ওসমান গনি

  ১৭ জুন, ২০২৫

দৃষ্টিপাত

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনাঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা

পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্ব একই সুতায় গাঁথা। একটির ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে অপরটির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব অবধারিত। এই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো বনভূমি বা বণাঞ্চল। সভ্যতার ক্রমবিকাশে আমরা যত উন্নয়নের কথা বলি, ততই প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়ে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, কৃষি সম্প্রসারণ এবং অব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত আমরা হারাচ্ছি মূল্যবান বনভূমি।

বনভূমি মানে শুধু গাছের সমাহার নয়। এটি একটি জটিল ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র, যেখানে বৃক্ষ, প্রাণী, পাখি, কীটপতঙ্গ, ছত্রাক ও মাটি পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। বনে উৎপন্ন খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা এবং জ্বালানি উপকরণ শুধু পরিবেশ নয়, মানবজীবনের জন্যও অপরিহার্য। বিশ্বব্যাপী যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তার বড় কারণ বন উজাড় ও বনায়নের ঘাটতি। ফলে এই মুহূর্তে বণাঞ্চল রক্ষা ও সম্প্রসারণ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং তা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো জরুরি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর মতে, কোনো দেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারি হিসাবেই ১৪-১৫ শতাংশের বেশি নয়, আর বাস্তবচিত্রে তা আরো কম। পাহাড়, সমতল ও উপকূলীয় এলাকায় কিছু সংরক্ষিত বন থাকলেও সেগুলোও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ মানব জীবনের অপরিহার্য অংশ। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, পানি, মাটি, বাতাস- সব মিলেই গঠিত হয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র, যাকে আমরা পরিবেশ বলি। এই পরিবেশকে সুস্থ ও সচল রাখতে বনভূমি বা বণাঞ্চলের অবদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বনভূমি না থাকলে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তেমনি বিপর্যস্ত হয় মানুষের জীবনধারা, কৃষি উৎপাদন, জলবায়ু ও প্রাণীকূলের অস্তিত্ব। বনভূমির প্রধান ও মৌলিক কাজ হলো বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ এবং ক্ষতিকর গ্যাস শোষণ। গাছপালা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন নিঃসরণ করে, যা প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। শহরাঞ্চলের দূষিত বাতাস শোধনেও বনভূমি কার্যকর ভূমিকা রাখে। বনভূমি পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি গ্রীনহাউস গ্যাস শোষণ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমায়। একই সঙ্গে বৃষ্টি হওয়ায় বনভূমি সাহায্য করে। বন এলাকায় আর্দ্রতা বেশি থাকে, ফলে খরা ও অতিরিক্ত গরম থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

বনের গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে, ফলে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধসের সম্ভাবনা কমে যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন (যেমন: সুন্দরবন) ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষকে রক্ষা করে। বনের উপস্থিতি বন্যা ও খরাও হ্রাস করে।

বনভূমি হলো হাজারো প্রাণী, পাখি, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। পৃথিবীর ৮০ শতাংশ স্থলজ প্রাণী বাস করে বনাঞ্চলে। বন ধ্বংস হলে প্রাণী নিঃশেষ হয়ে যায়, যা জীববৈচিত্র্য হ্রাস করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বনের গাছপালা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি চক্রে অংশ নেয়। এতে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল থাকে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে কৃষিকাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। বনভূমি শুধু পরিবেশের নয়, অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কাঠ, গাছের ছাল, ফলমূল, ওষুধি গাছ ইত্যাদি থেকে অনেক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। বনভিত্তিক পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজমও একটি বড় অর্থনৈতিক খাত হয়ে উঠছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ বনভূমি মানুষের মানসিক প্রশান্তি দেয়। শহুরে জীবনের চাপ কমাতে প্রকৃতির ছায়া অত্যন্ত কার্যকর। বনাঞ্চল তাই শুধু দেহ নয়, মনের সুস্থতার জন্যও প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে তিন ধরনের বনভূমি রয়েছে- প্রাকৃতিক বন (যেমন: সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি বন) সামাজিক বন (উপজেলা-গ্রামীণ এলাকায় গড়ে ওঠা) কৃত্রিম বা পরিকল্পিত বন (জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক) এই সব বন বিভিন্নভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। যেমন: বনভূমি একটি দেশের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা বলয়। এটি শুধু গাছগাছালির সমষ্টি নয়, বরং একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র যা জলবায়ু, বায়ু, পানি, প্রাণীকুল ও মানবজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অথচ আজ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে বনভূমি দিন দিন কমে যাচ্ছে অবৈধ দখল, দালালি ও দুর্নীতির কারণে।

বাংলাদেশে সরকারি হিসাব মতে ১৪-১৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে, যা জাতিসংঘের মানদণ্ড (২৫ শতাংশ) থেকে অনেক কম। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই বর্তমানে অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই দখলের সঙ্গে ক্ষমতাধর গোষ্ঠী, রাজনীতিক, দস্যু ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অবৈধ দখলের পদ্ধতি বহু রকম। কখনো কৌশলে বনভূমিতে বসতবাড়ি বা দোকান তোলা হয়, কখনো জায়গাটি খাস জমি বলে দাবি করে তা দখল করা হয়। আবার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে সরকারি বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয় আবাসিক বা বানিজ্যিক উদ্যোক্তাদের।

বিশেষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মধুপুর, দিনাজপুর, গাজীপুর ও খুলনার কিছু অংশে বনভূমি দখলের ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একসময় যেখানে ঘন অরণ্য ছিল, এখন সেখানে দেখা যায় ইট-পাথরের দালান, খামারবাড়ি কিংবা পর্যটন কেন্দ্র। বাংলাদেশে বন সংরক্ষণে “বন আইন ১৯২৭” এবং পরবর্তীতে “বন সংরক্ষণ আইন (সংশোধন) ২০০০”, “বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২” প্রণীত হলেও বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তাই দুর্নীতিগ্রস্ত, আবার অনেক ক্ষেত্রেই তারা রাজনৈতিক চাপে নীরব ভূমিকা পালন করে। বনের জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলে তা ভাঙা হয় অস্থায়ীভাবে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার গজিয়ে ওঠে নতুন দখলদার।

বন দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। জরিমানা, জেল ও দখলদারদের নাম প্রকাশ করে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ করা। বনভূমির ডিজিটাল মানচিত্র ও নিবন্ধন তৈরি করে সরকারি বনভূমির সীমানা নির্ধারণ করে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মানচিত্র তৈরি ও জনসমক্ষে প্রকাশ।

সামাজিক বনায়ন ও উপকারভোগী পদ্ধতির মাধ্যমে জনগণকে বন রক্ষায় উৎসাহিত করা। দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ও বন বিভাগ গঠন বন কর্মকর্তাদের পেশাগতভাবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখা। আদালতের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অবৈধ বন দখলের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা পরিবেশ আদালত বা বন ট্রাইব্যুনাল করা যেতে পারে। বিশেষত সুন্দরবন, যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। এখানকার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ হাজারো প্রাণী আজ বিলুপ্তির হুমকিতে। বনের ভেতর দিয়ে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বা নৌপথ নির্মাণ এই সংকট আরো ত্বরান্বিত করছে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মতো মহামারি প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির ফল। প্রকৃতি যখন ভারসাম্য হারায়, তখন সে নিজেই তার প্রতিশোধ নেয়।

আমরা ভুলে যাই, পরিবেশ আমাদের প্রতিপক্ষ নয়- আমাদের আশ্রয়। বনভূমি কেটে কংক্রিটের জঙ্গল বানালে তা হয়তো তাৎক্ষণিক লাভ এনে দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটি ধ্বংসের কারণ হয়। আজকের শিশুরা যেন শ্বাস নিতে পারে, জল পান করতে পারে, প্রকৃতির রঙ দেখতে পারে- সে জন্যই আমাদের বন রক্ষা করতে হবে। শুধু আইন বা সরকারের উদ্যোগে এই সংকট সমাধান হবে না। এ জন্য দরকার সার্বজনীন সচেতনতা, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্ববোধ। মানুষ হিসেবে আমাদের এমন ভবিষ্যৎ রেখে যেতে হবে যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ পাশাপাশি সহাবস্থান করতে পারে- সমঝোতা নয়, সহমর্মিতার ভিত্তিতে। বনের অস্তিত্ব মানেই আমাদের অস্তিত্ব। তাই এখনই সময় পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের, প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে দেওয়ার। আর তার প্রথম শর্ত- বনভূমি রক্ষা ও বনায়নের সম্প্রসারণ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়