শচীন্দ্রনাথ মন্ডল, দাকোপ (খুলনা)

  ১ ঘণ্টা আগে

দাকোপে সুপেয় জলের হাহাকার

লবণাক্ততার গ্রাসে ২ লাখ মানুষ, বিকল অধিকাংশ পানির উৎস

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই খুলনার উপকূলীয় উপজেলা দাকোপে সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা, তিনটি পৃথক দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই উপজেলার চারপাশের নদীতে লবণাক্ততার তীব্র চাপ থাকায় প্রতি বছরই খরা মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার তৈরি হয়। এবারও ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখেরও বেশি মানুষ বিশুদ্ধ পানির জন্য তীব্র সংকটে পড়েছেন।

সংকটের বাস্তব চিত্র ও জনদুর্ভোগ: উপজেলার সর্বত্র এখন বিশুদ্ধ পানির জন্য চলছে তীব্র লড়াই। খাবার পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। খোলা বাজারে সুপেয় পানি কেনার দোকানে জমছে দীর্ঘ লাইন।

ব্যবসায়িক স্থবিরতা: সুপেয় পানির অভাবে চায়ের দোকান, খাবার হোটেল ও মিষ্টির দোকানে খরিদ্দারদের বিশুদ্ধ পানি দিতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: বিত্তবানরা খুলনা বা বটিয়াঘাটা থেকে পানি কিনে খেলেও, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ বাধ্য হয়ে ডোবা-নালার অস্বাস্থ্যকর পানি পান করছেন। ফলে এলাকায় ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

পানির চড়া দাম: কালাবগি এলাকার বাসিন্দা ছালাম মোল্যা জানান, খরার কারণে স্থানীয় পুকুরগুলো শুকিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে মসজিদের ট্যাংকিতে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি ৩০ লিটারের ড্রাম ২০ টাকা দরে কিনে জীবন বাঁচাতে হচ্ছে অনেককে।

অকেজো সরকারি ও বেসরকারি পানির উৎস: ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত আয়রন, আর্সেনিক ও তীব্র লবণাক্ততার কারণে এখানে গভীর নলকূপ স্থাপন সফল হয় না। ফলে বৃষ্টির পানি এবং পুকুরই এখানকার মানুষের ভরসা। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ উৎসই এখন অচল।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দাকোপে সুপেয় পানির প্রধান উৎসগুলোর একটি বড় অংশই বর্তমানে অকেজো হয়ে পড়েছে। এলাকার ৮ হাজার ৬০টি রেইন ওয়াটার হারভেটিং ট্যাংকির মধ্যে ১৯৪টি অচল। ৫০টি গভীর নলকূপের মধ্যে সচল আছে মাত্র ২৭টি এবং ৭২০টি অগভীর নলকূপের মধ্যে ৫০০টিই বিকল হয়ে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা পুকুর ফিল্টার বা পিএসএফ-এর; যেখানে ৫৩২টি পিএসএফ-এর মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৫৬টি এবং সমগ্র উপজেলায় খাবার পানির উপযোগী সচল পুকুর অবশিষ্ট আছে মাত্র ১৮টি।

এছাড়া, ২৪টি কমিউনিটি রেইন ওয়াটার হারভেটিং, ১৬টি চাল্ড আল্ট্রা ফিল্টার ও ২টি আরও প্ল্যান্ট সচল থাকলেও সোলার পিএসএফ, সোলার ডি-স্যালাইনেশন ইউনিটসহ এনজিওদের অসংখ্য আরও প্ল্যান্ট অচল হয়ে পড়ে আছে। এমনকি সুপেয় পানির সংকট নিরসনে '৩২ পৌরসভা পানির প্রকল্প'-এর আওতায় প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টটিও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি করতে পারছে না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: দাকোপ উপজেলা উপ-সহকারি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, এ অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট সত্যিই একটি গুরুতর সমস্যা। এই সংকট নিরসনে প্রতিটি বাড়িতে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, লবণের মাত্রা পরীক্ষা করে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পুকুর-খাল পুনঃখনন জরুরি। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি এনজিওদের অকেজো আরও (RO) প্ল্যান্টগুলো সচল করতে পারলে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়