মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি আরব আমিরাত

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশটি বর্তমানে বিশ্ববাসীর সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তা নিঃসন্দেহে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই। ক্ষুদ্র, কিন্তু অত্যন্ত ধনী উপসাগরীয় এই রাজতন্ত্রটির একের পর এক রাজনৈতিক এবং সামরিক উচ্চাভিলাষ বিস্ময়ের সৃষ্টি করছে। এ বছর মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠিয়েছে এই দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিতর্কের তোয়াক্কা না করে আরবদের চিরশত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। করোনাভাইরাস সামলানো ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হচ্ছে দেশটি।

শুধু যে সংক্রমণ দ্রুত আটকেছে তা-ই নয়, কারখানায় রাতারাতি উপযুক্ত যন্ত্র বসিয়ে সংক্রমণ নিরোধক পোশাক (পিপিই) তৈরি করে বিমান ভরে ভরে তা অন্য দেশে পাঠিয়েছে। সেইসঙ্গে ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব এবং সোমালিয়া ও লিবিয়ায় তুরস্কের প্রভাব খর্ব করতে ওই দেশগুলোর গৃহযুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে পিছপা হয়নি ইউএই। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সমরশক্তির সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বিশ্লেষকরা বলেছেন দেশটির অসামান্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ইরান নিয়ে ভীতি, জঙ্গি ইসলাম নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূ-রাজনৈতিক নীতির কারণেও ইউএইর মধ্যে আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার আকাক্সক্ষা বাড়ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈদেশিক নীতি যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক এবং বিশ্লেষকদের বিশেষ দৃষ্টি কাড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. নায়েল শামা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমকে তার এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, কয়েক বছর আগে পর্যন্তও ক্ষুদ্র জনসংখ্যার ছোট যে উপসাগরীয় দেশটির বিশ্ব পরিসরে বলার মতো তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না, সেই দেশটির ‘বিশাল উচ্চাভিলাষ ‘নিয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন তাদের এই উচ্চাভিলাষ? এ প্রসঙ্গে বিবিসির প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনার তার এক রিপোর্টে ২১ বছর আগের কসোভো যুদ্ধ চলার সময় তার এক অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন।

১৯৯৯ সালের মে মাস তখন। কসোভোর যুদ্ধ এক বছর গড়িয়েছে। আলবেনিয়া-কসোভো সীমান্তে একটি অস্থায়ী শরণার্থী শিবির স্থাপন করেছে আমিরাত রেড ক্রিসেন্ট। ওই শিবিরে তারাই দুবাই-আবুধাবি থেকে রান্নার লোক, হালাল মাংসের জন্য কসাই, টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার, এমনকি একজন ইমামও উড়িয়ে নিয়ে এসেছে। আমিরাতের সেনারাই ভারী অস্ত্র, সাঁজোয়া যান নিয়ে শিবির টহল দিচ্ছে। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানা থেকে আগের দিন যে হেলিকপ্টারে করে বিবিসির ওই সংবাদদাতা সীমান্তের শিবিরটিতে আসেন, তার চালক ছিলেন আমিরাতের বিমান বাহিনীর এক পাইলট। শিবিরের বাথরুমে পাশের বেসিনে লম্বা, দাড়িওয়ালা যিনি দাঁত ব্রাশ করছিলেন, তাকে সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারলাম। তিনি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ (দেশটির বর্তমান যুবরাজ)। ব্রিটিশ রয়াল মিলিটারি একাডেমির স্নাতক। তখন থেকে তিনিই তার দেশের সামরিক ভূমিকা বাড়ানোর পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

আবুধাবি থেকে কসোভোর দূরত্ব ২ হাজার মাইল। এত দূরে ছোট একটি উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের এই সামরিক উচ্চাভিলাষে বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই। ইউএই ছিল প্রথম কোনো আরব দেশে যারা নেটো বাহিনীর সমর্থনে ইউরোপে সেনা মোতায়েন করেছিল। এরপর আসে আফগানিস্তান। তালেবানের পতনের পরপরই আমিরাতি সেনারা যে নেটো বাহিনীর সঙ্গী হয়, তা অনেক দিন পর্যন্ত বাকি বিশ্ব তেমন জানতই না। আমিরাতিরা তখন আফগানিস্তানে স্কুল করে দিয়েছে, মসজিদ বানিয়েছে, খাবার পানির জন্য কুয়া খুঁড়ে দিয়েছে। আফগানিস্তানে আমিরাতের তেমন বড় কোনো সামরিক ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তারা টাকা-পয়সা এবং ধর্মকে কাজে লাগিয়ে নেটো সেনাদের প্রতি স্থানীয় মানুষজনের ক্রোধ-সন্দেহ অনেকটাই প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন ফ্রাঙ্ক গার্ডনার। মাত্র ১ কোটি মানুষের ছোট একটি দেশের মধ্যে এই সামরিক অভিলাষ দেখে সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস ইউএইর নাম দিয়েছিলেন ‘লিটল স্পার্টা‘ বা ক্ষুদ্র, কিন্তু নির্ভীক।

তারপর গত ২০ বছরে, বিশেষ করে গত এক দশকে, ইউএইর রাজনৈতিক এবং সামরিক অভিলাষের ডানা অনেকটাই বিস্তৃত হয়েছে। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক একটি ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে ওঠার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় সামরিক শক্তি হয়ে উঠেছে ইউএই। আরব বসন্তের টালমাটাল অবস্থার পরপরই ইউএই মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গায় প্রকাশ্যে মাথা গলাতে শুরু করে। এখন লোহিত সাগর অঞ্চল এবং পূর্ব আফ্রিকাতেও তাদের ভূমিকা স্পষ্ট হচ্ছে।

ড. নায়েল শামা লিখেছেন, হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ইউএই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ক্রীড়নক হয়ে উঠেছে। প্রধানত আর্থিক সুযোগ সুবিধে দিয়ে তারা কিছু দেশে ‘কিং মেকার‘ হয়েছে, অর্থাৎ তাদের পছন্দমতো সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। আবার অনেক জায়গায় ‘পিস মেকারের‘ ভূমিকা নিচ্ছে তারা। সম্প্রতি ইথিওপিয়া এবং এরিত্রিয়ার মধ্যে দুই দশকের বিরোধ ঘোচানোর পেছনে ইউএইর বড় ধরনের ভূমিকা ছিল।

একই সঙ্গে, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং বাণিজ্যিক স্বার্থে লোহিত সাগর এলাকার অর্থাৎ মিসর, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও সৌদি আরবের চারটি বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে ইউএই সরকারের দুবাই-ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। ইয়েমেন, এরিত্রিয়া এবং সোমালিল্যান্ডে ছোটখাটো সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন করেছে ইউএই। তাদের সামরিক এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার কথা এখন আর চেপে রাখতেও চাইছে না ইউএই। এক সাক্ষাৎকারে আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাস বিবিসিকে বলেন, আমরা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হতে চাই। বিশ্বে ভূমিকা রাখতে চাই। তিনি বলেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ঝুঁকি নিতে হলেও আমরা তা নেব। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, আরব এবং মুসলিম বিশ্বের বিরাট একটি অংশের রক্তচক্ষুকে পাত্তা না দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পেছনে আমিরাতের অন্যতম উদ্দেশ্য অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং গোয়েন্দা প্রযুক্তি জোগাড় করা।

কেন এই আকাক্সক্ষা? কিন্তু যেখানে তারা নিজেরাই এক ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা করছে, তারপরও ক্ষুদ্র এই রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও তাদের আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করতে শুরু করেছে? অধিকাংশ পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই উচ্চাভিলাষের পেছনে মূল তাড়না একটি- ‘রাজনৈতিক ইসলামের‘ ব্যাপারে আমিরাত শাসকদের, বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের, চরম বিরাগ এবং ভীতি। সে কারণেই ইউএই মিসরে ২০১৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোরসি সরকারের বিরুদ্ধে সেনাঅভ্যুত্থানে মদদ দিয়েছে। তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্র সরকার মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত সরকারকে মেনে নিলেও ইউএই তাদের সরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। লিবিয়ায় তারা জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে উৎখাতে মিলিশিয়া নেতা খলিফা হাফতারকে সাহায্য করছে। কাতারের বিরুদ্ধে ইউএইর প্রধান অভিযোগ যে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থিদের সাহায্য করছে। আর মূলত সে কারণেই কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধে দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গী হয়।

ড. নায়েল শামা মনে করেন, ইসলামি জঙ্গিবাদকে ইউএইর শাসকরা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে, এবং পূর্ব আফ্রিকায় তাদের সামরিক এবং রাজনৈতিক তৎপরতার প্রধান লক্ষ্যই হলো এই ইসলামি জঙ্গিবাদ দমন। পূর্ব আফ্রিকায় ইউএইর প্রধান প্রধান টার্গেট হলো বোসাও-ভিত্তিক আল ইত্তেহাদ আল-ইসলামি, এরিত্রিয়ার ইসলামিক জিহাদ মুভমেন্ট, সুদানের তাকফির ওয়াল হিজরা এবং সোমালিয়ার আল-শাবাব। তুরস্কের সঙ্গে টক্কর। এমন কি তুরস্কের এরদোয়ান সরকারের সঙ্গে টক্কর দিতে পিছপা হচ্ছে না ইউএই। এ মাসেই তারা গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে গ্রিক সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে।

ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি অনুসন্ধানের অধিকার নিয়ে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে যখন তীব্র উত্তেজনা চলছে, সেই সময়ে গ্রিসের সঙ্গে এই যৌথ সামরিক মহড়াকে তুরস্ক উসকানি হিসেবেই গণ্য করা যায়। উপসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্টিভেন্স বিবিসিকে বলেন, কোনো সন্দেহ নেই ইউএই এখন আরব বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকরী সামরিক শক্তি। তারা যেভাবে যত দ্রুত দেশের বাইরে সেনা মোতায়েন করতে পারে, সেটা অন্য কোনো আরব দেশ এখনো চিন্তাই করতে পারে না।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষকে ইউএই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে। আর সে কারণেই, ইরানবিরোধী জোটে অবস্থান নিয়েও ইউএই সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্নভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ইরানের সঙ্গে সরাসরি কোনো বিরোধে জড়াতে অনিচ্ছুক। দেশটির ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বিদেশিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে যে সুনাম তারা প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে নিজের ওপর সংঘাতের যেকোন আঁচের সম্ভাবনা নিয়েও শঙ্কিত ইউএই। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধ হলে সংঘর্ষের সম্ভাব্য কেন্দ্র হবে যে এলাকা, সেই হরমুজ প্রণালির সঙ্গেই আমিরাতের উপকূল। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এলিজাবেথ ডিকিনসন সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাকে বলেন, তাদের এলাকায় স্থিতিশীলতা রক্ষার বিষয়ে ইউএইর বিরাট স্বার্থ রয়েছে। তাদের অবকাঠামোর ওপর কোনো হুমকি তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন। অঞ্চলটির সবচেয়ে শক্ত অর্থনীতি বলে তাদের যে সুনাম, যে আস্থা, তা ধসে পড়বে।

ইউএইতে বাস করা মানুষের ৯০ শতাংশই বিদেশি। তারাই দেশটির সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ এবং দেখাশোনা করে। অনিরাপত্তার কারণে বিদেশিরা চলে যেতে শুরু করলে ইউএই অচল হয়ে পড়বে। সে কারণেই ইরানের সরাসরি সমালোচনা থেকে বিরত থাকে ইউএই। গত বছর জুনে যখন ইউএইর উপকূলের কাছে সৌদি একটি তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরণ হয়, তখনো তারা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে গলা মিলিয়ে ইরানকে দায়ী করতে রাজি হয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্র যখন পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠায়, ঠিক সেই সময়ে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে ইউএই তেহরানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়, যে পদক্ষেপ মার্কিনিরা পছন্দ করেনি। অব্যাহত যুদ্ধে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ার মতো আরব বিশ্বের একসময়ের বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর দুর্বলতায় মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে তৎপর হয়েছে ইউএই।

 

 

"