reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৯ জুলাই, ২০২১

করোনাকালে খেটে খাওয়া মানুষ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

বর্তমান বিশ্বে করোনা মহামারি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটেছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গত বছর থেকে কয়েক দফায় লকডাউন জারি করেছে। সম্প্রতি করোনা সংক্রমণের হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সর্বাত্মক জারি করেছে কঠোর লকডাউন। এ পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে খেটে খাওয়া মানুষ। বিশেষ করে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, ফুটপাতে ছোটখাটো ব্যবসায়ী চরম অসহায় অবস্থায় দিন পার করছে। অনেকে আবার জীবন বাঁচাতে কাজের সন্ধানে রাস্তায় বের হয়ে হচ্ছেন জরিমানার সম্মুখীন। খেটে খাওয়া মানুষ নিয়ে আমাদের দেশের সচেতন শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন? এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল মিয়া

‘লকডাউনে খেটে খাওয়া মানুষের নীরব কান্না’

লকডাউনের কথা শুনলেই খেটে খাওয়া মানুষের চোখে মুখে হতাশার ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। দেশে করোনা নাজেহাল অবস্থা। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার। সরকার বাধ্য হয়ে এমন পরিস্থিতিতে লকডাউন দিচ্ছে। এদিকে খেটে খাওয়া মানুষের পরিবারে পেটে খরা। আমাদের দেশে দরিদ্রতার হার ৪২ শতাংশ। এ দেশের একটি বড় অংশ দিন আনে দিন খায়। লকডাউনে এই পরিবারগুলো কী করবে? এ দেশে হাজারো পরিবার চলে রিকশা চালিয়ে, হোটেলে কাজ করে, অন্যের জমিতে কাজ করে, রাজমিস্ত্রির কাজ করে, দোকানের কর্মচারী হিসেবে, চা বিক্রি করে, ফল বিক্রি করে, হকারি করে। রিকশা চালিয়ে দিন আনে দিন খাওয়া পরিবারগুলো লকডাউনে অনাহারে কাটে। কেউ খোঁজ নিতেও আসে না। তাদের পরিবারের সদস্যরা কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে? যেদিন আয় বেশি হয়, সেদিন তারা পেট পুরে খেতে পারে। যেদিন আয় নেই, সেদিন পেটে ভাত নেই। কিন্তু এই দীর্ঘ লকডাউনে কী করবে? ত্রাণ একবার পাইলে তো আর সাত দিন অনাহারে কাটতে হয়। সাত দিন যদি মার্কেটে সেল দিতে না পারে, সাত দিনের বেতন কাটা যাবে। এ দেশে এ রকম হাজারো উদাহরণ রয়েছে। আমরা তাদের দেখেও দেখি না। ঝালমুড়ি, ফুসকা বিক্রি করে যার দিন চলে, তার কী অবস্থা? লকডাউনে তাদের কেউ কাজের জন্যও ডাকে না। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা খুবই করুণ।

 

মো. সজল হোসেন

শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‘সম্মিলিত উদ্যোগে দুর্ভোগ কমবে’

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া। এই লকডাউনে তাদের উপার্জন বন্ধ থাকার কারণে বেশির ভাগ সময়েই না খেয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। তাই তারা পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য কঠোর লকডাউনের মধ্যে বাধ্য হয়েই কাজের খোঁজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে বের হচ্ছেন। কিন্তু তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। তাই তাদের সুস্বাস্থ্য এবং আর্থিক সাহায্য নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। করোনার শুরুতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য অনেক সহায়তা এলেও তা ছিল অপ্রতুল। আগে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই নিজ নিজ উদ্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালেও এমন চিত্র এখন আর দেখা যাচ্ছে না। কারণ করোনার জন্য অনেকেরই আয় নিম্নমুখী। প্রশাসন থেকে ৩৩৩ নম্বরে সাহায্যের জন্য কল দেওয়ার কথা বলা হলেও এই সাহায্য অনেকেই পাচ্ছেন না সঠিক তথ্য না জানার কারণে। তাই সরকার ও প্রশাসনের উচিত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং এসব সাহায্যের অংশ যেন দুর্নীতিবাজদের কবলে না পড়ে তার তদারকি করা। সমাজের বিত্তবান এবং সেবামূলক সংগঠনের উচিত অসহায় মানুষদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি ও প্রশাসনিক সহায়তা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সবার নিজ নিজ উদ্যোগে তার আশপাশের মানুষকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা। এ ক্ষেত্রে যুবসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তারা অসহায় মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে পারে। তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। যাতে লকডাউনে খেটে খাওয়া মানুষের উপার্জনের জন্য আর বাইরে বের হতে না হয়। এভাবে সবাই মিলে ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে খেটে খাওয়া অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে তাদের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব হবে।

 

রাইসা বিনতে করিম

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‘খেটে খাওয়া মানুষের খাবার নিশ্চিত হোক’

দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যথাসময়ে লকডাউন দেওয়া নিশ্চয়ই সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ সফলভাবে তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন সরকার ও জনগণের সক্রিয় প্রচেষ্টা থাকবে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, সরকারের যথেষ্ট সক্রিয়তা থাকলেও জনগণের সক্রিয়তা তেমন নেই বললেই চলে। এখন আমাদের বিবেচনা করতে হবে জনগণের সক্রিয়তা না থাকার কারণ কী? অবশ্যই এ ক্ষেত্রে খাদ্য চাহিদা বিবেচ্য বিষয়। কেননা অধিকাংশ খেটে খাওয়া মানুষ লকডাউনের জন্য কর্মহারা। যার ফলে উপার্জনক্ষম অভিভাবক যখন কর্মহারা, তখন ওই পরিবারের অবস্থা যে কী হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতএব খাদ্যের সন্ধানে লকডাউন অমান্য করতে বাধ্য। এখন সরকারের উচিত খাদ্য নিশ্চিত করা। বিত্তশালী ব্যক্তিরা এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি ঘরে খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যের নিশ্চিত বাস্তবায়নে কমিটি গঠন করতে হবে প্রতিটি জেলায়, উপজেলায় এবং প্রতিটি গ্রামে। স্বচ্ছ জবাবদিহি এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। তাছাড়া খেটে খাওয়া মানুষের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। কেননা অধিকাংশ মানুষ তার কর্মসংস্থান নিশ্চয়তায় সন্দিহান। এই সন্দিহানও একটা কারণ হতে পারে লকডাউন অমান্য করার। সরকারের উচিত খেটে খাওয়া মানুদেষর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া। যাতে কোনো কাটছাঁট করা না হয়। সরকার কর্তৃক খাদ্যের পর্যাপ্ত বাজেট থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তবায়ন তেমনভাবে সম্ভব হয় না। অতএব, এই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আমরা চাই সুখী সমৃদ্ধ একটি সোনার বাংলাদেশ হোক, ফিরে আসুক সেই সোনালি দিনের হাসি। আমরা সবাই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করব।

এ হোক প্রত্যাশা।

শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল

শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

‘সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে’

দীর্ঘ লকডাউনে সংকটে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। করোনাকালে এমনিতেই মানুষের আয় কমে গেছে। কাজের সুযোগ কমে গেছে। চলাচলে বাধা নিষেধ আরোপ করায় চরম সংকটে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে দিনমজুর, রিকশাচালক, হোটেল কর্মচারীর মতো অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষজনকে। তাদের সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা, খাবার সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে; যেন খেটে খাওয়া মানুষের খাদ্যাভাবে না থাকে। খাদ্য সংকট এবং যেকোনো প্রয়োজনে ৩৩৩ নম্বরে কল দেওয়ার কথা বলে হয়েছে। অথচ দরিদ্র, গ্রামের প্রান্তিক জনগণ এ ব্যাপারে অবগত নন। এ সেবার ব্যাপারে অবগত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া খেটে খাওয়া এই মানষের অধিকাংশই স্বাস্থ্য এবং করোনা সম্পর্কে অসচেতন। তাদের স্বাস্থ্য এবং সেবার ব্যাপারে সচেতন করতে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে। জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। সর্বস্তরে সেবা পৌঁছে দিতে প্রান্তিক পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তি, মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক এবং বিত্তবানদের দ্বারা গৃহীত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অনেকাংশে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট লাঘব হবে। পাশাপাশি লকডাউন শিথিল হলে দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য

সরকারি প্রণোদনা এবং কর্মস্থল সৃষ্টির ব্যাপারটিও খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে গৃহীত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশা থেকে

মুক্তি দিতে পারে।

রুখসানা খাতুন ইতি

শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

‘স্বাবলম্বী হোক প্রতিটি মানুষ’

এ দেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্ন আয়ের, খেটে খাওয়া, দিনমজুর ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। যারা এক দিন আয় করতে না পারলে, তাদের জীবন সংকটে নিপতিত হয়। এই নিম্ন আয়ের মানুষের পরিস্থিতিটা সবার চোখে ধরা পড়ে না। বলতে পারেন নিম্ন আয়ের, খেটে খাওয়া, দিনমজুর ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে মাঝে মধ্যেই ত্রাণ দেওয়া হয়, অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। তাদের অবস্থা তো ভালো থাকার কথা। হ্যাঁ, তাদের কিছু কিছু মানুষ ত্রাণ পেলেও দেশের অনেক জায়গায় বহু মানুষ ন্যূনতম ত্রাণও পায়নি। আর বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের করোনা সংক্রমণ এড়াতে দেওয়া লকডাউন-শাটডাউনে তাদের বেশির ভাগেরই উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এই লকডাউন ও শাটডাউনে দিন দিন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এই নিম্ন আয়ের, খেটে খাওয়া, দিনমজুর ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সম্প্রতি এ বিষয়ে শেষ হওয়া এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে ভয়ংকর এক তথ্য- করোনার প্রভাবে দেশে আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এদের বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীই শহরের বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। অর্থাৎ বর্তমান এই লকডাউন ও শাটডাউনে এদের সবারই এখন দুরবস্থা।

তাই সরকারের উচিত, দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

হুসাইন আহমদ

শিক্ষার্থী, ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ, দারুস-সুন্নাহ মাদরাসা, টাঙ্গাইল

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close