পরিকল্পনাবিদদের মন্তব্য

সুষ্ঠু নজরদারি থাকলে অগ্নিকা- এড়ানো সম্ভব

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

নিজস প্রতিবেদক

পরিকল্পনাবিদরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নগর এলাকাগুলোতে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ কারণে প্রায়ই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে যার ফলে জীবন ও সম্পদের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। নগর এলাকার সঠিক পরিকল্পনা, ঝুঁকিমুক্ত নিরাপদ ভবন নির্মাণ, কার্যকরী উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু নজরদারি থাকলে নগর এলাকায় এ ধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা এড়ানো সম্ভব। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উদ্যোগে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘নগরে অগ্নি ঝুঁকি ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপে নগর পরিকল্পনাবিদরা এমন মন্তব্য করেন।

পরিকল্পনা সংলাপের শুরুতেই বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান ‘নগরে অগ্নি ঝুঁকি ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অগ্নিকান্ডের উদাহারণ টেনে এর সঙ্গে পরিকল্পনাগত, প্রকৌশলগত এবং ব্যবস্থাপনাগত বিভিন্ন সমস্যার যোগসূত্র তুলে ধরেন। এছাড়াও এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার আশু প্রতিকারের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।তিনি বলেন, আমাদের সেবা সংস্থাগুলো জনগণের জীবনকে প্রধান্য দিতে হবে। এসব দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। ইমারত নকশার অনুমোদনের পাশাপাশি পরিকল্পনাগত অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও দেশের শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ভূমি ব্যবহার অনুমোদনের বিধান রাখতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই আমরা পরিকল্পিত নগর ও গ্রাম তৈরি করতে পারব এবং দেশ বসবাসের উপযোগী হবে।

বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে ইমারত নির্মাণ করে। সেক্ষেত্রে টেকসই ও নিরাপদ আবাসস্থল গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানগুলো সব নিয়ম মেনেই ইমারত নির্মাণ সম্পন্ন করে। তিনি বলেন, একটি ইমারত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানগুলো নয় বরং সেই ইমারতের বাসিন্দারাই থাকে। তাই তাদেরই ইমারতের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা সূচারু রাখার দিকে নজর রাখতে হবে। এছাড়াও নির্দিষ্ট সময় পর পর ‘ফায়ার ড্রিল’ এর মাধ্যমে অগ্নিকান্ডের সময় সবাই যাতে নিরাপদে বিল্ডিং ত্যাগ করতে পারে এবং অগ্নি নির্বাপকগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি বিল্ডিংয়ের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নিতে হয়, যা পাঁচ বছর পর পর নবায়ন করতে হয়। যদি এই কাজটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে করতে পারে তাহলে অগ্নি দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোতে প্রকৌশলীতের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক নগর পরিকল্পনাবিদ এবং স্থপতি নিয়োগের ব্যবস্থা করে সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ইমারত নির্মাণের পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণ কৌশল সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এছাড়াও পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট সব অনুমোদন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকার বিশদ এলাকা পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়ন প্রকল্পের পরামর্শক পরিকল্পনাবিদ হিশাম উদ্দীন চিশতি বলেন, একটি ইমারত সব ধরনের নিয়ম মেনে তৈরি হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে আমাদের সর্বপ্রথম দৃষ্টি রাখতে হবে। পরবর্তীতে কমিউনিটির সঙ্গে সংঙ্গুক্তি বৃদ্ধি করে জনসচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেষ্ট হতে হবে।

ব্র্যাক (আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) এ কর্মরত নগর পরিকল্পনাবিদ ওয়াসিম আকতার বলেন, নগর অঞ্চলে নিম্ন আয়ের জনবসতি অর্থাৎ বস্তিতে বসবাসকারীতের সমস্যাগুলো ভিন্নতর হয়। বস্তিতে অগ্নি ঝুঁকি ও নিরাপত্তার কোনো মাপকাঠি নেই, ফলশ্রুতিতে সমস্যাগুলো অনেক সময় আমাদের সামনেই আসে না। বস্তিগুলোতে পরিকল্পনাগত উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে অগ্নি নির্বাপণ স্বেচ্ছাসেবক ও অ্যালার্ম সিস্টেম চালু করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্র্যাক অনেক বস্তিতে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র বসিয়েছে এবং অনেক মানুষকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রশিক্ষিত করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ইমারত নির্মাণের আগেই ইমারতের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে তবেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতে অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাবিদ মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, মসজিদগুলো সাধারণত অপরিকল্পিতভাবেই গড়ে উঠে। বর্তমানে সব ধরনের ইমারত নির্মাণের জন্য অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ আছে। নারায়ণগঞ্জের রাস্তায় অগ্নি নির্বাপক স্থাপন করার চিন্তা করা হচ্ছে।

বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সঞ্চালনায় পরিকল্পনা সংলাপের সভাপতির বক্তব্যে বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ঝুঁকি কমাতে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও ইমারত নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্রগুলোর মানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, অগ্নিকান্ড সংগঠিত হলে ফায়ার সার্ভিসের সমর্থতা এবং দুর্ঘটনাস্থলে সময়মতো পৌঁছানের সম্ভাব্যতা বিবেচনায় রেখে ইমারতের অগ্নি নির্বাপক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরির মাধ্যমে সামাজিক প্রস্তুতি বাড়াতে হবে তবেই ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

 

"