ডা. সুমাইয়া হক

  ১৫ জুলাই, ২০২৬

নীরব ঘাতক ওভারিয়ান ক্যান্সার

নারীদের একটি মারাত্মক রোগ ওভারিয়ান বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। বিশ্বজুড়ে এটি নারীদের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ না থাকায় ডিম্বাশয়ের ক্যানসারকে বলা হয় ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক।

কেন হয় : ডিম্বাশয় হচ্ছে নারীর প্রজনন অঙ্গের একটি অংশ, যা ডিম্বাণু উৎপন্ন করে। এ অঙ্গে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে ক্যানসার হয়। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ঝুঁকি বেশি। তবে এর চেয়ে কম বয়সেও হতে পারে। নারীদের এই রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রাণহানির নীরব কারণ। সুস্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই এটি খুব দ্রুত শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় মেটাস্টেসিস।

সব ধরনের ক্যান্সারের মধ্যে এটিই অ্যাডভান্সড বা শেষ স্টেজ। মেটাস্টেসিসের পর চিকিৎসকের আর তেমন করণীয় কিছু থাকে না। তাই এ রোগে মৃত্যুর হার অন্যান্য ধরনের ক্যান্সারের তুলনায় বেশি।

ডিম্বাশয় নারীদের হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন উৎপাদন করে থাকে। কোনো কারণে যদি ডিম্বাশয়ের কোষগুলো অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে টিউমার তৈরি করে, তখন তা ওভারিয়ান ক্যান্সারে পরিণত হয়।

পরিসংখ্যান : বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওভারিয়ান ক্যান্সার রোগীদের চিত্র বেশ আলাদা। কারণ সচেতনতা অভাব। এই রোগ শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং দক্ষ লোকবলের ঘাটতিও রয়েছে।

সারা বিশ্বে নারীদের মধ্যে ক্যান্সারে মৃত্যুর এটি অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হয় এবং প্রায় দুই লাখ রোগীর মৃত্যু ঘটে। উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ায় মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওভারিয়ান ক্যান্সারের স্থান তৃতীয়। এর আগে আছে স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার।

দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে মৃত্যুহার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০২০ সালের ক্যান্সার রেজিস্ট্রি অনুযায়ী, ডিম্বাশয় ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে। বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতির কারণে এই ক্যান্সারে মৃত্যুহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

কারণ ও ঝুঁকি : বয়স ৪০ বছর পার হলে এ রোগের ঝুঁকি থাকে। ৫০ বছর পার হলে ঝুঁকি অনেক বাড়তে থাকে। বিআরসিএ১ ও বিআরসিএ২ নামক জিনের পরিবর্তনের ফলে ডিম্বাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এই পরিবর্তন উত্তরাধিকারসূত্রেও সঞ্চারিত হতে পারে। মেনোপজের পর দীর্ঘদিন হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ রোগটিতে জরায়ুর ভেতরের টিস্যু বাইরেও গজায়। এতে ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে।

ডিম্বাশয়ে সিস্ট তৈরি হয়, ক্যান্সারের আশঙ্কা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে। সন্তান না হওয়া বা দেরিতে সন্তান নেওয়ায় এর ঝুঁকি বাড়ে। দেহের অতিরিক্ত ওজন সরাসরি ওভারিয়ান ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ। দীর্ঘ সময় ধরে ডিম্বাশয় সক্রিয় থাকা (ওভুলেশন)। এতে ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

লক্ষণ : প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগটির সুস্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ক্যান্সারটির পর্যায় অগ্রসর হলে দেখা দিতে পারে কিছু লক্ষণ; যেমন- পেলভিসে বা পেটের নিচের অংশে চাপ বা ব্যথা অনুভব হওয়া। পেট ফোলা বা অস্বাভাবিক ভারী লাগা। খাওয়ার পর দ্রুত পেট ভরে যাওয়া। বারবার প্র¯্রাব করার চাপ বোধ হওয়া। পেটে চাকা বা জমাট অংশ অনুভব করা। মাসিক অনিয়ম বা অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ। অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত ক্লান্তি বোধ করা। এই লক্ষণগুলোর একটিও যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনো নারীর দেহে দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

নির্ণয় : ডিম্বাশয় ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়ে থাকে-

একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ নারীর তলপেটের কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার জন্য শারীরিক পরীক্ষা করেন। শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে ডিম্বাশয়ের ছবি তৈরি করে। টিউমার বা অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা যায়। পেটের ভেতরে পানি (অ্যাসাইটিস) আছে কি না, তা-ও জানা যায়।

ডিম্বাশয় ও এর আশপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিস্তারিত চিত্র সরবরাহ করে। ক্যান্সার কত দূর ছড়িয়েছে, সেটির ধারণা পাওয়া যায়। এ ছাড়া ক্যান্সারের পর্যায় (স্টেজ) নির্ধারণ করা সম্ভব।

ডিম্বাশয়ে ক্যান্সার হলে রক্তে উচ্চমাত্রায় পাওয়া যায় সিএ-১২৫ প্রোটিন। মাত্রা মেপে রোগের প্রগতি ও চিকিৎসা চলাকালে এর অবস্থা মূল্যায়ন করা যায়। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেহে ক্যান্সার হলেও সিএ-১২৫ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকতে পারে।

ডিম্বাশয়ের টিস্যু সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে বিশ্লেষণ করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাধারণত কোর বায়োপসি বা এফএনএসি পরীক্ষা না করে অস্ত্রোপচারের পর টিস্যু থেকে নির্ণয় করা হয় ওভারিয়ান ক্যান্সার।

চিকিৎসা : চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের পর্যায় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। এর মধ্যে আছে-

আক্রান্ত ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, জরায়ু ইত্যাদি অপসারণ করা হয়। ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য বিশেষ ওষুধ সরাসরি শিরায় প্রবেশ করানো হয়। এটি সাধারণত অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। আধুনিক এই চিকিৎসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে শুধু ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করা হয়। এটি ওভারিয়ান ক্যান্সারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হলেও স্টেজ ফোর-এ প্রয়োজন হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপি/ইমিউনোথেরাপি ব্যবহৃত হয়। অগ্রসর পর্যায়েও কেমোথেরাপি শেষে অস্ত্রোপচার করা হয়।

সচেতনতা : নিয়মিত গাইনিকোলজি বিশেষজ্ঞের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (বিশেষত ৪০+ বয়সে) করা। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে জেনেটিক টেস্টের মাধ্যমে বিআরসিএ মিউটেশন আছে কি না যাচাই করা। অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি। সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ধূমপান পরিহার করা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ঝুঁকি কিছুটা কমে। মানসিক চাপ থেকে দূরে থাকা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, খাজা ইউনুস আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়