বিএমইউতে গ্লোবাল ফ্যাটিলিভার দিবস উপলক্ষে র্যালি ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার
দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এমএএফএলডি

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) হেপাটোলজি বিভাগের উদ্যোগে গ্লোবাল ফ্যাটিলিভার দিবস ২০২৬ উপলক্ষে র্যালি ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এতে জানানো হয়, দ্রুত বাড়ছে দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এমএএফএলডি। আক্রান্ত রোগীসহ মানুষকে এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে বাঁচাতে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৃস্পতিবার সকালে বি ব্লকের সম্মুখ প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়া র্যালির প্রধান অতিথি হিসেবে শুভ উদ্বোধন করেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। পরে শহীদ ডা. মিল্টন হলে ‘টার্গেটেড থেরাপি ইন মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি) Targeted Therapy in Metabolic Dysfunction–Associated Fatty Liver Disease (MAFLD)’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভাপতিত্ব করেন হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ-এর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ।
এ সকল আয়োজনে জানানো হয়, বর্তমানে এমএএফএলডি (MAFLD) বিশ্বব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের অন্যতম প্রধান কারণ এবং ভবিষ্যতে সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের প্রয়োজনীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তাই রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্ক্রিনিং এবং সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার দিবস পালনের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার রোগকে “নীরব মহামারি” থেকে জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয় এবং এমএএফএলডি মোকাবিলায় বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধান অতিথি উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী তার বক্তব্যে ফ্যাটি লিভার রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি এ ধরনের বৈজ্ঞানিক উদ্যোগের মাধ্যমে চিকিৎসক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য হেপাটোলজি বিভাগকে ধন্যবাদ জানান।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন। তিনি মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি)-এর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ও জাতীয় বোঝা, রোগ নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি এবং GLP-1 receptor agonist, SGLT2 inhibitor, THR-β agonist, FGF21 analogue, FXR agonist-সহ উদীয়মান টার্গেটেড থেরাপির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন জানান, লিভার রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গবেষক ও চিকিৎসকরা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি)-এর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বা টার্গেটেড চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে স্থূলতা ও বিপাকীয় সমস্যা এমএএফএলডি-কে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং গুরুতর লিভার জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন জানান, মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এমএএফএলডি) বা বিপাকীয় কর্মহীনতা-সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভার রোগ হলো লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়ার একটি অবস্থা। এটি মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে। এটি আগে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ নামে পরিচিত ছিল। স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই এমএএফএলডি এর প্রকোপ দ্রুত বেড়ে চলেছে।
ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন জানান, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ চিকিৎসা না হলে এমএএফএলডি ধীরে ধীরে লিভারের প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং এমনকি হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (লিভার ক্যান্সার)-এ রূপ নিতে পারে। ফলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসা কৌশল এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাত্রার পরিবর্তনই ছিল এমএএফএলডি ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষকগণ উপলব্ধি করেছেন যে, এই রোগটি একাধিক জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং রোগীভেদে এর কারণ ও অগ্রগতির ধরণ ভিন্ন হতে পারে। এই উপলব্ধিই লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে, যা রোগের অগ্রগতির জন্য দায়ী নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোকে লক্ষ্য করে। এর মধ্যে রয়েছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, প্রদাহ, লিপিড বিপাকের সমস্যা, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ফাইব্রোসিস।
ডা. এলিন আরো জানান, এমএএফএলডি কোনো একক বৈশিষ্ট্যের রোগ নয়। রোগের অন্তর্নিহিত বিপাকীয় ও আণবিক কারণগুলো বোঝা গেলে রোগীভিত্তিক আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা প্রদান সম্ভব। যা লিভার রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে এবং এমএএফএলডিতে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষের জন্য নতুন আশার দ্বার উন্মোচন হবে।









































