নিজস্ব প্রতিবেদক
অতিবৃষ্টি ও বন্যা
ক্ষতির শিকার ১ লাখ হেক্টর ফসলি জমি, ৬ লাখের বেশি মানুষ

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলায় জেলায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৫৬ জন। গত সোমবার পর্যন্ত দেশের ২৯টি জেলার ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩৬ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে মাঠপর্যায়ে তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে গেলেও সরকার এখন উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পিআইডি সম্মেলনকক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে প্রথমে চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য এলাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং পরে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের কিছু অংশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, বন্যায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ মিলিয়ে আটটি জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৬৮টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার ৪৪১ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিহত হয়েছেন ৫৪ জন, যাদের বেশিরভাগই পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি সহায়তার জন্য এরই মধ্যে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় রান্না করা খাবার সরবরাহের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে নিয়োজিত করা হয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য দুর্গত এলাকায় স্পিডবোট ও রাবারবোট পাঠানো হয়েছে। পানি নামতে শুরু করায় এখন পুনর্বাসন কার্যক্রমই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে এবং সে অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বন্যা-পরবর্তী রোগবালাই মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে। কাঁচা সড়ক কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্কার করা হবে।
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু রাখবে।
এ বছরের বন্যাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলোর একটি উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি নিজেও আজ বুধবার থেকে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন। মঙ্গলবারই তিনি চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত রবিবার পর্যন্ত দেশের ২৯টি জেলার ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩৬ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৭৬ হাজার ৬০ হেক্টর, যা মাঠে থাকা মোট আউশের ১৫.৫৯ শতাংশ। এবার মোট আউশ ধান চাষ করা হয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে। এছাড়া ১৫ হাজার ৩২৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিক্ষেত এবং ৯ হাজার ৬১৯ হেক্টর আমনের বীজতলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, আক্রান্ত বীজতলার চারা দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা সম্ভব। ধান, বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ছাড়াও আরো ৩ হাজার ৯৩২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের প্লাবনে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমন ধানের বীজতলা পানি কমলে আবার তৈরি করা যাবে কিন্তু ডুবে যাওয়া আউশের ক্ষতি পোষানো সম্ভব না। তবে এ ক্ষতিটা নির্ভর করবে ধান কোন স্টেজে আছে তার ওপর। যদি মিল্ক স্টেজে থাকে, তাহলে ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হবে। তখন পানি কমে গেলেও দানা হবে না, আর বেশি পানি থাকলে পচে যাবে। অপরিপক্ব বা দানা অবস্থায় বেশি দিন পানির নিচে থাকলে সেটিও পচে যাবে। দ্রুত পানি নামলে এ স্টেজে ক্ষতিটা অবশ্য কম হবে।’ কৃষককে বন্যাসহনশীল জাত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এ কৃষিবিদ বলেন, ‘ব্রি-১১০ জাতটি বন্যাসহনশীল। এ জাতের ধান ১৫-২০ দিন পানির নিচে থাকলেও ফলন দেয়। সেজন্য যেসব এলাকায় বন্যা ও আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি রয়েছে সেখানে জাতটি চাষ করতে আমরা কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছি। দেশের স্বার্থে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকেও এ জাতের ব্যাপক প্রচার চালাতে ব্রি থেকে জানানো হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঘটনা বেড়েছে। এতে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রতি বছরই বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে, যার প্রভাব শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরবর্তী কয়েক মাস পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারেও দেখা যাচ্ছে এর প্রতিফলন। তাই বন্যাকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কৃষি পরিকল্পনার স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এজন্য আগাম সতর্কবার্তা জোরদার করা, জলবায়ু-সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, দ্রুত পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পুনর্বাসনে সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। সে সম্ভাবনাও মাথায় রেখে আগাম পরিকল্পনা থাকা উচিত। সবজি চাষও সাম্প্রতিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব বাজারে পড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম। কিন্তু বৃষ্টি ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও বাজার-উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।’ সংস্থাটির সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, কোনো ফসল আক্রান্ত হলেই সেটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে- এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে জমিতে পানি কতদিন স্থায়ী থাকে তার ওপর। তাই আক্রান্ত ফসলের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কিছুটা সময় লাগবে।
"






































