পর্যবেক্ষণ

প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার সময় এসেছে

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

ফারহান ইশরাক

চলমান মহামারি একদিকে যেমন আমাদের স্বাভাবিক জীবনাচরণকে ব্যাহত করছে, প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করছে, পাশাপাশি এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নতুন উপলব্ধিও দেখা দিয়েছে মানুষের মনে। নিত্যনতুন ভাবনা আমাদের মনোজগৎকে আলোড়িত করছে, চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে। এ বিষয়গুলো যেমন ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়েছে, পাশাপাশি জাতি হিসেবেও নিজেদের প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

করোনা ছড়িয়ে পড়ার প্রারম্ভিককালে বিশ্বের ব্যস্ততম শহর, শিল্পনগরী, বিনোদন কেন্দ্রগুলো যখন জনশূন্য হয়ে মানবসভ্যতাকে এক অজানা শঙ্কার সতর্কবার্তা দিয়ে প্রতিমুহূর্তে আসন্ন বিপদের বাণী শোনাচ্ছিল, ঠিক সেসময়েই বেজে উঠল প্রকৃতির জয়গান। প্রকৃতি যেন মানবসমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর, আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির নিজস্ব অধিকারের কথাও সোচ্চার কণ্ঠে জানান দিয়ে গেল আমাদের। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বন্যপ্রকৃতি, গাছ-লতাপাতা, পশুপাখি-সামুদ্রিক প্রাণী সবই যেন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সমস্বরে চিৎকার করে বলছে, ‘এ গ্রহ তোমাদের যেমন, সমানভাবে আমাদেরও। স্বাধীনভাবে বাঁচার সর্বশেষ সুযোগটুকু নষ্ট করে দিও না। আমরা তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করিনি!’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে আরোপিত লকডাউনে একদিকে মানবসমাজের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অপরদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশ স্বমহিমায় জেগে উঠতে শুরু করেছে। নতুন করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সজ্জিত হয়েছে পৃথিবী। এ সময় গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে বেশ কিছু চমক জাগানিয়া দৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সাগরে, সমুদ্রতীরে ডলফিনের মনোরম নৃত্য যেমন চোখে প্রশান্তির ঢেউ তুলেছে, তেমনিভাবে শহরের রাস্তায় বন্যপ্রাণীর স্বাধীন চলাফেরাও আমাদের আলোড়িত করেছে। এ দৃশ্য শুধু আমাদের দেশ বা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেরই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের দৃশ্য চোখে পড়েছে। মানুষের দীর্ঘ অবসর, কর্মবিরতির ফাঁকে প্রকৃতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে নিয়েছে। এই দৃশ্যগুলো আমাদের একটি শিক্ষণীয় বার্তা দেয়। আর তা হলো, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় আমাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে।

যান্ত্রিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, শিল্প-কারখানার সংখ্যাধিক্য, জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কয়েক দশক ধরেই পৃথিবীব্যাপী, বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ক্রমাগত অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্প-কারখানা, যানবাহন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি থেকে নির্গত বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস যেমনÑ কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন প্রভৃতি ওজোনস্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব গ্যাসের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতাও দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাবে পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি করছে; যা মানুষের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি। আবার নতুন শহর তৈরি ও শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস ও বৃক্ষ নিধনও চলছে সমানতালে। পৃথিবীর ওপর এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ।

দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়ে চলার ফলে প্রকৃতিতে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতিও প্রত্যক্ষ করেছে পৃথিবীর মানুষ। গাছপালা, বনাঞ্চল উজাড় করে ফেলার কারণে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পশুপাখি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এভাবে দিনে দিনে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। করোনা মহামারির এ সময়ে প্রকৃতি মানুষের এই নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে, পেয়েছে মুমূর্ষু অবস্থা থেকে সতেজ হওয়ার সুযোগ। তাই প্রকৃতি চেষ্টা করেছে নিজের মতো করে বিকশিত হওয়ার। বিভিন্ন শহরে, সমুদ্র উপকূলে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে দৃশ্য দেখেছি, তা দীর্ঘ সময়ের পরিবেশ দূষণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি সামলে নিতে প্রকৃতির নিজস্ব চেষ্টা মাত্র। আমাদের সময় এসেছে এই ক্ষতি সামলে নেওয়ার মিছিলে যোগ দেওয়ার, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করার।

আমাদের সময় এসেছে প্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাববার। করোনাভাইরাস আমাদের চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমালে প্রকৃতি তার আপন রূপে ফিরে যেতে সক্ষম; সে প্রাণশক্তি তার আছে। প্রকৃতিকে সেই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। লকডাউন কোনো স্থায়ী পদ্ধতি নয়। পৃথিবী থেকে একসময় করোনা নামক মহামারি বিদায় নেবে, বিদায় নেবে লকডাউন ব্যবস্থা। পৃথিবীও তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। কিন্তু পরিবেশ দূষণকে পূর্বের মাত্রায় ফিরতে দেওয়া যাবে না, বরং দূষণের হার হ্রাস করতে হবে। শিল্প-কারখানাসমূহ খুলে দেওয়া হলে পুনরায় যাতে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ শুরু না হয়, সেজন্য এখন থেকেই কার্যকরী ও প্রয়োগ উপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে। শিল্প অঞ্চলগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, রাসায়নিক বর্জ্য জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎকে কাজে লাগানো যেতে পারে। অপরদিকে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড় করার মতো অপরাধগুলোকে প্রতিহত করার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পৃথিবীতে কার্বনের পরিমাণ হ্রাস করতে হলে প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষরোপণ প্রয়োজন। সকলের সদিচ্ছা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে বসতবাড়ি, ফাঁকা জায়গা, রাস্তার দুপাশে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এতে করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি কৃষির উন্নতিতেও তা সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এর পাশাপাশি আমাদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল যাতে কোনো অবস্থাতেই বিনষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু নির্দিষ্ট এলাকাকে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পশুপাখির আবাসস্থলকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যেতে পারে।

আমাদের দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান যেমনÑ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, জাফলং, সুন্দরবনে একটি সাধারণ দৃশ্য সব সময়ই চোখে পড়ে। এই স্থানগুলোতে পর্যটকদের ব্যবহৃত খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, বর্জ্য যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। এটি কেবলমাত্র পরিবেশের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং দৃষ্টিকটুও বটে এবং এ জাতীয় কর্মকান্ডের ফলে বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। আইন করে বা এখানে ময়লা ফেলা নিষেধ জাতীয় সাইনবোর্ড লাগিয়ে এগুলো দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পর্যটকদের সচেতনতা, উন্নত মানসিকতা এবং কর্তব্যবোধ। আমরা যাতে প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর পরিবেশ নষ্ট না করি, সেজন্য ব্যক্তিপর্যায়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা জনসংখ্যা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির ফলে এই স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পর্যটকের সমাগম ঘটে; এর চাপ পড়ে স্থানগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর। এ ধরনের সমস্যা দূর করতে হলে একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি পর্যটক সমাগম যাতে না ঘটে, সে রকম পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। প্রকৃতিরও বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে; আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি প্রকৃতিকে বিশ্রাম দেওয়া হলে সে নতুনরূপে আমাদের মোহিত করতে জানে। তাই বছরের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোকে বিশ্রামের সুযোগ করে দিতে হবে। এ সময়ে সেখানে যাতে জনসমাগম না ঘটে এবং স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মাধ্যমেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

পরিবেশ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। পরিবেশের ওপর অত্যধিক নির্যাতন চালালে, তা আমাদেরই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর দরুন প্রকৃতিতে এমন ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হবে, যার ফলে পুরো মানবসভ্যতাকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হতে পারে। সুতরাং সময় থাকতেই আমাদের পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হতে হবে এবং শুধু সচেতন হলেই চলবে না, সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ পৃথিবী বিনির্মাণে সক্ষম হব।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

"