মতামত

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে

রেজাউল ইসলাম রেজা

প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খড়া ও নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। আর দেশের সব পর্যায়ের কৃষকরাই এই ক্ষয়-ক্ষতির মূল ভুক্তভোগী। চার মাস ধরে করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত জনজীবন। অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে সীমিত পরিসরে লকডাউন ব্যবস্থাকে শিথিল করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি করোনার কারণে দেশে খাদ্য সংকট যাতে দেখা না দেয়, সেজন্য সরকার যথেষ্ট সচেতন। আর এই খাদ্য সংকট দূরীকরণে কৃষির বিকল্প নেই। এজন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগও হাতে নিয়েছে সরকার। প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।

দেশের যেকোনো সংকটে কৃষিই শেষ ভরসা হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্রামে মানুষের মুখে মুখে একটা কথা প্রায়ই লক্ষ করা যায়, ‘পেট ঠিক তো সব ঠিক’। আসলেই তাই, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে আর বাধা থাকে না। করোনার কারণে লকডাউন থাকায়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রান্তিক কৃষক। গণপরিবহন, রেল যোগাযোগ, নৌপরিবহন বন্ধ থাকায় কৃষিজাত পণ্যের ক্ষতি হয়েছে। পরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কৃষকদের ফসল বিনষ্ট হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় মাছ চাষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। করোনা যেতে না যেতেই চলে এসেছে আগাম বন্যা। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাইয়ের শেষ নাগাদ বন্যার পানি আসার কথা থাকলেও, এ বছর আরো আগেই পানিবন্দি হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের খামার। আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেক দুর্যোগ। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ইতোমধ্যে অধিকাংশ কৃষক আমন ধানের বীজতলা তৈরি করেছে, পাটের কিছু অংশ কাটতে পেরেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্যার পানি জমে থাকায়, বীজতলা নষ্ট হয়েছে, পচে গিয়েছে পাট। উঁচু জায়গার অভাবে গবাদি পশু রাখার সংকট দেখা দিয়েছে। একের পর এক দুর্ভোগে কৃষকরা দিশাহারা। সরকার থেকে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার থাকলেও বস্তুতপক্ষে দেশের প্রান্তিক কৃষকসমাজ কমই লাভবান হয়। গ্রাম্যপর্যায়ে কৃষকদের জন্য সার, বীজসহ নানা রকম কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হলেও, আদতে যারা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষি, যারা এসব প্রণোদনা পাওয়ার দাবিদার, তারা দিনের পর দিন বঞ্চিত হন। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নেতৃত্বের অভাব, কৃষিসম্পৃক্ত বিষয়ে অজ্ঞতা, উচ্চমূল্যে ঋণ, ফসলি জমি কম থাকাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষকদের ভোগান্তি লেগেই রয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু দেশের উন্নতি কৃষির বিকল্প নেই। জাতির খাদ্য চাহিদা মেটাতে, অপুষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা অসামান্য। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন করেছে, কেবল কৃষিব্যবস্থার উন্নতির ফলে। কিন্তু করোনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির এখন বেহাল। নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। আমাদের কৃষকরা ধানের মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য পান না, কম দামে বিক্রি করে তারা ঋণ পরিশোধ করেন। মিলমালিকরা মধ্য থেকে লাভবান হোন। শাকসবজির সময়ে পরিবহন সমস্যার কারণে কম দামে বিক্রি করতে হয়। কৃষকদের সমস্যাগুলো তুলে ধরার কেউ নেই। তাদের বড় বড় সংগঠন নেই। নেই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। করোনার সময়েও সবাই ঘরবন্দি থাকলেও, কৃষকের সে সাহস নেই। তাকে যে দুমুঠো খেতে হবে। ফসল ফলাতে হবে। ফসল মাঠে রাখলে বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিনষ্ট হবে। সত্যিকার অর্থে দেশের প্রকৃত যোদ্ধা এরাই, যাদের পরিশ্রমের জন্যই আমরা পেট ভরে খেতে পাই। দেশের সিংহভাগ কৃষক মূলধন সংকটে। কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও নতুন জাত সংযুক্ত হওয়ায়, মূলধন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক মিলমালিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে থেকে বিভিন্ন শর্তে ঋণ নিচ্ছে। ফলে সরকার কর্তৃক দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তাদের শর্তের মারপ্যাঁচে পরে বাধ্য হয়ে কমমূল্যে ফসল বিক্রি করতে হয়েছে। করোনার সময়ে সব পর্যায়ের চাকরিজীবী বেতন, বোনাস পেলেও, কৃষক কিছুই পাচ্ছে না। বরং তাকে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ফসল ফলাতে হয়।

মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাই কৃষক ও সরকারের সঙ্গে নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে থাকে। কৃষি ও মাঠ ফসল-সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা ও সমাধানে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন গড়তে মাঠপর্যায়ে কৃষি প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সত্যিকার অর্থে এতে কৃষক লাভবান হলেও, কৃষকদের ব্যক্তিগত দক্ষতা কমই বৃদ্ধি পায়। বরং কিছু সুবিধাবাদী এই উদ্যোগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। কৃষকদের উপকরণ হস্তান্তরের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা না করে, কীভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীদার করা যায়, সেদিকে সরকারসহ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সচেতন হতে হবে। টেকসই ও গতিশীল কৃষক সংগঠন তৈরি করতে হলে, মাঠকর্মীদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের একত্র করতে হলে, তাদের দিয়ে সংগঠন করতে চাইলে, একই সমস্যাভুক্ত কৃষকদের আগে শনাক্ত করতে হয়। তারপর তাদের মাধ্যমেই সমস্যা চিহ্নিত ও মাঠকর্মীদের সহযোগিতায় সমাধান করা হয়। এজন্য পিআরএ অর্থাৎ পার্টিসিপেটরি রুরাল অ্যাপরাইজাল মডেল শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ সমীক্ষা সমশ্রেণির কৃষক চিহ্নিতকরণ, সমস্যা নিরুপণ ও সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।

একটার পর একটা দুর্যোগকবলিত হয়ে সীমাহীন কষ্টে জর্জরিত থেকে দিনযাপন করছে তারা। সাধারণত প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারিপর্যায়ের কৃষকরা শুধু কৃষিকাজ করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের আর কোনো আয়ের উৎস নেই। দুর্যোগের কবল থেকে ফসল রক্ষা তো দূরে থাক, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি হারিয়ে রাত্রিযাপনই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা দেশের চালিকাশক্তি। এদের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের ফলেই দেশ আজ উন্নতির পথে এগোচ্ছে। তবু কষ্টার্জিত ফসল চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে। অবহেলা ও নানা বঞ্চনার স্বীকার হয়েও দেশের সব ক্রান্তিকালে কৃষকরাই হয়েছেন শেষ ভরসা। কৃষি খাতে ভর্তুকি ও বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো, স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়া হলেও, কৃষকরা এর থেকে কতটুকু লাভবান হবেন, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। আগের মতো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌড়ঝাঁপ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তাও ভাবার বিষয়। শতবর্ষীয় ডেল্টাপ্ল্যান বাস্তবায়নে কৃষকদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষকরা দেশের অন্নদাতা। এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় করে, পরিকল্পিত রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির পথকে আরো বেগবান করতে এসব সমস্যাই অন্তরায় হিসেবে পরিলক্ষিত হবে।

লেখক : কলামিস্ট

কৃষি অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

"