আবদুস সালাম

  ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ভূষণপুরে পাখি শিকার

ছন্দ ও গর্ব দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা ভূষণপুর হাইস্কুলের মেধাবী ছাত্র। একই ক্লাসে পড়ে। কদিন আগেই তাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। স্কুল বন্ধ। তাই পড়াশোনার চাপ নেই। ছুটির এই কটা দিন ঘুরে বেড়ানোই যেন তাদের প্রধান কাজ। পাখির ডাকে ওদের ঘুম ভাঙে। সকালের নাশতা সেরে ঘুরতে বের হয়। দুপুরের আগে আগে বাসায় ফেরে। কোনো রকমে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবার ঘুরতে বের হয়। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। ভূষণপুরের অলিগলি-মাঠঘাট তাদের সব চেনা। ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাদের যে জায়গাগুলো খুব প্রিয় তার মধ্যে বিহগবিল একটা। এই বিল অত্র অঞ্চলের একটা প্রসিদ্ধ স্থান। এর অবস্থান ভূষণনগরের শেষ মাথায়। শুধু ভূষণপুর নয় আশপাশের গ্রাম ও শহরে যে মাছের চাহিদা রয়েছে তা বিহগবিলের উৎপাদিত মাছের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এ ছাড়াও শীতকালে বিগহবিল পরিযায়ী পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকে। এই সময় পাখি দেখতে এবং পাখি শিকার দূর-দূরান্ত থেকে লোকজনরা ভূষণপুর গ্রামে পদার্পণ করে। ছন্দ ও গর্বের অনেক দিনের শখ পাখি শিকার করার। তারা আগে কখনো পাখি শিকার করেনি। এবার তারা পরিকল্পনা করল যেভাবেই হোক পাখি শিকার করবে। এর জন্য তারা গুলতি বানাবে। গুলতি বানানোর জন্য তারা একে একে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করতে থাকে। প্রথমে তারা বাবলা গাছের ডাল কেটে ইংরেজি ওয়াই বর্ণের আকৃতিতে কাঠের দুটি ফ্রেম তৈরি করে। রাবার ও চামড়ার টুকরা সংগ্রহের জন্য হাটে যায়। সাইকেল সারার দোকান থেকে অব্যবহৃত টিউব এবং মুচির দোকান থেকে চামড়ার কয়েকটা টুকরা সংগ্রহ করে। প্রথমে টিউবটা ১ বাই ৮ ইঞ্চি এবং চামড়ার টুকরা ১ বাই ২ ইঞ্চি মাপে কেট নেয়। এরপর কাটা টিউব টুকরা দুটির একমাথা চামড়া টুকরার সঙ্গে এবং অপর মাথা কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে নেয়। এভাবে তারা দুটি গুলতি তৈরি করে। পুকুর থেকে তারা এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে। গুলতির জন্য এঁটেল মাটির কাদা দিয়ে মার্বেলের মতো ছোট ছোট গোল্লা তৈরি করে রোদে শুকাতে দেয়। পরে চুলার আগুনে সেগুলো পুড়িয়ে শক্ত করে। গুলতি ও মাটির গুলি নিয়ে তারা প্রতিদিন সকালে বের হয় পাখি শিকার করতে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ছন্দ ও গর্ব আগান বাগানে ঘুরে বেড়ায়। গাছের ডালে পাখি বসে থাকতে দেখলেই তাদের লক্ষ্য করে গুলতি দিয়ে গুলি ছোড়ে। প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। প্রায় সপ্তাহখানেক হয়ে গেল তবু একটা পাখি শিকার করতে পারল না। মোতালেব দাদার আমবাগানের পাশে একটা সেগুনগাছ আছে। সেই সেগুনগাছের একটা ডালে সুন্দর একটা ঘুঘু পাখির বাসা রয়েছে। বাসাতে কয়েকটি ছানাও রয়েছে। এক দিন ছন্দ দেখে মা ঘুঘুটা তার ছানাদের খাবার খাওয়াচ্ছে। মা ঘুঘু বেশির ভাগ সময় নীড়ের আশপাশেই থাকে। ঘুঘুটাকে লক্ষ্য করে ছন্দ তার গুলতি দিয়ে একটা গুলি ছোড়ে। সত্যিই সত্যিই গুলিটা পাখিটার গায়ে আঘাত করে। পাখিটা ছটফট করতে করতে নিচে পড়ে যায়। ছন্দ ও গর্ব খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। পাখিটা খোঁজার জন্য তারা এগিয়ে যায়। গাছটির চারিদিকে ঝোপঝাড় থাকায় পাখিটা খুঁজে পায় না। অবশেষে তারা অন্য পাখি শিকারের উদ্দেশে বিহগবিলের দিকে হাঁটা দেয়। যেখানেই পাখিদের ঝাঁক দেখে সেখানেই তারা গুলি ছোড়ে। এভাবেই সেদিন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়। ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে তারা বাসাতে ফিরে যায়।

পরের দিন সকালে দুই বন্ধু গুলতি হাতে হাঁটতে হাঁটতে সেই সেগুনগাছটির দিকে এগিয়ে যায়। গাছটির কাছাকাছি আসতেই তাদের নজরে পড়ে সবুজ ঘাসের ওপরে মা ঘুঘুটার মরদেহ। ডান পাশের ডানার নিচে ক্ষত চিহ্ন। বেশকিছু পিঁপড়া পাখিটার গায়ের ওপর ঘোরাঘুরি করছে। কয়েকটি পোকা পাখিটার মরদেহ টানার চেষ্টা করছে। পাখির নীড়ে ছানাদের কোনো কোলাহল নেই। এই অবস্থা দেখে ছন্দের মনটা খারাপ হয়ে যায়। এত সুন্দর পাখিটা সে গতকাল সকালে মেরেছে। তার কৌতূহল হলো পাখির ছানাগুলো বেঁচে আছে কি না দেখবে। গর্ব ও ছন্দকে নিষেধ করে গাছে না উঠার জন্য। কারণ সে স্কুলের স্যারের কাছে গল্প শুনেছে পাখির নীড়ে সাপ থাকে। কিছু গেছো সাপ পাখির ছানা ও ডিম খাওয়ার জন্য গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায়। তা ছাড়া সেগুনগাছটার গোড়ার আশপাশে ঝোপঝাড়। ওখানে সাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিষধর সাপ দংশন করলে আর রক্ষা নেই। নির্ঘাত মৃত্যু। গর্বের এসব কথা শুনে ছন্দ ভয় পেয়ে যায়। তাই গাছে উঠা থেকে বিরহ থাকে। সে নিশ্চিত যে পাখির ছানাগুলো হয় মারা গেছে না হয় সাপে খেয়েছে। এই ঘৃণ্য কাজের জন্য ছন্দ মনে মনে অনুতপ্ত হয়। তার কপোল বেয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। পাখিগুলোর করুণ পরিণতির কথা ভেবে গর্বেরও কষ্ট হয়। অবশেষে তারা প্রতিজ্ঞা করে আর কখনো পাখি শিকার করবে না। শুধু তা-ই নয়, কেউ যেন পাখি শিকার না করতে পারে সেই প্রচেষ্টাও তারা করবে। ফলে তারা আপন আপন গুলতি ভেঙে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়।

পরের দিন ছন্দ ও গর্ব গ্রামের মেম্বার, রহমত চাচার সঙ্গে দেখা করতে যায়। দুই বন্ধু তাকে বুঝিয়ে বলে প্রতি বছর শীতকালে প্রাণ বাঁচাতে হরেক জাতের পরিযায়ী পাখি বিদেশ থেকে আমাদের দেশে আসে। তারা হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল ও নদ-নদীতে আশ্রয় নেয়। সেই সময় আমাদের গ্রামের বিহগবিলেও পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। পরিযায়ী পাখিদের শিকার করার জন্য আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজনরা ভূষণপুর গ্রামে আসে। এখন থেকে আমাদের উচিত হবে কাউকে কোনো পাখি শিকার করতে না দেওয়া। গর্ব আরো বলে আমি স্কুলের স্যারের কাছে শুনেছি- কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা, বন্যপ্রাণীকে আহত বা ক্ষতি করা, বন্য পাখির বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী একটা দ-নীয় অপরাধ। এই আইনে ৫৭৮টি পাখির প্রজাতিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমাদের সবার উচিত পরিযায়ী পাখিদের রক্ষা করা। তা ছাড়া পাখি হলো পরিবেশের বন্ধু। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাখিদের প্রয়োজন অপরিসীম। সব ধরনের পাখির বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। ছন্দ ও গর্বের কথা শুনে রহমত মেম্বার খুশি হলো। তিনি বলেন, ‘আমি শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব যাতে কেউ পাখি শিকার করতে না পারে।’ এক দিন মেম্বার সাহেব সব বয়সের গ্রামবাসীদের নিয়ে সভা করল। সেই সভাতে ছন্দ ও গর্ব উপস্থিত ছিল। বিস্তারিত আলোচনান্তে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আজ থেকে ভূষণপুর গ্রামে কেউ পাখি শিকার করবে না এবং কাউকে পাখি শিকার করতেও দেবে না। কেউ পাখি শিকার করলে তাকে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করা হবে। সিদ্ধান্তের কথাটি সারা গ্রামে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হলো। এরপর থেকে সত্যি সত্যিই ভূষণপুর গ্রামে কেউ আর পাখি শিকার করেনি।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close