বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল
মুক্তমত
ডিজিটাল প্রতারণা : অদৃশ্য ফাঁদে সাধারণ মানুষ

ফেসবুকে স্ক্রলিং করতে করতে হঠাৎ বেকার এক যুবকের সামনে আসে দেশের একটি নামিদামি প্রতিষ্ঠানে লোক নিয়োগের বিজ্ঞাপন। যুবকের মনে আশার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হলো। ফেসবুক থেকে সে ম্যাসেঞ্জারে গিয়ে যোগাযোগ করল উক্ত নিয়োগকারীদের সঙ্গে। সেখানে বলা হলো তার সিভি পাঠাতে, সঙ্গে আবেদন ফি ৫৫০ টাকা। আশাবাদী যুবক সিভির সঙ্গে টাকাও পাঠিয়ে দিল। পরে তাকে জানানো হলো, কোম্পানি হতে ম্যাসেজের মাধ্যমে পরীক্ষার স্থান জানানো হবে। এর দুদিন পর অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে বলল, সে উক্ত কোম্পানি থেকে বলছে এবং তাকে যদি অগ্রিম ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়, তাহলে আবেদনকারীর চাকরি নিশ্চিত।
এই জায়গায় কেউ আবেগবশত টাকা দিয়ে দেন, কেউ বা সচেতন থাকেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি মানবজীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের অদৃশ্য ঝুঁকি- যার নাম ডিজিটাল প্রতারণা। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই গড়ে উঠছে এক সুসংগঠিত অপরাধজগৎ, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে অর্থ, তথ্য ও নিরাপত্তা। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতারকদের কৌশলও আরো আধুনিক, জটিল এবং দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক আর্থিক চিত্র এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ফ্রড সামিটে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০০৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্যাম, পনজি স্কিম এবং করপোরেট জালিয়াতির কারণে বাংলাদেশ প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছে। এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল করে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস- এমএফএস খাতের দ্রুত বিস্তার একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের হিসাবে বাংলাদেশে এমএফএস গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২৩.৭ কোটিতে পৌঁছেছে। এই বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি যেমন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে, তেমনি নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি প্রতারণার ক্ষেত্রও বিস্তৃত করেছে।
সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর অভাবই এখানে অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ডিজিটাল প্রতারণার ধরন এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর। ২০২৪ সালের সাইবার অপরাধ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং সবচেয়ে বেশি সংঘটিত অপরাধ, যা মোট ঘটনার প্রায় ২১.৬৫ শতাংশ। এর ফলে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এবং আর্থিক অ্যাকাউন্ট সহজেই অপরাধীদের হাতে চলে যাচ্ছে। আরো উদ্বেগজনক হলো ভুক্তভোগীদের জনতাত্ত্বিক চিত্র। গবেষণায় দেখা যায়, সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া প্রায় ৭৮.৭৮ শতাংশই ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণ। একইসঙ্গে প্রায় ৫৯ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী। শিক্ষাগত দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র ওঠে আসে- ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রায় ৪০.৯ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক এবং ২১.২১ শতাংশ স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। অর্থাৎ, শিক্ষিত ও প্রযুক্তি-সচেতন জনগোষ্ঠীও এই ফাঁদ থেকে অনিরাপদ।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহারে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি ডিপফেক-সংক্রান্ত অপরাধ প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। অপরাধীরা এখন ভয়েস ক্লোনিং, ভিডিও নকল এবং এআইভিত্তিক প্রতারণা ব্যবহার করছে, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। একই সময়ে সংগঠিত অনলাইন প্রতারণার নতুন রূপ হিসেবে টেলিগ্রাম ইনভেস্টমেন্ট স্ক্যাম দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে সিআইডি একাধিক চক্রকে গ্রেপ্তার করে, যারা টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে ‘বিদেশি বিনিয়োগ’ বা ‘দ্রুত লাভের সুযোগ’ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এই ধরনের প্রতারণা মূলত মানুষের লোভ ও অজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে, সিম কার্ড জালিয়াতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একটি অভিযানে প্রায় ৫১ হাজার অবৈধ সিম কার্ড এবং বিপুল ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল প্রতারণায় ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই অবকাঠামো ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে কল করা, ওটিপি চুরি এবং ব্যাংকিং প্রতারণা চালানো হতো। আরো বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের তথ্যনিরাপত্তার দুর্বলতা। ২০২৬ সালের মে মাসে সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইন্টারনেটে উন্মুক্ত প্রায় ৮০টি ডাটাবেস সার্ভারে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করে। এই ধরনের দুর্বলতা বড় পরিসরে ডেটা চুরির ঝুঁকি তৈরি করে, যা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রেও প্রতারণা বাড়ছে। ফলে ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সীমিত সচেতনতা। অনেক ব্যবহারকারী এখনো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত সতর্ক নন। একইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যাংক, টেলিকম ও ডিজিটাল সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রতারণাকে আরো সহজ করে তুলছে। এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় বহুমাত্রিক উদ্যোগ জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি- বিশেষ করে অচেনা লিংক, কল ও অফার থেকে সতর্ক থাকা- অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনকে ত্বরান্বিত করেছে, তেমনি নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ডিজিটাল প্রতারণা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক হুমকি। তাই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র- সব পর্যায়ে সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই অদৃশ্য ফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
bappaditty.chowdhury2005@gmail
"






































