মাথার বর্জ্য আগে দূর করতে হবে

প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১২ | আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:১৫

সম্পাদকীয়

মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ বলছে, ‘ঢাকার চার নদী মরছে বর্জ্য’। সংবাদটি ঢাকাবাসীর কাছে নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এ সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। মানুষ তা দেখছে এবং পড়ছে। এই নদী এবং খাল নিয়ে উচ্চবাচ্য কম হলো না। নদীকে বিপদমুক্ত করতে সরকারকে তার বাহিনীসহ নদীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেছে বহুবার। পরিকল্পনাও হয়েছে অনেক। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও কম হয়নি। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান এখনো হয়নি। এ কাজ করতে গিয়ে টাকার অপচয়ও হয়েছে। কিছু মানুষের উদর ভর্তি হলেও সাধারণ মানুষ তার শান্তি খুঁজে পায়নি। আসলে বর্জ্যরে কারণে নদীর এই অপমৃত্যু নয়। নদীর এই অপমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের মস্তিষ্কে যে আবর্জনা জমেছে, সেই আবর্জনা

পরিষ্কার করা না হলে আবর্জনার চাপে নদীর অপমৃত্যু ঘটবেই।

তাকে আর রক্ষা করা যাবে না। কাজটা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটা সামাজিক আন্দোলন। প্রয়োজন দেশপ্রেমিক মানুষের। চরমতম ভোগবাদী সমাজে যার সংখ্যা ক্রমেই কমছে। এখন আর দেশের কথা কেউ ভাবছেন না। সবাই যেন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সুতরাং প্রশ্ন এসেই যায়, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে! তেমন একটি মানুষের প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো গত্যন্তর নেই। ১৬১০ সালে ঢাকা রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভের পর এ অঞ্চলে নৌপথের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কিন্তু দখলের পাশাপাশি বর্জ্যরে কারণে ৪০০ বছরের বেশি সময়ের ঢাকার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু এবং টঙ্গী খালের বাঁচা-মরা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই আমরা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নদী দখলদারদের উচ্ছেদে জোরালো অভিযান পরিচালনা প্রত্যক্ষ করেছি। পাশাপাশি এসব নদীতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও মহানগরের পয়োবর্জ্য পতনের দৃশ্যাবলিও অবলোকন করেছি; যা জুতো মেরে গরু দানের মতো ঘটনাকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে একদিকে আমরা চোরকে বলছি চুরি করতে; অন্যদিকে গৃহস্থকে বলছি সজাগ থাকতে। এভাবে নদীসমূহকে বাঁচানো কতটা সম্ভব, তা নিশ্চয়ই সবার অনুমেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোসহ সারা দেশের নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে সরকারের ডেল্টাপ্ল্যান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও টঙ্গী খালের ৪০০টি পয়েন্ট দিয়ে কঠিন বর্জ্য পড়ছে পানিতে। এ ছাড়া ৩৬০টি পয়েন্ট দিয়ে পয়োবর্জ্য পড়ছে ওইসব নদীতে। আমরা মনে করি, চলমান ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন দরকার। সরকারের ভাবনায়ও তার আভাস রয়েছে। ঢাকায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। প্রতিদিন যে বর্জ্য বেরিয়ে আসে তার একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকার এ বর্জ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে জ্বালানি এবং সার তৈরির পরিকল্পনায় এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। ইতোমধ্যে তারা কিছুটা এগিয়েছেনও বটে। তবে নদীকে বাঁচাতে হলে কাজকে আরো গতিশীল করা দরকার। কেননা, নদী হচ্ছে সভ্যতার প্রতীক। সভ্যতাকে বাঁচাতে হলে নদীকেও বাঁচতে হবে। এখানে একটি কথা মনে রাখা খুবই জরুরি যে, সরকারের একার পক্ষে এ কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মানুষকেও সচেতন হওয়ার বিষয়টি সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকা এবং নদী দখল থেকে নিজেকে সরিয়ে আনলে নদীও অনেকটা স্বাচ্ছন্দবোধ করতে পারে। মনে রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, নদী না বাঁচলে সভ্যতা মারা যাবে, ঢাকাও হারাবে তার বাসযোগ্যতা।

পিডিএসও/এসএম শামীম