মানবসমাজে উদ্ভব ঘটে দাস প্রথার। কালের টানে একসময় বিলোপও হয়ে যায়। কিন্তু সভ্যতার গায়ে ক্ষতচিহ্নের মতো রয়ে গেছে এই অমানবিক প্রথার দাগ। দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক তারিখ নেই। একেক দেশে একেক দিন দাস প্রথাকে বিলোপ করা হয়। প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় পন্ডিত কৌটিল্য দাস প্রথা তুলে দিতে তার সম্রাটকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সম্ভবত এটাই দাস প্রথা বিলোপের প্রথম উদ্যোগ। আর সর্বশেষ দাস প্রথা বিলুপ্ত হয় ১৯৬৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ২ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য এবলিউশন অব স্লেভারি’ হিসেবে। এদিন মূলত স্মরণ করা হয় সভ্যতা বিকাশে দাসদের অবদানের কথা, স্মরণ করা হয় গ্লানিময় এক প্রথার কথা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়