তাসলিমা তামান্না
ঢাকায় নজরুলের তিন প্রজন্ম

তার মতো করে আবির্ভাব আর কারও ঘটেনি বাংলা সাহিত্যে। প্রস্থানের ইতিহাসেও তিনি ব্যতিক্রম। বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্দরমহলের মানুষদের মনে-মুখে আজও সেই রেশ রয়ে গেছে। কবির বিশালতা, আভিজাত্য তারা বহন করে চলেছেন প্রজন্মান্তরে। কবির সঙ্গে ঢাকায় আসা তার পরিবারের সদস্যরা জানালেন কবির সঙ্গে ঘটে যাওয়া জীবনের অনেক অজানা ঘটনা। নজরুলের পুত্রবধূ উমা কাজী, দুই নাতনি খিলখিল ও মিষ্টি কাজী এবং মিষ্টি কাজীর দুই মেয়ে ও বাবুল কাজীর সন্তানদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে নজরুল পরিবারের অনেক কথা। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তাসলিমা তামান্না।
ফোনে যোগাযোগ করতেই উচ্ছ্বাস খিলখিল কাজীর কণ্ঠে। বিখ্যাত ব্যক্তি কিংবা পরিবারের সদস্যদের গলায় এতটা আন্তরিকতা সহজে মেলে না। অনেকটা খুশি মনে আলাপের দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেন তিনি। বনানীর ২৫ নম্বর সড়কের বাসায় গেলেও সাবলীল আন্তরিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়। বসবার ঘরে দীঘল-স্নিগ্ধ মুখখানি নিয়ে চেয়ে আছেন কবি। স্থির চোখে তার কত কথা যেন জমে আছে। তার নীরব চাহনি ছড়িয়ে আছে ঘরজুড়ে। এুক কোণে কবির সব বই গোছানো। কবির দুই নাতনি এবং তার পরের প্রজন্মের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখনও মনে হলো এই মানুষগুলোর জীবন নজরুলময়। মহান এক মানুষের সান্নিধ্যের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা এখনও। নেই কোনো জড়তাও। পুরো পরিবারেই সাবলীলতার একটা আভিজাত্য রয়েছে।
খিলখিলই কথা শুরু করলেন। বললেন, সরকারিভাবে পাওয়া বনানী ১২ নম্বর রোডে তাদের বাড়িটিতে এখন সংস্কার কাজ চলছে। এ কারণে তারা তিন ভাইবোন বনানীর তিনটি বাড়িতে আলাদা থাকছেন। মা উমা কাজী ভাই বাবুল কাজীর কাছে থাকেন। নজরুল ইসলামের পরিবার আর তার স্মৃতি নিয়ে আলাপ হবে জানাতেই মেয়ের বাসায় হাজির তিনি। নজরুল সান্নিধ্যে জীবনের অনেকটা সময় কাটানো পুত্রবধূ উমা কাজী বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে এসেছেন। তারপরও নজরুলের সঙ্গে প্রথম দেখার প্রসঙ্গ উঠতেই চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি জানালেন, ১৯৫২ সালের কোনো এক সময় কবিকে দেখাশোনার জন্য নার্স চেয়ে কলকাতার এক কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। খবরটা তিনি পান তার বন্ধু হাসি দত্তের কাছ থেকে। উমা তখন কলকাতার ডাবলিন হাসপাতালের নার্স। শিশু ও শল্য বিভাগে দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞ। কবির বাড়িতে আসতেই কবিপত্নী প্রমীলা তাকে বলেছিলেন, ও তো শিশুর মতো। পারবে তো ওকে সামলাতে? উমা প্রথমবার সেদিনই দেখলেন কবিকে। একটা বিছানার ওপর বসে বসে কবি কাগজ ছিঁড়ছিলেন। প্রথম দেখেই উমা রাজি হয়ে গেলেন কবির দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিতে।
সেই শুরু, এরপর সেবা অব্যাহত রেখেছেন কবির মৃত্যু পর্যন্ত। মাঝেমধ্যে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন বয়সের কারণে। বড় মেয়ে খিলখিল ফাঁকে ফাঁকে যোগ করছিলেন নানা তথ্য। উমা জানালেন, তার ডিউটি ছিল সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। সকাল ১০টা থেকে ১১টার দিকে কবিকে বারান্দায় মাদুর পেতে বসিয়ে দেওয়া হতো। খেতেন কম, কিন্তু নির্দিষ্ট। নাশতায় থাকত দুধ-রুটি, দুধ-চিড়া, দুধ-পাউরুটি বা পায়েস। সঙ্গে ছানার সন্দেশ। খিলখিলও যোগ করলেন, দাদু মোগলাই পরোটা খুব পছন্দ করতেন। সকালের নাস্তায় পরোটা আর ডিম পোচ থাকতেই হবে। সেই সঙ্গে রসগোল্লা আর ছানার মিষ্টি তার ভীষণ পছন্দের ছিল।বিরতি দিয়ে উমা জানালেন, দুপুরে কবিকে গোসল করাতে হতো চন্দন সাবানে। কবি কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু জ্ঞান ছিল পুরোপুরি। কখনও গেঞ্জি উল্টো করে পরালে নিজেই ঠিক করে নিতেন। মাঝেমধ্যে পা টিপে দেওয়া, অলিভ অয়েল মাখিয়ে দেওয়া, চুল আঁচড়ে দিতেন উমা। কবি মাঝে মাঝে একা একাই হাসতেন। কখনওবা কাঁদতেন। উমা বললেন, এভাবেই আস্তে আস্তে কবি আমার ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন। একবার আমি রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার পর কবি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আরেকবার ঢাকায় আসার পর আমি কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফেরার পর দেখি বাবা মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছেন। কোনো কথাই বলছেন না। অনেক বুঝিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে তার মান ভাঙিয়েছিলাম সেদিন। বাবা গাড়ি চড়ে ঘুরতেও ভালোবাসতেন খুব।
খেই হারালেও আবার কথার নাগাল ধরেন উমা কাজী। জানালেন, তখন কবির বাড়িতে এসেছেন অনেকেই। ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা, জুলফিকার আলী ভুট্টো, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, ধীরেন বসু, আঙ্গুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, খান মুহম্মদ মইনুদ্দীন, জুলফিকর হায়দার, কবি জসীমউদদীন।
খিলখিলের কাছে জানতে চাইলাম কবি পরিবারের ঢাকা আসার ইতিহাস। তিনি জানালেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতায় গিয়েছিলেন রাজভবনে একটি সভায় যোগ দিতে। সেখানে একদিন তিনি খিলখিলের বাবা সব্যসাচীকে ডেকে বললেন, কবির পরবর্তী জন্মদিন আমরা কবিসহ তোমাদের পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশে উদযাপন করতে চাই। বাবা মত দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল। নকশালরা দাদুকে বাংলাদেশে যেতে বাধা দিচ্ছিল। এদিকে বঙ্গবন্ধু সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, আমি কবিকে দেশে নিয়ে যেতে চাই। এর জন্য যদি আমাকে আরেকটা যুদ্ধ করতে হয়, আমি তাই করব। এরপর তিনি একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেন। যার মধ্যে মোস্তফা জব্বার বলে একজন ছিলেন, যিনি আমাদের সবাইকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন।
এভাবেই কবি এবং তার দুই ছেলে সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ কাজী তাদের পরিবারসহ ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার আগে ১৯৬২ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কলকাতার সিআইটি রোডের ক্রিস্টোফার বিল্ডিংয়ে থাকত কবি পরিবার।
খিলখিল কাজী আরও জানান, যদিও ছোট ছিলাম, তবু মনে আছে, প্লেন থেকে যখন আমরা পুরাতন এয়ারপোর্টে নামব তখন দেখি হাজারো মানুষের মাথা। প্লেন থেকে দাদুকে নামানোই যাচ্ছিল না। বাবা তখন বেরিয়ে এসে জনতাকে বললেন, আপনারা শান্ত হন। কবি অসুস্থ হয়ে যাবেন। উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম নানা স্লোগানÑজয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় নজরুল। ছোট হলেও তখন বুঝতে পারলাম দাদুকে মানুষ কতটা সম্মান করে, কতটা ভালোবাসে আর তিনি কত বড় মাপের কবি। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে সমানে আমাদের গাড়ির ওপর ফুলের পাপাড়ি ছুড়ছিল। সেই বয়সে সে যে কী দারুণ অনুভূতি জেগেছিল মনে, বলে বোঝাতে পারব না।
কবি পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত ধানম-ির বাড়িতে এসে আরও মুগ্ধ হন খিলখিল। তার চোখে আজও রয়েছে সেদিনের মুগ্ধতার আঁচ। বলতে থাকেন খিলখিলÑদোতলা বাড়ি, মাঝখানে এত সুন্দর ফুলের বাগান, লন এসব ছিল দাদুর স্বপ্নের বাড়ির মতো। এই বাড়িটাই বর্তমানের নজরুল ইনস্টিটিউট। সে সময় বঙ্গবন্ধু প্রায় আমাদের বাড়ি আসতেন। আমাদের খোঁজখবর নিতেন, মাকে ডেকে জানতে চাইতেন সব কিছু ঠিক আছে কি না।
কথার মাঝে ডোরবেল বেজে উঠল। খিলখিলের ছোট বোন মিষ্টি কাজী এসে যোগ দিলেন আড্ডায়। তাদের দু’জনেরই নজরুলের জন্মদিনের সময়গুলো বেশ মনে পড়ে। খিলখিল বললেন, জন্মদিন এলে দাদু ভীষণ খুশি হয়ে উঠতেন। ’৬৮ বা ’৬৯ সালের কথা। কলকাতায় আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটে সব আত্মীয়-স্বজনে ভরে যেত। ঈদ এলে যেমন আনন্দ হয় আমাদের কাছে দিনটি তেমন ছিল। দাদুর সঙ্গে সঙ্গে সে সময় আমাদের জন্যও নতুন জামা, জুতা কেনা হতো। জন্মদিনে কলকাতা সিটি করপোরেশন থেকে আমাদের বাড়িটা সাজানো হতো। আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা এসে ফুল দিয়ে, নকশা করে ঘর থেকে মঞ্চ পর্যন্ত সাজাত।
খিলখিলের কথায় হারিয়ে যেতে হয়। তন্ময় হয়ে শুনতে হয় তাকে। তিনি বলে চলেন, পৌর মেয়র থেকে শুরু করে সমাজের উঁচু স্তরের সম্মানিত ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব সবাই আসতেন দাদুর জন্মদিনে। মা দাদুকে সাজিয়ে মঞ্চে বসাতেন। গদি পাতা থাকত, আর মঞ্চ ফুলে ফুলে সাজানো থাকত। হারমোনিয়াম থাকত। আমরা ছোটরা গান গাইতে শুরু করতাম। দাদু কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু তার যে আনন্দের অভিব্যক্তি আর হাসি তা আমি আজও ভুলতে পারি না। ওই সময় একটা ছোট মেয়ে একবার দাদুকে মালা পরাতে পারছিল না। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, গানের মধ্যেই দাদু হাত দিয়ে মালাটা নিজের গলায় পরে নিয়েছিলেন।
কিছুটা সুযোগ পেয়ে মিষ্টি কাজীও যোগ দিলেন স্মৃতিচারণায়। বললেন, ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি আমি দেখতে অনেকটা আমার দাদি প্রমীলা ইসলামের মতো। এ কারণে যারা বাসায় আসতেন তারাই আমাকে দেখতে চাইতেন। সময়টা ’৭৩ সালে হবে। দাদু কী করে দেখার জন্য সবাই মিলে আমাকে সাজাল। দাদি যেভাবে সাজতেন সেভাবে আমাকে লাল পাড়ের শাড়ি পরানো হলো, হাতে চুড়ি। দাদুর অক্সিজেন সিলিন্ডার এক পাশে ছিল, মা আরেক পাশে বসা ছিলেন, অনেক সংবাদকর্মীও ছিলেন। তাদের মধ্যে আমাকে দাদুর সামনে আনা হলো। আমাকে দেখে দাদু হাত ধরে তার পাশে বসালেন। তারপর কেঁদে ফেললেন। এরপরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
পরিবেশ কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠলে প্রসঙ্গ পাল্টাতে হলো। নজরুলের বড় ছেলে সব্যসাচীর প্রসঙ্গ এলো। স্বামীর প্রসঙ্গ উঠতেই নীরবতা ভাঙলেন উমা কাজী। মৃদু কণ্ঠে জানালেন, বিয়ের প্রস্তাবটা এসেছিল সব্যসাচীর কাছ থেকেই। নজরুলের প্রতি উমার মমতা, ভালোবাসাই মূলত সব্যসাচীকে আকৃষ্ট করেছিল উমার প্রতি। আবার উমারও যে সব্যসাচীকে পছন্দ ছিল না তা নয়। তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর উমার পরিবার তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছিল হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে হওয়ায়। এ নিয়ে কষ্ট পেলেও পরবর্তীতে স্বামীর ভালোবাসায় অনেকটাই মিলিয়েছে সেই বেদনা। একসময় অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতেন সব্যসাচী। পরে হয়ে ওঠেন অবিসংবাদিত আবৃত্তিকার। উমার অনুরোধেই বিদ্রোহী কবিতাটি সব্যসাচী প্রথম আবৃত্তি করেন ১৯৬৬ সালে। প্রথমবারেই তুমুল জনপ্রিয়তা পায় কবিতাটি। যার রেশ আজও কাটেনি।
বাবা সব্যসাচীকে নিয়ে একদিকে যেমন তার সন্তানদের গর্বের সীমা নেই, তেমনি আছে কিছু আক্ষেপ, অভিমানও। খিলখিল বললেন, দুই দেশের কোথাও কাজী সব্যসাচীকে নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। আমি গত ২ মার্চ আমার বাবার স্মৃতির উদ্দেশে সম্পূর্ণ পারিবারিক উদ্যোগে কাজী সব্যসাচী স্মৃতি পুরস্কার ফলক উদ্বোধন করি। দুই দেশের যারাই কণ্ঠস্বর নিয়ে কাজ করেন তাদের জন্যই এ পুরস্কার ঘোষণা করেছি। এবার দুই বাংলার দুই শিল্পীকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এটা আমরা অব্যাহত রাখব।
সব্যসাচীর ছোট মেয়ে মিষ্টি বললেন, আমি আবৃত্তি করি। কিছুটা হলেও বাবার স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করি। তাকে আমরা বাবা হিসেবেই জানতাম। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন বড় হলাম তখন বুঝতে শুরু করলাম কাজী সব্যসাচী কত বড় একজন মাানুষ ছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য খুব অল্পদিনই আমরা তাকে পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়, বিদ্রোহী কবিতাটা দাদু লিখেছিলেন শুধু আমার বাবার গলার জন্য।
তাদের দাদু যে বাংলাদেশের জাতীয় কবি এ নিয়ে দুই নাতনির গর্বের শেষ নেই। তবে সেই সঙ্গে আছে কষ্টগাথাও। খিলখিল বললেন, বাংলাদেশের জাতীয় কবি তিনি। কিন্তু আজও ক্যালেন্ডারের কোথাও তার জন্ম বা মৃত্যুদিনের উল্লেখ নেই। স্কুলে স্কুলে পালিতও হয় না জাতীয় কবির জন্মদিন। আমার মনে হয়, দাদুকে নিয়ে ঠিক যতটা কাজ হওয়া উচিত ততটা হচ্ছে না। নজরুল ইনস্টিটিউট না হলে তো নজরুলকে সবাই চিনতই না। তার গান, কবিতা, সম্মেলন আরও হওয়া দরকার। সরকার যতটা পারছে করছে। কিন্তু বেসরকারিভাবে নজরুলকে নিয়ে আরও কাজ করা দরকার, যেটা এখনও হচ্ছে না। এত টিভি চ্যানেল, অথচ কোনোটায় নজরুলের গান, কবিতা কিংবা নাটক প্রাধান্য পাচ্ছে না। শুধুমাত্র জন্মদিন আর মৃত্যুদিনকেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে। তিনি কত নাটক লিখেছেন। কিন্তু গুটিকয়েক নাটকের কথাই সবাই জানে। অথচ আমাদের যেকোনো সঙ্কট হোক, মানবিক, দেশের কিংবা মানসিক সবকিছুতেই কিন্তু আমরা নজরুলকে পাই। আক্ষেপের সঙ্গে খিলখিল বললেন, নজরুল যা দিয়ে গেছেন বাংলা সাহিত্যে তা কী আর কোনো কবি দিতে পেরেছেন? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাকে আশীর্বাদ করে বলেছেন, তুমি আমার চেয়ে বড় কবি। কী দুর্ভাগ্য কবিগুরুও জানতেন না, ’৪১ সালে তিনি মারা যাবেন আর ’৪২-এ দাদু নির্বাক হয়ে যাবেন।
খিলখিল আরও জানান, দাদুকে নিয়ে দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে কোনো কাজ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে গেছি, দেখেছি সেখানে সব কবির কথা বলা হচ্ছে কিন্তু দাদুর কথা বলা হচ্ছে না। এটা খুবই কষ্টের একটা বিষয় ছিল আমাদের জন্য।
মিষ্টি যোগ করলেন নতুন তথ্য, মমতা ব্যানার্জী সরকার গঠনের পর এখন দাদুকে নিয়ে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। যেমনÑনজরুল তীর্থ হয়েছে, রাস্তার নামকরণ হয়েছে দাদুর নামে। দাদুর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নজরুল একাডেমিরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা বিগত ৩০ বছরে সেখানে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন হয়নি।
খিলখিল কিছুটা পরিতাপের সুরে বললেন, দাদু ছিলেন সাম্যের কবি। সব সম্প্রদায়ের মানুষকে তিনি এক করে দেখেছেন। তাকে মানবতার, জাতীয়তার কবি বলা হয়, কিন্তু সেভাবে তিনি সম্মান পশ্চিমবাংলায় পাননি। যেটা বাংলাদেশে পেয়েছেন। মানুষের ঢল, ভালোবাসা আমরা ছোটবেলায় পশ্চিমবাংলায় দেখেছি, এখানেও দেখেছি। কিন্তু যত বড় হয়েছি, গবেষণা করেছি, বুঝেছি দাদুর আসল জায়গা হলো বাংলাদেশ।
নজরুলের দুই নাতনিই বললেন, দাদুর সেরা সৃষ্টি তার সঙ্গীত। কিন্তু ষাট সালের পর থেকে পশ্চিমবাংলায় তা বিকৃত হতে শুরু করে। তবে ১৯৮৫ সাল থেকে আমরা শুদ্ধ সুরে নজরুল সঙ্গীত শুনতে পারছি নজরুল ইনস্টিটিউট হওয়ার কারণে। আমরা চাই এই স্বরলিপি পশ্চিমবাংলায় পৌঁছে দেওয়া হোক। তাহলে যারা অন্তত শুদ্ধভাবে নজরুলের গান করতে চায় করতে পারবে।
নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়ার কথা টানতেই দুই বোন একসঙ্গে খুশি হয়ে উঠলেন। প্রায় সমস্বরে দুজনই বললেন, প্রতিবছর আমরা সবাই ওখানে যাই। অপূর্ব একটা গ্রাম। খিলখিল বললেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আমরা অনুরোধ করেছি যেভাবে শেক্সপিয়রের গ্রামটা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে তার স্মৃতি হিসেবে সেভাবে যেন চুরুলিয়া গ্রামটি নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়। মিষ্টি জানালেন, ওখানে ২৫ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কবির জন্মদিনের উৎসব হয়। একটা মেলাও হয় নজরুল একাডেমির উদ্যোগে। দুই বোনেরই কথা, গোটা চুরুলিয়ায় নজরুলের আরেকটি পরিবার বসবাস করে। খিলখিল বললেন, ওখানে আমার দুই চাচা, চাচাত ভাই, তাদের ছেলেমেয়েরা আছে। তারা প্রত্যেকেই নজরুলের গান, কবিতা জানে। নজরুলকে ধারণ করে নিজেদের মধ্যে।
এর মধ্যে আমাদের আড্ডায়, আলাপচারিতায় যোগ দেন নজরুল পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্যরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবিতে অধ্যয়নরত মিষ্টি কাজীর বড় মেয়ে স্নেহা জানালেন, ছেলেবেলা থেকেই তিনি জানেন নজরুলের কথা। একই কথা বললেন মিষ্টি কাজীর ছোট মেয়ে আমেনাও। তিনি পড়াশোনা করছেন কলকাতায়। দুই বোনই বললেন, তারা নজরুলকে চিনেছেন, জেনেছেন পারিবারিক আবহের কারণে। দুজনেরই কথা, আমরা গর্বিত আমাদের বড় আব্বাকে নিয়ে। বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত মহলে তাদের সবাই কিছুটা অন্যচোখে দেখে। এজন্য তারা গর্ববোধ করেন।
নজরুলের সাহিত্য, গান বা শিল্প সম্পর্কে কতটুকু জানেন বা পড়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে দুজনের মধ্যেই কিছুটা ইতস্তত ভাব ছিল। স্নেহা একসময় নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজিতে। পরে আর তেমন কিছু করা হয়নি। তবে নতুন প্রজন্মের এই প্রতিনিধিদের বক্তব্য হলো, নজরুলের গানগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হলে সুর অবিকৃত রেখে কিছু ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করে আধুনিকীকরণ করা দরকার। আর সাহিত্যগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ হলে এর পাঠক বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে তাদের ধারণা।
তাদের কথায় উঠে এল কিছু অভিযোগও। আমেনা বললেন, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। কিন্তু নজরুল তো বাংলাদেশের জাতীয় কবি, তাহলে এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি বা স্কুলে স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না কেন? তাদের মতে, এমন হলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে নজরুল পৌঁছে যেতেন। তারা দুজনেই চান আগামীতে নজরুলকে নিয়ে কাজ করতে।
খিলখিল ও মিষ্টি কাজীর দাবি, আমরা চাই কাজী নজরুল ইসলাম সবখানে থাকুন। সব জায়গায় তার গান বাজুক। নতুন প্রজন্ম চিনুক কাজী নজরুলের সৃষ্টিকে। বিশেষত দেশের ইংরেজি মাধ্যমে অনেক ছাত্র ভালো বাংলা সাহিত্য জানে না। তাদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতির জন্য নজরুলের গান, কবিতা, সাহিত্য অনুবাদ হওয়া ভীষণভাবে জরুরি।
তারা জানালেন, তাদের ভাইয়ের এক ছেলে গান করে। আর ভাইয়ের পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়ে আবাসা তো ভীষণ পছন্দ করে নজরুলের মোমের পুতুল গানের সঙ্গে নাচ করতে। পারিবারিকভাবে নজরুল নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনের কথাও বললেন তারা। কথায় কথায় অনেকটা বেলা গড়িয়েছে। গল্প, কথায়, আলাপে উঠে আসে এই পরিবারের অনেক সংগ্রামের কথা। খুঁজে পাই কাজী নজরুলের আরেক ছেলে কাজী অনিরুদ্ধর পরিবারের কথাও। জানতে পারি, কাজী অনিরুদ্ধর তিন ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী বাস করছেন কলকাতাতেই। তবে দুই পরিবারের যোগাযোগসূত্রটা কোনো এক অজানা কারণে এখন আর আগের মতো নেই।
ব্যক্তিগত জীবনে একা খিলখিল কাজী কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কাজ নিয়ে গবেষণা করেন। বাবা সব্যসাচী স্মৃতি পদকের কাজও তিনি করছেন। মিষ্টি কাজী পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কাজী নজরুল নিয়ে কাজ করছেন। তবে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা। তাদের ছোট ভাই বাবুল কাজী ব্যবসায়ী। তার তিন ছেলেমেয়ে। বোনদের মতো তিনিও সম্পৃক্ত আছেন কাজী নজরুল ইসলাম ও বাবা সব্যসাচীর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে।
বেলায় বেলায় বিদায় নেওয়ার পালা। এ সময় খিলখিল বললেন, আমাদের চাচা চলে গেলেন ’৭৪ সালে, দাদু ’৭৬-এ আর বাবা ’৭৯-তে। সত্তর দশকে আমরা পরিবারের প্রধান তিনজন পুরুষকে হারিয়েছি। তারপর কী যে কষ্টে আমাদের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ আমাদের এত সম্মান দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে এদেশে রাখার জন্য।
খিলখিল কাজীর বাসা থেকে বের হওয়ার পরও অনেকটা সময় আচ্ছন্ন ছিলাম নজরুলের মধ্যে। তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস, আন্তরিকতা, কবির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তা মনে থাকবে অনেক দিন। কানে বাজছিল খিলখিল কাজীর কথাগুলো। তিনি বলেছিলেন, কেউ কেউ নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের তুলনা নিয়ে মেতে থাকে। কিন্তু তারা জানে না দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন ছিল। রবীন্দ্রনাথ দাদুর চাইতে বয়সে অনেক বড় ছিলেন। দাদু তার কাছে পুত্রসম ছিলেন। মানুষের জয়গান দুজনই গেয়েছেন। তাদের চাওয়া ছিল একই। তাদের গান, সাহিত্য একই কথা বলেছে, কিন্তু ভিন্ন খাত থেকে। জাতির জীবনে বসন্ত এনেছেন নজরুল তাই তাকে বসন্ত বইটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নজরুলকে স্নেহ করতেন বলে অনেক কবিই তখন রবীন্দ্রনাথকে বলতেন, কোথাকার কোন ছোকরা, একটু ছনছনিয়ে কবিতা লেখে, এটা সাময়িক। রবীন্দ্রনাথ তখন বলতেন, আমার যদি এখন ওর মতো বয়স থাকত তাহলে একই লেখা আমার হাত দিয়েও আসত।
পরিবারের সদস্যরা তাকে ভালোবাসেন সর্বান্তকরণে। হয়তো বাইরের দুনিয়ায় ভালোবাসার অভাব ছিল তার। না হলে কেন তিনি বললেন, ‘আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলামÑসে প্রেম পেলাম না বলে প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম...।’








































