এনামুল হক বাদশা, সিংড়া (নাটোর)

  ২৬ জানুয়ারি, ২০২০

ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ বিস্মৃত, জন্মভিটা বেহাত

ভারতবর্ষে ইতিহাস রচনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণার পথিকৃৎ স্যার যদুনাথ সরকার। ইতিহাসবিদ হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হলেও নিজ পৈতৃকভিটায় তার কদর নেই। বেহাত হয়ে গেছে তাদের জমিদারবাড়ি। ওই বাড়িতে গড়ে উঠেছে ইউপি কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, সংঘ ও মাদ্রাসা। এদিকে স্যার যদুনাথ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কোনো ধারণা নেই। স্থানীয় ইতিহাস জানানোর তাগিদ থেকেও স্কুল-কলেজে পালন করা হয় না তার জন্ম-মৃত্যু দিবস। অনেক শিক্ষকই জানেন না তার নাম। ৮৭০ সালের ১০ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া উপজেলার ছাতারদীঘি ইউনিয়নের কড়চমাড়িয়া গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তিনি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজকুমার সরকার ও হরিসুন্দরী দেবীর সাত ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে যদুনাথ সরকার পঞ্চম। পাঁচ বছর বয়সে স্থানীয় সম্ভুনাথ প-িতের পাঠশালায় তার হাতেখড়ি। মাঝে এক বছর কলকাতার এক স্কুলের পড়াশোনা করলেও রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৮৮৭ সালে প্রথম শ্রেণির সরকারি বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে এন্ট্রানস পাস করেন। ১৮৮৯ সালে মেধাতালিকায় দশম স্থান অর্জন করে রাজশাহী কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণির বৃত্তিসহ এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

সমৃদ্ধ কর্মজীবনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুভাষাবিদ স্যার যদুনাথ ছিলেন প্রথম অধ্যাপক ভাইস চ্যান্সেলর। ইংরেজি অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে দিতে তিনি অবদান রেখেছিলেন। তার ২৫টি গ্রন্থের পাঁচ খ-ে রচিত ‘হিস্ট্রি অব ঔরঙ্গজেব’, ভারতবর্ষের সামরকি ইতিহাস ও শিবাজী গবেষণ ইতিহাস সচেতন সবার কাছেই পরিচিত। প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে নাইট উপাধি প্রদান করেন। ৮৮ বছর বয়সে ১৯৫৮ সালের ১৯ মে কলকাতায় প্রয়াত হন যদুনাথ সরকার।

ইতিহাসবিদ ও ইতিহাস গবেষক স্যার যদুনাথ সরকার যতটা প্রখ্যাত, পৈতৃকভিটায় তিনি ততটাই অবহেলিত। তাদের জমিদারবাড়ি ভেঙে তৈরি করা হয়েছে ছাতারদীঘি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন।

স্যার যদুনাথ সরকারের বসতভিটা রক্ষা ও মন্দিরটি সংস্কার করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রিন্ট-ইলেকট্রনিকস মিডিয়া প্রচার হলেও স্থানীয় বা সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। সরেজমিনের দেখা যায়, জমিদারবাড়ির পশ্চিম পাশে প্রায় এক একর জায়গার ওপর নির্মিত বিশাল কাচারি ঘরটি ভেঙে তৈরি করা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক ও করচ মারিয়া সবুজ সংঘ নামে একটি ক্লাব ঘর। উত্তর-পূর্ব দিকের বিশাল বাড়ি ও পোস্ট অফিস ভেঙে তৈরি হয়েছে ইউনিয়ন ভবনের অংশ ও কিছু দোকান। এছাড়া বাড়ির দক্ষিণ চত্বরের এক কোণে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে নির্মিত মন্দিরটি যতœ ও সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে। এদিকে মদিনাতুল উলুম কওমিয়া মাদ্রাসা ও করচমাড়িয়া সবুজ সংঘের নামে একদল প্রভাবশালী ভোগ দখল করছে জমিদারের ভিটা, পুকুর ও জমি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রভাবশালী নেতা মফাজ্জল হোসেন চাঁদ মাদ্রাসার নামে অবৈধভাবে এসব সম্পত্তি দখল করেছে। তিনি করচমারিয়া সবুজ সংঘ ও অত্র গ্রাম সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন পরিচালনা করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ বা মুখ খুলতে সাহস পায় না। সবুজ সংঘের সদস্যদের নিয়ে তিনি এই গ্রাম পরিচালনা করেন। তবে, মফাজ্জল হোসেন চাঁদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কোনো সম্পদ দখলের সঙ্গে জড়িত না। স্যার যদুনাথ সরকারের নামে সম্পদ আছে বলে আমার জানা নেই তবে তার পরিবারের যা সম্পদ ছিল তা সরকারি খাস ও অর্পিত সম্পত্তির খতিয়ানে রয়েছে।

কালীগঞ্জ বনমালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র দাস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই স্যার যদুনাথ সরকারের জীবনীসহ অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি, কিন্তু জমিদারবাড়িটি শত চেষ্টা করেও রক্ষা করতে পারিনি। এখন সরকারের কাছে স্যারের নিজ হাতে গড়া মন্দিরটি সংস্কারে দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলতাব হোসেন বলেন, স্যার যদুনাথের জন্ম না হলে আমরা এই ইউনিয়ন ভবনের জায়গা পেতাম না। স্যারের ম্মৃতি রক্ষায় মন্দিরটি সংস্কার করার জন্য সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

যদুনাথের জমিদারবাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, স্যার যদুনাথ সরকার সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই, তবে স্যারের স্মৃতি রক্ষায় খুব শিগগিরই মন্দিরটি সংস্কার করা হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close