প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
জেলা-উপজেলায় দালানকোঠা
অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ বন্ধে দায়িত্ব পাচ্ছে বিসি কমিটি

দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নগরায়ণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সংখ্যা। কিন্তু উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আওতার বাইরে দীর্ঘদিন ধরে অনেক এলাকায় যথাযথ নকশা অনুমোদন, প্রকৌশলগত যাচাই ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই বড় ভবন ও দালানকোঠা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
কোথাও অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কোথাও অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্প সহনশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে। এসব অনিয়ম ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় জেলা-উপজেলায় ভবন নির্মাণে অনিয়ম রোধ এবং পরিকল্পিত, নিরাপদ ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিতে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটিকে (বিসি কমিটি) প্রশাসনিক ক্ষমতা দিচ্ছে সরকার।
‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এর আওতায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আওতাবহির্ভূত এলাকায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত এই কমিটিকে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) বাস্তবায়ন নিশ্চিত, ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপ তদারকি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্বও পালন করবে কমিটি।
এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, ‘নিরাপদ, পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সরকার ভবন নির্মাণ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। রাজধানীর বাইরে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বহুতল ভবনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ কারিগরি তদারকির অভাব ছিল। নতুন বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটি গঠনের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন থেকে নকশা অনুমোদন, নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপের তদারকি এবং জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ নিশ্চিত করা হবে। কোথাও অনিয়ম বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা এমন একটি ভবন নির্মাণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া নয়; বরং দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও নিরাপদ, টেকসই ও পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা। নতুন ব্যবস্থায় ভবনের স্থাপত্য, কাঠামোগত নকশা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, মেকানিকেল ও প্লাম্বিং পরিকল্পনাও কারিগরি যাচাইয়ের আওতায় আসবে। প্রয়োজন হলে এসব বিষয়ে স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬, অগ্নিনিরাপত্তা আইন-২০০৩, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩সহ সংশ্লিষ্ট সব আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ এখন থেকে শুধু নকশা অনুমোদন পেলেই হবে না; নির্মাণের প্রতিটি ধাপে জাতীয় মানদণ্ড অনুসরণ হচ্ছে কি না, তাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন ব্যবস্থায় বিসি কমিটিকে প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত নকশা অমান্য করে ভবন নির্মাণ করা হলে বিসি কমিটি নির্মাণকাজ তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করতে পারবে। প্রয়োজনে অনুমোদন বাতিল, অবৈধ অংশ অপসারণের নির্দেশ এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগও নেওয়া যাবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নকশা লঙ্ঘন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ ও অন্যান্য অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। নতুন এ ব্যবস্থায় ভবন মালিকদের নির্মাণ শুরুর আগে অনুমোদিত নকশা নিতে হবে। নির্মাণকাজে সেই নকশা অনুসরণ করতে হবে এবং কাজ শেষে নিয়ম অনুযায়ী অকুপেন্সি সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে। এতে করে ভবন নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াই আরো জবাবদিহিমূলক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ের বিসি কমিটি সাততলা পর্যন্ত ভবনের নকশা অনুমোদন করবে। এর বেশি উচ্চতার ভবনের অনুমোদনের দায়িত্ব থাকবে জেলা পর্যায়ের কমিটির ওপর। বড় ও জটিল প্রকল্প অধিকতর কারিগরি মূল্যায়নের আওতায় আনতেই এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি কমিটিকে প্রতি মাসে অন্তত একটি সভা করতে হবে। সভায় স্থপতি, প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের মতামতও নেওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর বাইরে ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সমন্বিত তদারকির অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয়ভাবে নকশা অনুমোদনের পর নির্মাণকাজের তদারকি করা হতো না। ফলে নকশা পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা সময়মতো ধরা পড়ত না। নিয়মিত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নতুন কমিটি এই দুর্বলতা অনেকাংশে দূর করতে পারবে।
তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ, পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা। স্থানীয় প্রভাব বা প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনিয়মকারীরা ছাড় পেলে নতুন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা কমিটির কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় রাখার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে ২০২৩ সালের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন কার্যকর করেছে। এর মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, পরিকল্পনাহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ আর সহ্য করা হবে না। জননিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি ভবন নির্মাণে গুণগত মান বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল মতিন বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য শুধু ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া নয়, বরং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নিরাপদ, টেকসই ও মানসম্মত ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা। রাজধানীর বাইরে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বহুতল ভবনের সংখ্যা বাড়ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কারিগরি মান, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত বিষয় এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে এই নতুন কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একইসঙ্গে অনিয়ম ও নকশা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিকল্পিত নগরায়ণকে এগিয়ে নিতে চাই।’
"








































