মিজান রহমান

  ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

বিলুপ্তপ্রায় ফল ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ

পুষ্টির চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রত্যেক মানুষের কিছু ফল খাওয়া প্রয়োজন। পুষ্টিবিদরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে দৈনিক ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়ার সুপারিশ করেছেন। ফল হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরে প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থের জোগান দেয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু ফল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। আমাদের দেশে দুই ধরনের ফল রয়েছে। একটি প্রচলিত, অন্যটি অপ্রচলিত। পুষ্টি ও ঔষধি গুণের দিক থেকে অপ্রচলিত ফলের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাণিজ্যিক চাষাবাদ না হওয়ায় এ ফলগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। তাই অপ্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় ফল উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য একটি সম্প্রসারণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। যা বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সংশিষ্টরা জানান, প্রস্তাবিত কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে দেশের অপ্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় ফল উৎপাদন ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে হারিয়ে যাওয়া ফল আতা, শরিফা, বিলিম্বি, করমচা, গাব, বিলাতিগাব, বিচিকলা, গোলাপজাম, ডেওয়া, আঁশফল, জামরুল, বেল, কদবেল, চালতা, তিতিজাম ইত্যাদি ফল নতুন করে উৎপাদন করবে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির বাস্তবায়নকাল ১ জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

প্রস্তাবিত কর্মসূচির উদ্দেশ্য কর্মসূচি এলাকায় অপ্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় নতুন মিশ্র ফল বাগান স্থাপনের মাধ্যমে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিতসহ বিলুপ্তপ্রায় ফল গাছ সংরক্ষণ করে ভিশন ২০২১ ও এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। এর মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় ফল গাছকে রক্ষা করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ করা, অপ্রচলিত ও বিলুপ্ত ফল উৎপাদনের আওতায় আনয়ন ও আয়ের উৎস সৃষ্টি করা, মিশ্র ফলবাগান সৃজন ও ব্যবস্থাপনায় কৃষকের দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, বাগান ব্যবস্থাপনায় নারী ও শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন।

কর্মসূচির যৌক্তিকতা সম্পর্কে এই কর্মসূচি পরিচালক মাসুমা জান্নাত প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, যেসব ফলের অস্তিত্ব আছে, খুজে পাওয়া যায় কিন্তু সচরাচর দেখা যায় না এবং দেশের সব এলাকায় জন্মায় না বা কোনো কোনো এলাকাতে স্বল্প পরিসরে জন্মায় তাদের বলা হয় অপ্রচলিত ফল। দেশে প্রায় ১৩০ ধরনের অপ্রচলিত ফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে প্রায় ৭০ ধরনের অপ্রচলিত ফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে এবং স্বল্প পরিসরে চাষও হয়ে থাকে। দেশের অপ্রচলিত ফলের মধ্যে প্রায় যেগুলো দেখা যায়, সফেদা, কামরাঙা, লটকন, বিলাতি আমড়া, বাতাবিলেবু, কদবেল, বেল, জলপাই, তাল, কালোজাম, করমচা, কাজুবাদাম, গোলাপজাম, আঁশফল, দেশি ও বিলাতিগাব, আতা, শরিফা, কাউফল, খেজুর ও জামরুল, আমলকী, টকলেবু, চালতা, ডুমুর, বৈচিফল, তেঁতুল, বকুল, বেতফল, ফলসা, বিলিম্বি, অড়বরই, লুকলুকি, তৈমুর, ডেউয়া, সাতকরা, পানিফল, কাগজিলেবু, মহুয়া, চাপালিশ ইত্যাদি।

তিনি বলেন, বর্তমানে নগরায়ণ এবং জঙ্গল ধ্বংস করে ফসলের খেত তৈরির ফলে এসব অপ্রচলিত ফল গাছ আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে চলেছে। বিলুপ্তির হাত থেকে এসব অপ্রচলিত ফলকে বাঁচাতে হলে এখনি চাষের আওতায় আনতে হবে। এ ফলের বাণিজ্যিক মূল্যও কম নয়। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে অপ্রচলিত ফলের চাষ বৃদ্ধি করতে পারলে আবার দেশে সর্বত্র এই ফলগুলো পাওয়া যাবে এবং সন্তানরা পাবে পুষ্টি ও ঔষধি গুণে ভরপুর এসব অপ্রচলিত ফলের স্বাদ।

এর ফলে কর্মসূচিভুক্ত এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় ফল চাষের মাধ্যমে অপ্রচলিত ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। মিশ্র ফল বাগান হওয়ায় কৃষক বাগান থেকে সারা বছর ফল সংগ্রহ করতে পারবে। কর্মসূচিভুক্ত এলাকায় বসবাসরত জনগণের পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে।

অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অপ্রচলিত ফলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এসব ফল এক রকম বিনা যতেœই যেকোনো মাটিতে ভালো জন্মে। এসব ফল গাছে সার না দিলেও চলে। ঝড়-বাতাস কিংবা বন্যা-খরা সর্বাবস্থায় এই ফল গাছগুলোর খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা অনেক বেশি। পোকামাকড় ও রোগ বালাইয়ের আক্রমণও কম হয়।

এসব দিক বিবেচনা করে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক প্রচলিত ফল চাষের পাশাপাশি অপ্রচলিত ফলচাষের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশে এক ইঞ্চি জমিও যেন পতিত না থাকে, বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে কৃষক ও কৃষিবিদদের একত্রে কাজ করতে হবে। আমরা এসব অপ্রচলিত ফল চাষ করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি। পুষ্টি নিরাপত্তা, দারিদ্র্যবিমোচন, পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে অপ্রচলিত ফলের অবদান অনেক বেশি। আসুন অপ্রচলিত ফলের চাষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখি।’

এই প্রকল্পটি ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার ১৫টি উপজেলা এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এই ১৫টি উপজেলায় আতা, শরিফা, বিলিম্বি, অড়বরই, করমচা, গাব, বিলাতিগাব, জামরুল, বেল, কদবেল, চালতা ইত্যাদি ফল গাছের সমন্বয়ে মিশ্র ফল বাগান ও বসতবাড়িতে ফলবাগান সৃজন করা হবে। কর্মসূচির ৩ বছর মেয়াদকালে ৩৩ শতাংশ জমিতে ৫৫০টি মিশ্র ফল বাগান সৃজন করা হবে এবং উন্নত পরিচর্যার মাধ্যমে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে। প্রথম বছর ফল বাগানের জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি, ২য় বছর ৩০২টি এবং ৩য় বছর ২৪৮টি প্রদর্শনী স্থাপনের পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পতিত জমিকে ফল চাষের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি বাগান তথা প্রদর্শনীতে ৫০টি চারা/কলম, প্রয়োজনীয় সার, বালাই ব্যবস্থাপনা উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রয়োজনীয় জৈব সারসহ অন্যান্য উপকরণ কৃষক নিজস্ব খরচে ব্যবহার করবে।

এসব উপকরণ বিতরণ করার পাশাপাশি প্রতিটি বাগান মালিককে সার ব্যবস্থাপনা, ছাঁটাই পদ্ধতি, মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ পদ্ধতি বা মালচিং, সেচ প্রদান ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে বাগান মালিকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এভাবে বিভিন্নমুখী কর্মকান্ডের ফলে সৃজনকৃত ফল বাগানগুলোর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়